শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮ | ২রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

হিন্দু ধর্মের সৃষ্টিতত্ত্ব

প্রকাশের সময়: ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ - বুধবার | মার্চ ৮, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকমডটবিডি: যেকোনো ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সৃষ্টিতত্ত্ব। মহাবিশ্ব, বস্তু-জীব জগৎসহ সবকিছু এর অন্তর্ভুক্ত। এর ভিত্তিতে ধর্মীয় বিশ্বাসের মৌল সত্যগুলো নির্ধারিত হয়। মানুষ কীভাবে ও কেন এল এর উপরে নির্ধারিত হয় তার ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মপালন।

সৃষ্টিতত্ত্ব হিন্দুধর্মের অন্যতম আলোচনার বিষয়। কিন্তু অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে এর উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ধর্মীয় স্বীকার্য বিষয় ছাড়াও এর রয়েছে দার্শনিক ভিত্তি। পৃথিবীর অন্যান্য প্রধান ধর্মের মতো হিন্দুধর্ম একক কোনো প্রধান ধর্মগ্রন্থ অনুসরণে গড়ে ওঠেনি। এতে প্রাচীন ঋষিদের রচিত গ্রন্থের সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন পৌরাণিক উপাখ্যান। এখানে যেমন রয়েছে বেদ, তেমনি রয়েছে মহাভারত।

তবে গ্রন্থগুলোতে সৃষ্টিতত্ত্বের যে সারকথা পাওয়া যায় তা হলো- আদিতে ব্রহ্ম নামক পরম সত্তা ছিল। এই সত্তা প্রকৃতিকে একটি বিশাল অণ্ডে রূপান্তরিত করলেন। ওই অণ্ড থেকে সৃষ্টি হয়েছিল বিশ্ব-চরাচর এবং দেবতাসহ অন্যান্য সকল প্রাণী। প্রকৃতি ও ব্রহ্ম উপনিষদকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা বেদান্ত দর্শনের অন্যতম আলোচনার বিষয়।

এটি হিন্দু ধর্মের একেশ্বরবাদী রূপ। যার ভিত্তি এক ও অদ্বিতীয় সত্তা ব্রহ্ম। তিনি সবকিছুর উৎস। বেদের শেষ ও দার্শনিক অংশ উপনিষদে বলা হয়েছে, তিনি অদ্বিতীয় সত্তা। তিনি সূক্ষ্ম ও স্থূল সব কিছুরই উৎস। এর থেকে জগতের বিভিন্ন উপকরণের সৃষ্টি হয়েছে।

মার্কেণ্ডয় পুরাণ মতে- ‘যা অব্যক্ত এবং ঋষিরা যাকে প্রকৃতি বলে থাকেন, যা ক্ষয় বা জীর্ণ হয় না, রূপ রস গন্ধ শব্দ ও স্পর্শহীন, যার আদি অন্ত নেই, যেখান থেকে জগতের উদ্ভব হয়েছে, যা চিরকাল আছে এবং যার বিনাশ নেই, যার স্বরূপ জানা যায় না, সেই ব্রহ্ম সবার আগে বিরাজমান থাকেন।’

সৃষ্টি প্রক্রিয়া বিভিন্ন স্তরে সম্পন্ন হয়। এখানে তিনটি গুণ রয়েছে। এই তিনটি গুণ হলো সত্ত্ব, রজ ও তম। সত্ত্ব হলো প্রকৃতি। রজের প্রভাবে অহংকারসহ অন্যান্য খারাপ গুণের জন্ম এবং তম হলো অন্ধকার।

শ্রী সুবোধ কুমার চক্রবর্তী অনূদিত মার্কেণ্ডয় পুরাণে বলা হয়েছে- ‘এই তিন গুণ তাঁর মধ্যে পরস্পরের অনুকূলে ও অব্যাঘাতে অধিষ্ঠিত আছে। সৃষ্টির সময়ে তিনি (ব্রহ্ম) এই গুণের সাহায্যে সৃষ্টিক্রিয়ায় প্রবৃত্ত হলে প্রধান তত্ত্ব প্রাদুর্ভূত হয়ে মহত্তত্ত্বকে (মহৎ নামক তত্ত্ব) আবৃত করে। এই মহত্তত্ত্ব তিন গুণের ভেদে তিন প্রকার। এর থেকে তিন প্রকার ত্রিবিধ অহংকার প্রাদুর্ভূত হয়। এই অহংকারও মহত্তত্ত্বে আবৃত ও তার প্রভাবে বিকৃত হয়ে শব্দতন্মাত্রের সৃষ্টি করে। তা থেকেই শব্দ লক্ষণ আকাশের জন্ম। অহংকার শব্দমাত্র আকাশকে আবৃত করে এবং তাতেই স্পর্শতন্মাত্রের জন্ম। এতে বলবান বায়ু প্রাদুর্ভূত হয়। স্পর্শই বায়ুর গুণ। শব্দমাত্র আকাশ যখন স্পর্শমাত্রকে আবৃত করে, তখন বায়ু বিকৃত হয়ে রূপমাত্রের সৃষ্টি করে। বায়ু থেকে জ্যোতির উদ্ভব, রূপ ঐ জ্যোতির গুণ। স্পর্শমাত্র বায়ু যখন রূপমাত্রকে আবৃত করে, তখন জ্যোতি বিকৃত হয়ে রসমাত্রের সৃষ্টি করে। তাতেই রসাত্মক জলের উদ্ভব। সেই রসাত্মক জল যখন রূপমাত্রকে আবৃত করে তখন জল বিকৃত হয়ে গন্ধমাত্রের সৃষ্টি করে। তাতেই পৃথিবীর জন্ম হয়।’

অর্থাৎ সৃষ্টি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কিছু না থাকা থেকে অদ্বিতীয় ব্রহ্ম এর বিকাশ ঘটিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জগতের ভিন্ন ভিন্ন সৃষ্টি সম্পন্ন হয়। আবার একই সাথে বিভিন্ন গুণের আবির্ভাব ঘটে।

সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে বেদের বিখ্যাত দুটি সুক্ত হলো- নাসাদীয় সুক্ত এবং হিরণ্যগর্ভ সুক্ত। সেখান থেকে কিছু উদ্ধৃত করা হলো- ‘শুরুতে কোনো অস্তিত্ব (সৎ) বা অনস্তিত্ব (অসৎ) ছিল না। সেখানে ছিল না কোনো বায়ুমণ্ডল’। (ঋগ্বেদ ১০.১২৯.১)
‘চারদিক ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। সমস্ত বস্তু একত্রে পুঞ্জীভূত ছিল। সেখান থেকে প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হলো।’ (ঋগ্বেদ ১০.১২৯.৩)

‘প্রথমে হিরণ্যগর্ভ সৃষ্টি হলো। সেখানে ছিল উত্তপ্ত গলিত তরল। এটি ছিল মহাশূন্যে ভাসমান। বছরের পর বছর এই অবস্থায় অতিক্রান্ত হয়।’ (শতপথ ব্রাক্ষ্মণ ১১.১.৬.১)

‘তারপর যেখানে বিস্ফোরণ ঘটল গলিত পদার্থ থেকে, বিন্দু থেকে যেন সব প্রসারিত হতে শুরু হলো। সেই বিস্ফোরিত অংশসমূহ থেকে বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র তৈরি হলো। তার এক জীবনপ্রদ অংশ থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হলো।’ (ঋগ্বেদ ১০.৭২.২-৪)

‘তারপর সৃষ্ট ক্ষেত্রে সাত ধাপে সংকোচন-প্রসারণ সম্পন্ন হলো। তারপর সৃষ্টি হলো ভারসাম্যের।’ (ঋগ্বেদ ১০.৭২.৮-৯)
কালী প্রসন্ন সিংহের অনুবাদে মহাভারত থেকে জানা যায়- ‘এই বিশ্বসংসার কেবল ঘোরতর অন্ধকারে আবৃত ছিল। অনন্তর সমস্ত বস্তুর বীজভূত এক অণ্ড প্রসূত হইল। ঐ অণ্ডে অনাদি, অনন্ত, অচিন্তনীয়, অনির্বচনীয়, সত্যস্বরূপ নিরাকার, নির্বিকার, জ্যোতির্ময় ব্রহ্ম প্রবিষ্ট হইলেন। অনন্তর ঐ অণ্ডে ভগবান প্রজাপতি ব্রহ্মা স্বয়ং জন্ম পরিগ্রহ করিলেন। তৎপরে স্থাণু, স্বয়ম্ভু মনু দশ প্রচেতা, দক্ষ, দক্ষের সপ্ত পুত্র, সপ্তর্ষি, চতুর্দশ মনু জন্মলাভ করিলেন। মহর্ষিগণ একতান মনে যাঁর গুণকীর্তন করিয়া থাকেন, সেই অপ্রমেয় পুরুষ, দশ বিশ্বদেব, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, যমজ অশ্বিনীকুমার, যক্ষ, সাধুগণ, পিশাচ, গুহ্যক এবং পিতৃগণ উৎপন্ন হইলেন। তৎপরে জল, পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, দশদিক, সংবৎসর, ঋতু, মাস, পক্ষ, রাত্রি ও অন্যান্য বস্ত ক্রমশঃ সঞ্জাত হইল।’

অন্যান্য ধর্মের মতো হিন্দুধর্মের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে নানান ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে। এর মধ্যে অনেকে চেষ্টা করছেন বিগব্যাংয়ের মতো সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক মতবাদের সাথে এর সম্বন্বয়ে। আবার তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে গ্রিক মিথলজির সাথে। তবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপমহাদেশের দার্শনিক মনীষা বিকাশে হিন্দুধর্ম সৃষ্টিতত্ত্বের অবদান।

উপরে