বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ | ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

শৈলকুপায় শহীদ বীরমুক্তিযোদ্ধাদের কবরগুলি অবহেলিত

প্রকাশের সময়: ২:৫৯ অপরাহ্ণ - মঙ্গলবার | ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬


কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি:
ঝিনাইদহ: ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ তথা শৈলকুপাবাসীর জীবনে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞের দিনছিল। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কামান্না গ্রাম আজো সেই নির্মমতার নীরব স্বাক্ষী হয়ে রয়েছে। ২৭ নভেম্বর, সেই ভয়াল দুঃখ স্মৃতি জাগানিয়া স্মৃতি বিজড়িত ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়। ২৭ নভেম্বর ভোর রাতে ফযরের আজানের সুমধুর সুর আবেশে হঠাৎ সুমধুর সেই ধ্বনিকে
তলিয়ে গর্জে উঠল রাইফেল-স্টেনগান, এসএলআরসহ অত্যাধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্র। পাকহানাদার সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর, রাজাকার, আল শামসরা রক্তের বন্যা বইয়ে দেয় এই কামান্না গ্রামে। পাখির মত গুলি করে নির্বিচারে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিলো দুই সহযোগী সহ ২৭ জন মুক্তিপাগল দামাল ছেলেকে। কামান্না পাকহানাদার বাহিনীর জঘণ্যতম হত্যাকান্ডের নিরব স্বাক্ষী। শৈলকুপা সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার পূর্বে কুমার নদের পাড়ে ২৭ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ৫ টি অবহেলিত গনকবর বুকে ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি বহন করে চলেছে এই কামান্না গ্রাম।

বেঁচে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর সন্ধার পরপরই মুজিব বাহিনীর ৪২ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দামাল ছেলে শৈলকুপা সদরকে হানাদার মুক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে কামান্নায় এসে আশ্রয় নেয়। এদের বাড়ি পার্শ্ববর্তী মাগুরা জেলার হাজিপুর এলাকার বিভিন্ন গ্রামে। হজিপুরের আবু বকর ও শৈলকুপা উপজেলার মালিথিয়া গ্রামের আলমগীর ছিল এদের দলনেতা। শৈলকুপা উপজেলার কামান্না এসময় ছিল শত্র“ মুক্ত এলাকা। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা রাতের খাওয়া সেরে ৩২ জন মাধবচন্দ্র ভৌমিকের টিনের ঘরে এবং ১০ জন বিধবা সামেনা বেগমের খড়ের দুটি ঘরে ৫ জন করে ঘুমাতে যায়।

এদিকে রাতের আধারে শুরু হয় রাজাকার-আলবদর-আল শামসদের-গোপন তৎপরতা। দ্রুত খবর চলে যায় ঝিনাইদহ সদরে অবস্থিত অস্থায়ী সেনা সদরে, সেখান থেকে মাগুরা সদরে অস্থায়ী আর্মি ক্যাম্পে। দুপাশ থেকে রাতের আধারে কামান্নার দিকে এগিয়ে যায় দলে দলে পাক হানাদার সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসররা। চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে মুক্তিযোদ্ধাদের এই অস্থায়ী আস্তানা। এসময় শৈলকুপা ধলহরাচন্দ্র ও আবাইপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি প্রধান ঘাঁটি ছিল। দুটি ঘাঁটি থেকেই বিপদের সংকেত জানিয়ে কামান্নায় সতর্ক বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু সতর্কবাণী পৌছার আগেই ঘটে ইতিহাসের নারকীয় এই হত্যাকান্ড।

সময় নেয়নি পাকহানাদাররা। চারপাশ ঘিরে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই মাধব ভৌমিকের টিনের ঘর লক্ষ্য করে বৃষ্টির মত গোলা বর্ষণ শুরু করে তারা। টিনের বেড়া ভেদ করে ছুটে আসতে থাকে গুলি। হঠাৎ আক্রমনে ঘুম ভাঙা মুক্তিযোদ্ধা হতবিহ্বল-বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পায়নি তারা। যে যেভাবে পারে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা করে। ফলে কেউ ঘরের মধ্যে, কেউ ঘরের বারান্দায় আবার কেউ উঠানে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে। পাশেই বৃদ্ধা ছামেনা বেগমের ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা, পেছনের চাটাইয়ের বেড়া কেটে ঘর থেকে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়; কিন্তু অন্য ঘরের ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা পাক হানাদারদের গুলিতে উঠানে লুটিয়ে পড়ে।

ইতিমধ্যে কামান্নার এই দুঃসংবাদ পৌছে যায় সবখানে, শৈলকুপার বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী আস্তানা গুলোতে। মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে এগিয়ে যান ঘটনাস্থালের দিকে এবং কিছু দুরে দুরে অবস্থান নিয়ে ফাঁকা গুলির আওয়াজ করে তাদের উপস্থিতি ঘোষণা করে। অতর্কিত আক্রমনের আশংকায় পাকহানাদার সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসররা তাড়াহুড়া করে মাগুরার দিকে দ্রুত পালিয়ে যায়।

রাত গড়িয়ে ভোর হয়, দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। দলে দলে লোক জমা হয় ঘটনাস্থলে। ঘরে, ছাদে, মেঝেতে, উঠানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ২৭ টি লাশ এক জায়গাতে জড়ো করা হয়। এসময় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। হাজার মানুষের চোখের জলের মাঝে ঘটনাস্থলের পাশেই কামান্না হাইস্কুলের মাঠের একপাশে, কুলকুল শব্দে এক মনে বয়ে যাওয়া কুমার নদের পাড়ে ৫ টি গন কবরে মোট ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করা হয়। এ ২৭ জন হলেন-(১) মোমিন, (২) কাদের, (৩) শহীদুল, (৪) ছলেমান, (৫) রাজ্জাক, (৬) ওয়াহেদ, (৭) রিয়াদ, (৮) আলমগীর, (৯) মতলেব, (১০) আলী হোসেন, (১১) শরিফুল, (১২) আলীমুজ্জামান, (১৩) আনিচুর রহমান, (১৪) তাজুল, (১৫) মনিরুজ্জামান, (১৬) নাসিম, (১৭) রাজ্জাক-২, (১৮) কউসার, (১৯) সালেক, (২০) আজিজ, (২১) আকবর, (২২) সেলিম, (২৩) হোসেন, (২৪) রাশেদ, (২৫) গোলজার, (২৬) অধির ও (২৭) গৌর। ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধার সাথে আরও যে দু’জন মারা যান তারা হলো (১) রঙ্গ বিবি ও (২) মুক্তিযোদ্ধাদের পথপ্রদর্শক ফনি ভূষণ কুন্ডু।

কামান্না গ্রামের মৃত গোলজার বিশ্বাসের স্ত্রী রঙ্গবিবি। ২৬ নভেম্বরের রাত গড়িয়ে ২৭ নভেম্বরের ঐ ভোরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পানি আনতে গিয়েছিলেন নদীর ঘাটে, সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় রঙ্গবিবি। পথপ্রদর্শক ও সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা ফনিভূষণ কুন্ডু মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেই শুয়ে ছিল ঘরের মধ্যে। আর গুলি বিদ্ধ হয়ে মারাও যায় সেখানে। রঙ্গবিবিকে তার নিজ বাড়িতে কবর দেওয়া হয়, আর ফনিভূষনকে হিন্দুমতে দাহ করা হয় কামান্না শ্মশানে।

স্বাধীনতা লাভের পরপরই গঠিত হয় “কামান্না ২৭ শহীদ স্মৃতি সংঘ”। কিন্তু যাদের স্মৃতি রক্ষার জন্য এ সংঘের জন্ম তাদের স্মৃতি রক্ষার কিছুই হয়নি । ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহম্মদ, ১৯৭৩ সালে তৎকালীন মন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী ও সোহরাব হোসেন কামান্নায় এসেছিলেন। এত বছরেরও ২৭ শহীদের গনকবরগুলো আজো অবহেলিত, অনাদ্রিত ও উপেক্ষিত। স্মৃতিসৌধ তো দূরে থাক যাদের তাজা রক্তে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক তাদের স্মৃতি রক্ষায় ন্যূনতম প্রয়াসও আমাদের নেই।

শিপলু জামান
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি

উপরে