বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন, ২০২২ | ১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

কুমিল্লায় ঢোল পিটিয়ে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনের আহ্বান!

প্রকাশের সময়: ৯:৫৬ অপরাহ্ণ - মঙ্গলবার | ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২২

currentnews
মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, কুমিল্লা প্রতিনিধি: প্রাচীন কালে রাজা-বাদশা আর জমিদারগণ প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা বা কর আদায়ের জন্য কিংবা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জরুরি সতর্ক বার্তা জানোনার জন্য ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা দিতেন। বিশেষ প্রয়োজনে ইউনিয়ন পরিষদ এবং ভূমি অফিসের ভূমি উন্নয়ন কর, স্যানিটেশ, খাস জমি বন্দোবস্ত এবং সরকারি ভূমি উদ্ধারেও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে চূড়ান্ত বার্তা পৌঁছে দেয়ার নজির রয়েছে। সে ঢাকের আওয়াজে জণগণের  বুক ভয়ে-আতংকে কেঁপে উঠতো। মানুষ দিশেহারা হয়ে যেতো।
কুমিল্লায় প্রাচীন এ ঐতিহ্য ধারণ করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে জনসচেতনতা সৃষ্টি করছেন শিক্ষক, সমাজকর্মী ও পরিবেশ সংগঠক মতিন সৈকত। তিনি ২০০০ সাল থেকে বিষমুক্ত সবজি নিরাপদ ফসল উৎপাদন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। প্রতি বছর ফসলের মৌসুমে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, মাইকিং করে এলাকার কৃষক এবং জনগণকে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে আগ্রহী করে তুলছেন। জেলার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে প্রতি বছর কৃষক এবং জনগণকে বিষমুক্ত ফসল নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য তিনি লড়াই করে যাচ্ছেন।
বিষমুক্ত ফুল, ফসল ও পাখিদের জন্য নিরাপদ আকাশ বিনির্মাণে ৩০ বছর ধরে পরিবেশ সুরক্ষার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন ‘কৃষকের বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত মতিন সৈকত। তার এই আন্দোলন ও পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে ঢোল।
শীতের মৌসুমে প্রতিদিন বিকেলে তিনি ঢোল পিটিয়ে কৃষকদের জড়ো করেন। এরপর তার বার্তা তুলে ধরেন। বার্তায় কৃষকদের জানান, কীটনাশক ছাড়া কীভাবে নিরাপদ উপায়ে ফসল ফলানো যায়।
কেবল কীটনাশক ছাড়া ফসল উৎপাদন নয়, নদী রক্ষা, খাল খনন, অতিথি পাখি রক্ষা, কৃষককে কম খরচে সেচের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি।
মতিন সৈকত কুমিল্লা দাউদকান্দি উপজেলার  বাসিন্দা হলেও গোটা জেলাতেই তিনি পরিচিত মুখ। কৃষকের পাশাপাশি ফুল, পাখি আর ফসল তার বন্ধু। স্বপ্ন দেখেন, তিনি যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে কাজ হবে সারা দেশেই।
মতিন সৈকত ১৯৮৭ সালে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর লেখা অভিনন্দন পত্র পেয়ে অনুপ্রাণিত হন।পরিবেশ সংরক্ষণে জাতীয়ভাবেও পুরস্কৃত হয়েছেন এই পরিবেশ আন্দোলন কর্মী।  পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন, ব্যবহার ও সম্প্রসারণে দুই বার বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত শাখায় ছয়বার চট্টগ্রাম বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া একাধিকবার জাতীয় পরিবেশ পদকের জন্য প্যানেলভুক্ত হন।
জানা যায়, মতিন সৈকত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা সাহিত্য অনার্স, মাস্টার্স করে গ্রামে বসবাস করেন। তার নেতৃত্বে এলাকার কৃষি পরিবেশ সমাজ উন্নয়ন, জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণ, গ্রামীণ অবকাঠামো, গণ শেয়ারের ভিত্তিতে প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। মতিন সৈকত ১৯৮৭ সালে তার নিজ গ্রাম আদমপুর এবং পার্শ্ববর্তী পুটিয়া, বিটমান তিন গ্রামের কিশোর যুবকদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন পিএবি ক্লাব। মূলত সে সময় থেকেই তিনি কৃষি পরিবেশ সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করে চলেছেন।
মতিন সৈকত বলেন, ‘আগে রাজা-বাদশারা প্রজাদের জরুরি বার্তা জানাতে ঢোল বাজিয়ে প্রচার করতেন। মানুষ গুরুত্ব দিয়ে তা শুনত। ঢোল পিটিয়ে কৃষকদের কাছে গেলে তারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে।
‘পরে তারা সেক্স ফেরেমন দিয়ে পোকা দমন করেন। জমিতে কাকতাড়ুয়া রাখেন। পাখি বসে পোকামাকড় ধরে খায়। রাতে ছোট বাতি জ্বালান জমিতে। এতে পোকামাকড় ধ্বংস হয়।’
মতিন সৈকত আরও বলেন, ‘পাখিরা যখন আকাশে ওড়ে, দৃশ্যটা খুব ভালো লাগে। নদীতে কলকল শব্দে পানির প্রবাহ আমাকে শান্তি দেয়৷ ‘কৃষকদের উৎপাদিত ফসল যেন আমাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ হয়। এমন ভাবনা থেকে আমার কাজ শুরু করা। নিরাপদ কৃষি ফসল, নদী দূষণ রোধ ও পরিবেশ রক্ষার যে আন্দোলনটি আমি দাউদকান্দিতে শুরু করেছি, তা যেন পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাহলেই সোনার বাংলা বিনির্মাণ সম্ভব হবে।’
কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শওকত আরা কলি বলেন, ‘মতিন সৈকত একজন পরিবেশবাদী মানুষ। তিনি স্বেচ্ছায় পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি একটি পরিবেশ স্কুল স্থাপন করেছেন। তার কাজগুলো আমি দেখেছি। আমি মনে করি, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় মতিন সৈকতের মতো লোক প্রয়োজন।’
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘মতিন সৈকত কৃষকদের নিরাপদ ফসল রক্ষায় যেভাবে উদ্বুদ্ধ করে চলছেন তা একটি দৃষ্টান্ত। মতিন সৈকতের জন্য শুভ কামনা থাকবে।’

আর্কাইভ

বিজ্ঞাপন

উপরে