শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

পিরোজপুরে সাঈদীর ছেলেকে ‘বয়কট করেছে’ আওয়ামী লীগ

প্রকাশের সময়: ১০:১২ অপরাহ্ণ - সোমবার | জানুয়ারি ১৬, ২০১৭

যুদ্ধাপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীকে বয়কট করেছে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগ। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ হাতে সন্মাননা ও পুরস্কার তুলে দেওয়াকে ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য তাকে বয়কট করা হয়েছে বলে পিরোজপুরের ইন্দুরকানী (সাবেক জিয়ানগর) উপজেলা আওয়ামী লীগ জানিয়েছে।

জানা যায়, ইন্দুরকানী (সাবেক জিয়ানগর) উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সাঈদী পুত্র মাসুদ সাঈদী নিজ হাতে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে সম্মাননা ও পুরস্কার দেন। পরে অনুষ্ঠানের ছবি তার নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট ও স্ট্যাটাস দেওয়ায় বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে মাসুদ সাঈদীর গুরুত্ব থাকলেও আওয়ামী লীগের বাধার মুখে এখন তাতে ভাটা পড়েছে। আগে যে কোনো অনুষ্ঠানে তিনি হরহমেশাই দাওয়াত পেতেন। এখন পাচ্ছেন না।

গত বছরের ১৬ ডিসেম্বরের ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন তাকে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও আগের মতো আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। ওই ঘটনার পর কয়েকটি সামাজিক অনুষ্ঠানে তাকে দাওয়াত দিতে চাইলে তাতে বাধ সাধের আ’লীগের নেতারা। উনি থাকলে আমরা সেখানে যাব না বলেও একটি অনুষ্ঠানকে ঘিরে উপজেলা আ’লীগের এক নেতা এমন মন্তব্য করেন।

এমনকি এর আগে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ইন্দুরকানীতে এলে তার সরব উপস্থিতি থাকতো। কিন্তু গত ৪ জানুয়ারি বুধবার মন্ত্রী তার নির্বাচনী এলাকা ইন্দুরকানীতে একদিনের সফরে আসলে অদৃশ্য কারণে মাসুদ সাঈদীকে দেখা যায়নি।

এছাড়া ৯ জানুয়ারি উন্নয়ন মেলায় উপস্থিত হলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এবং বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র পরিচালিত ২৯ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচির বার্ষিক উন্নয়ন কর্মশালার অনুষ্ঠানেও সাঈদী পুত্র ছিলেন উপেক্ষিত। অপরদিকে ১২ জানুয়ারি সেতারা স্মৃতি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবীন বরণ ও পিঠা উৎসবের অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা যায়নি।

তবে নানা শঙ্কার মধ্য দিয়েও ২০১৪ সালে বিপুল ভোটে পিরোজপুরের ইন্দুরকানী (জিয়ানগর) উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন মাসুদ সাঈদী। বিরোধী ঘরানার লোক হওয়ায় শুরুতে অনেকটা চিন্তিত ছিলেন তার চেয়ারটিকে ধরে রাখা নিয়ে। এ জন্য ক্ষমতাসীন দল ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ‘ম্যানেজ করে চলার’ কারণে বাড়তি কোনো ঝামেলা মাথায় চড়েনি তার। কৌশল খাটিয়ে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় থাকায় ভালোভাবেই তিনি তিন বছর পার করতে পেরেছেন। কিন্তু বিজয় দিবসের ওই অনুষ্ঠানের পর থেকে সাঈদী পুত্র তোপের মুখে রয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাকে কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন।

উপজেলা পরিষদের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাসুদ সাঈদীর বিষয়ে বলেন, গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের ওই অনুষ্ঠানের উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য এরপর থেকে অনেকে তাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এড়িয়ে চলছেন।

উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক মৃধা মো. মনিরুজ্জামান এ প্রতিবেদককে জানান, আমরা তাকে বয়কট করেছি। আমাদের কথা ছিল তিনি কোনো মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠানে থাকতে পারবেন না। তিনি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রেস্ট দিয়েছেন। আমাদের উপজেলা পরিষদ থেকে নয়, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানালে আমরা সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হই। ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে তিনি কোনো অনুষ্ঠানে আর উপস্থিত থাকছেন না।

এ ব্যাপারে ইন্দুরকানী (জিয়ানগর) উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম মতিউর রহমান রোববার বিকেলে বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান পূর্বে কখনোই ফ্লাগ উত্তোলন বা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান করেননি। সম্প্রতি গত ১৬ ডিসেম্বরের আগে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাকির হোসেন বাচ্চু ভারতে অবস্থান করার সুযোগে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মচারী ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার যোগসাজশে ওই দিনটিকে বিতর্কের মধ্যে ফেলে দেন। এরপর থেকে তিনি আমাদের কোনো প্রোগ্রামে আসেন না, আমরাও যাই না, দাওয়াতও দেই না।

ইন্দুরকানী (জিয়ানগর) উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফ হাওলাদার সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়ে জানান, বিগত ৩ বছর উপজেলা চেয়ারম্যানের কোটায় যে টিআর, জিআর, কাবিখা, এডিপির বরাদ্দসহ বিভিন্ন প্রকারের বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক বরাদ্দ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদকগণ নিয়েছেন, তিনিও দিয়েছেন তাদের খুশি রাখার জন্য। যার প্রাপ্য ছিল দুই উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান।

গত ১৬ ডিসেম্বরের উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী অনুষ্ঠানের ছবি ফেসবুকে দেওয়ায় আওয়ামীলীগের হাইকমান্ড ক্ষুব্ধ হয়। এ নিয়ে তাদের মধ্যে পদ-পদবী রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর থেকে তারা (আ’লীগ) তাকে এড়িয়ে চলেন।

মাসুদ সাঈদী কোনো অনুষ্ঠানে গেলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাকে হেয় প্রতিপন্ন ও অরুচিকর মন্তব্য করায় তিনি (মাসুদ) নিজেই তার সম্মান বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে রোববার রাতে বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রী মহোদয় একটি কথা প্রায়ই বলেন, আমি সেটাই ধারণ করি, তা হলো ‘রাজনীতি যার যার উন্নয়ন সবার’। গত ৪ জানুয়ারি ঢাকায় থাকার কারণে মন্ত্রী মহোদয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারিনি। এ বিষয়ে মন্ত্রী মহোদয় আসার পুর্বেই তার সাথে আমার কথা হয়েছিল। এছাড়া, আমি প্রতিদিন অফিস করি এবং প্রতিটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকি।’

গত ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব ও পরবর্তী আ’লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে উপজেলা পরিষদের সম্পর্ক কেমন যাচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভালো যাচ্ছে, আমি এখনও যে কোনো অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণ জানাই। কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া না হওয়া নিয়ে সরকারি কোনো বিধি নিষেধ নেই। আমি মনে করি, আমাদের সকলে মিলেই উন্নয়ন করতে হবে।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আ’লীগের সভাপতি ও সম্পাদক তারা শিক্ষিত ও সম্মানিত মানুষ। তাদের অনেক অবদান আছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। আমার মৃত্যু হলে তারাই আমাকে দাফন দিতে এগিয়ে আসবে, তাদের সাথে দ্বিমত কিসের?’

‘১৬ ডিসেম্বর নিয়ে তারা হয়তো দলীয়ভাবে জেলা কমিটির চাপে পড়ে কিছুটা দূরত্বে থাকার চেষ্টা করছেন’ বলে মনে করেন মাসুদ সাঈদী।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে