মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৮ | ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

এক দেশে দুই আইন চলছে: মির্জা ফখরুল

প্রকাশের সময়: ১২:২৯ অপরাহ্ণ - সোমবার | জানুয়ারি ৯, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকমডটবিডি: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে দুই ধরনের আইন চলছে। আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের আইন, আর বিএনপি বা সাধারণ মানুষের জন্য আরেক আইন। আজ সোমবার সকালে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এসব কথা বলেন।
ফখরুল বলেন, আমরা ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবসে একটি সমাবেশ করতে চেয়েছিলাম। গণপূর্ত বিভাগ অনুমতি দিলেও পুলিশ কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়নি। তারা কোনো সাড়া দেয়নি। বরং শেষ মুহুর্তে বলেছে, ‘এখন পর্যন্ত যখন কিছুই পাননি তাহলে আপনাদের বুঝে নিতে হবে যে আর কিছুই পাবেননা।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি গত তিন বছরে ৭ বার সমাবেশ করতে চেয়েছিল কিন্তু অনুমতি দেয়নি সরকার। এসব ব্যাপারে আমাদের সচেতন গণমাধ্যম লেখালেখি করছে এবং বলছে। এজন্য গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ দেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকার বিরোধী দল তথা দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপিকে কোনো সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছেনা। অথচ তারা একই স্থানে সমাবেশ করছে। জাতীয় পার্টি ১ জানুয়ারি সমাবেশ করেছে। আগামীকালও আওয়ামী লীগ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। তাহলে তো বললেই হয় যে, দেশে দুই ধরনের আইন চলছে। একটি আওয়ামী লীগের জন্য আরেকটি বিএনপির জন্য।
‘বিএনপিকে দুর্বল ভাবলে হবে না, তাদের ভোটের সমর্থন আছে’ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যকে সত্য বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের সত্যিই বলেছেন। তারা জানেন বলেই তো এসব বলছেন। আসলে জুলুম করে নির্যাতন করে গণতন্ত্র হয়না।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিয়ে ভুল করেনি মন্তব্য করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, কথা যত কথাই বলা হোকনা কেনো বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ভুল করেনি। তাহলে তো বলতে হয় যে, সিপিবি, বাসদ ড. কামাল সহ যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি তারাও ভুল করেছেন! যত কথাই বলা হোক কেয়ারটেকার সরকার ছাড়া নির্বাচন সঠিক হবেনা বলেই কোনো রাজনৈতিক দল সেদিন নির্বাচনে যায়নি।
তত্ত্বাধায়ক সরকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত সহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও তো কেয়ারটেকার সরকারের পক্ষে ছিলেন। আদালত যে রায় দিয়েছেন সেখানেও আরো দুটি নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে করা যেতে পারে বলে মত দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার তা অগ্রাহ্য করে গায়ের জোরে একতরফা নির্বাচন করেছে।
বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের নামে মিথ্যাচার করছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারের উন্নয়নের চিত্র সম্পর্কে ‘উন্নয়ন অন্বেষা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণায় উল্টোকথা বলছে। সিপিডি তাদের সংবাদ সম্মেলনে বলেছে দেশে কোনো বিদেশী বিনিয়োগ হচ্ছেনা। নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে সামান্য বিনিয়োগ হচ্ছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে সরকার দলীয় লোকদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে এমন অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, চুরি তো বটেই আজকে ব্যাংকগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। কাদের হাতে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো? আওয়ামী লীগের এমপি এবং দলীয় নেতাদের ছেলেদের নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দেয়া হচ্ছে।
‘বিদেশী কর্তৃপক্ষের মতের কারণেই এসব পরিবর্তন হচ্ছে’ সরকারের এমন মন্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, আমরা জানতে চাই বিদেশী কর্তৃপক্ষ কে?
তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে প্রশ্ন রেখে বলেন, ইসলামী ব্যাংক কি এমন করেছে যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনতে হলো?
দেশ বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতে মন্তব্য করে অর্থনীতির সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, বর্তমানে দেশে চলছে খুন গুম আর রাহাজানি। থানার মধ্যে ঘুষের জন্য যুবককে নির্যাতন করা হচ্ছে। আজ শুধু দলীয় নয় সাধারণ মানুষের অবস্থাও একই। তারাও এখন উদ্বেগের মধ্যে আছেন। সব সময় চিন্তিত কখন কোত্থেকে তুলে নিয়ে যায় আর মিথ্যা মামলা দেয়।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল সম্প্রদায় এবং নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ওপর আওয়ামী লীগের লোকেরাই হামলা চালিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ জন্য নিন্দাও জানান।
সুন্দরগঞ্জের আওয়ামী লীগ এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যা প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, নিজের বাসার ভেতরে সন্ধ্যায় এমপি লিটনকে গুলি করে হত্যা করা হলো। কারা তাকে হত্যা করলো? কিন্তু কেনো তার তো গানম্যান থাকার কথা। কিন্তু সরকার এসবেরকোনো কারণ না খুঁজে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। তারা সেখানকার ৬ জন জামায়াতে ইসলামীর বৃদ্ধ লোককে গ্রেফতার করেছে। এখন একজন দলীয় চেয়ারম্যানকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আমার মনে হয় এসবের কোনো সমাধান হবেনা। সরকার কোনো সঠিক তদন্ত করবেনা। যেমন সাগর-রুনি হত্যাকা-ের রহস্য আজ পর্যন্ত উন্মোচিত হয়নি।
ক্ষমতাসীন সরকার মিথ্যা মামলাকে সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল বলেন, এই সরকার কোনো কিছু ঘটলেই রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায়ই নাকি যাত্রাবাড়ি এবং অন্যত্র গাড়ি পুড়িয়েছেন। আমিও নাকি একই কাজ করেছি। এই অবস্থা তৈরি করেছে বর্তমান সরকার। তারা একটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। কিন্তুমিথ্যা মামলা কেনো? আসুন ভোট দিন। মানুষ তাদের মতের প্রতিফলন ঘটাক। তবে এসব ঘটনা ইতিহাস ধারণ করবে এবং দেশের জনগণ এর বিচার করবে।
নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনের সমালোচনা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই সরকার আলোচনায় বসতে ভয় পায়। কারণ আওয়ামী লীগ পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি রাজনৈতিক দল। আলোচনায় বসলে নীতি নৈতিকতার কথা আসবে। সেগুলো পরবর্তীতে আইনে পরিণত করতে হবে। এজন্যই তারা আলোচনায় ভয় পায়। তা না হলে আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দলকে ১৫৩ জন্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত করে
ক্ষমতায় আসতে হতোনা।
গণতন্ত্র ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় দাবি করে মির্জা ফখরুল নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সবশেষে তিনি বলেন, আমরা চাই স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন। যেই গণতন্ত্র এবং সমৃদ্ধির জন্য আমরা একাত্তরে লড়াই সংগ্রাম করেছিলাম। কিন্তু এখনকার আইন কিসের? কার আইন? এই সংসদ তো জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেনা। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১৫ টি মামলা তুলে নেয়া হলো। আর বেগম খালেদা জিয়ার ৫ টি মামলা রেখে দেয়া হলো। এখন তাকে প্রতিনিয়ত ট্রায়াল ফেস করতে হচ্ছে।
তবে দেশের চলমান সঙ্কট নিরসনে সব দলের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও পুনরায় প্রতিষ্ঠা করাই একমাত্র সমাধান বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল।
নয়া পল্টনে এই সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রারায় চৌধুরী, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, ঢাবি অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

উপরে