বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি নয়, আর্থিক সহায়তা চান তোফাজ্জেল

প্রকাশের সময়: ১২:৩৪ অপরাহ্ণ - বৃহস্পতিবার | জানুয়ারি ২৬, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি:

মেহেরপুর: দুই সন্তান ও এক নাতি ‘ডুশিনি মাসকুলার ডিসট্রফি’ নামে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। তাদের চিকিৎসায় স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব মেহেরপুরের তোফাজ্জেল হোসেনের এক মর্মস্পর্শী চিঠি আলোড়ন তুলেছে সম্প্রতি। মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের কাছে লেখা চিঠিতে স্বজনদের চিকিৎসা ভার গ্রহণ অথবা তাদের মৃত্যুর অনুমতি চেয়েছেন তিনি। তবে তোফাজ্জেল এখন জানাচ্ছেন মৃত্যু নয়, তিনি চান তিন জনের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা।
গত ১৯ জানুয়ারি তোফাজ্জেল তার দুই ছেলে আবদুস সবুর (২৪) ও রায়হান (১৩) এবং নাতি সৌরভের (৯) ‘ডুশিনি মাসকুলার ডিসট্রফি’ রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহকে চিঠিটি লিখেছিলেন।
তবে এখন তোফাজ্জলের বক্তব্য, আবেগের বশবর্তী হয়ে তিনি চিঠিটি লিখেছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সুচিকিৎসাই তার একমাত্র দাবি। দুই ছেলে আর নাতির মৃত্যুর অনুমতি চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তোফাজ্জেল বলেন, ‘আমার পরিবারের তিন জন সদস্য এই রোগে আক্রান্ত। আমার স্ত্রী মানসিক রোগী। এ অবস্থায় কী করব তা বুঝতে না পেরে এমন আবেদন করেছি।’
এ ধরনের অনুমতির বৈধতা আছে কিনা জানতে চাইলে তোফাজ্জেল বলেন, ‘তা না থাকলে চিকিৎসা ব্যয় বহন করে আমাদের রক্ষা করুন। একটা না একটা উপায় তো বের করতে হবে।’ তোফাজ্জেল জানান, তিনি নিজেও অসহনীয় যন্ত্রণা বুকে নিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্বজনদের মুখ চেয়ে পারেননি।
এমন অভিনব আবেদনের পর তার বাসায় মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক সহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গিয়েছিলেন বলে জানান তোফাজ্জেল। তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে নানাভাবে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। সামান্য আর্থিক সহায়তাও করেছেন।’ তোফাজ্জেল আরও বলেন, ‘বড় ছেলের এই রোগ শনাক্ত হওয়ার পর দেশে আর ভারতে চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্ব খুইয়েছি। তাই ছোট ছেলে আর নাতির তেমন চিকিৎসা করাতে পারিনি। সিভিল সার্জন বলেছেন, যখন যা ওষুধ লাগবে তিনি তার ব্যবস্থা করে দিবেন। একমাত্র ভারতের হোমিও ইনস্টিটিউশনই কিছু আশ্বাস দিতে পেরেছিল। সেখানে দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসায় ওরা তিনজন সেরে না উঠলেও ভালো থাকবে।’
রোগটির লক্ষণ হিসাবে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস এম আলমগীর বলেন, ‘এ রোগে আক্রান্তদের মাসল (মাংসপেশি) গ্রো করে না। যে কারণে একেক সময় শরীরের একেকটা অঙ্গ দুর্বল হতে শুরু করে। মাংশপেশি ডিসট্রফি হয়, পায়ে হলে হাঁটতে পারে না, শক্ত হয়ে যায়, হাতে হলে কিছু ধরতে পারে না।’
তোফাজ্জেলের মৃত্যুর অনুমতি চাওয়ার বিষয়টি আলোড়ন তুলেছে সবচেয়ে বেশি। তবে এ ধরনের অনুমতি দেওয়ার বিধান নেই উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘আইনিভাবে এমন অনুমতি জেলা প্রশাসকের কাছে কেন, কারও কাছেই চাইতে পারবেন না। তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে চিঠিটি লিখে থাকলেও তা আমলে নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।’
এ বিষয়ে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহের বক্তব্যও প্রায় একই। তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে তোফাজ্জেলের কথা হয়েছে। তার চিঠিটি আমরা আমলে নিতে পারছি না। এ ধরনের আবেদন নিয়ে আমাদের করার কিছু নেই। আমাদের পক্ষে স্বেচ্ছামৃত্যুতে সায় বা অনুমতি দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। তবে তোফাজ্জেলকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার কথা আমরা ভাবছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তার সঙ্গে দেখা করে জেনেছি, তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন আবেদন করেছেন। স্থানীয় কেউ কেউ তাকে সহায়তা করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা। তোফাজ্জেলের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রশাসন সাধ্যমতো সেই প্রয়োজন মেটাতে চেষ্টা করবে।’
তোফাজ্জেল নিজেও এ ধরনের আবেদনের পক্ষে কোনও যুক্তি দেখাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছি। আমি আত্মহত্যা করতে চাই না।’ উদাহরণ হিসাবে হ্যারি পটারের লেখিকা জে কে রাউলিংয়ের জীবনের করুণ কাহিনী তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘হ্যারি পটারের লেখিকা জানিয়েছেন, তার স্বামী তাকে ছেড়ে যাওয়ার পর বাচ্চার দুধ কেনার টাকাও তার কাছে ছিল না। তিনি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু করেননি। আজ তার জায়গা কোথায় তা পুরো বিশ্ব জানে। আমি আমার পরিবারের সদস্যদের সুস্থতার জন্য সকলের সহযোগিতা চাই।’

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে