রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

৩৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির শঙ্কা

প্রকাশের সময়: ৩:১৮ অপরাহ্ণ - রবিবার | মে ২৮, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডিঃ চলতি অর্থবছরে (২০১৬-১৭) রাজস্ব ঘাটতি ৩৮ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

পাশাপাশি সংস্থাটির মতে, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রয়োজন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। কিন্তু সেই কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হচ্ছে না। ফলে চলতি অর্থবছরে সরকার ৭.২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে দাবি করছে বাস্তবতার সঙ্গে সেটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৬-১৭ : তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক আলোচনায় এসব তথ্য তুলে ধরে সিপিডি।

সংস্থাটির নিজস্ব পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা এখন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। কমেছে রেমিটেন্স। পূরণ হওয়ার নয় রফতানি লক্ষ্যমাত্রা। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ভোগ সংকুচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলা রক্ষার জায়গাটি আগের চেয়ে অবনতি ঘটেছে। এর বিষক্রিয়া গোটা অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতিকে অতিমাত্রায় প্রবৃদ্ধি নির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা একটা খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ চিত্র বলেও দাবি সিপিডির।

সংস্থাটি আগামী অর্থবছরের বাজেটে উৎপাদক ও ভোক্তার ওপর চাপ কমাতে ভ্যাট আইনে নতুন হার ১২ শতাংশ এবং ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতাদের ন্যূনতম কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছে।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও ড. মোস্তাফিজুর রহমান। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ।

পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, শিল্পের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু সেভাবে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এটা নিয়ে একটা বিতর্কের মধ্যে আছি আমরা। এ বিতর্ক উঠা অবান্তর নয়। কারণ বিদ্যমান অর্থনীতিকে তিনি স্বাস্থ্যকর বলে মনে করেন না।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, দেখতে হবে চলতি অর্থবছরটি, আগের বছরের তুলনায় পরিবর্তনটি কী ঘটল। সেটা মধ্যমেয়াদি অর্থনীতির ক্ষেত্রে কী ধরনের চিহ্ন বা সংকেত রেখে যাচ্ছে। সবচেয়ে দুস্থ মানুষটি অর্থনীতির এ প্রবৃদ্ধি থেকে কী সুফল পাচ্ছে- প্রবৃদ্ধির হিসাবে এসব বিবেচ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে কী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কোন খাতে সৃষ্টি হল এবং কারা পেল। এর সদুত্তর আসাটা জরুরি। কিন্তু প্রবৃদ্ধিনির্ভর এ অর্থনীতি অনেক কিছুরই উত্তর দিতে পারছে না। তাই ৭.২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির দাবিও অর্থহীন।

তিনি স্বীকার করে বলেন, যদিও শিল্প খাত ও উৎপাদন খাতে কিছুটা কর্মসংস্থান হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তারপরও মনে রাখা দরকার জিডিপির ৫০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান হচ্ছে সেবা খাতে। যদি আমরা শিল্পায়ন না করতে পারি তাহলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কিভাবে? এর বাইরে রেমিটেন্স কমে যাচ্ছে। রফতানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ  হবে না। রাজস্ব আহরণেও প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়লেও সম্প্রতি হাওর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ১৬ লাখ টন ধান উৎপাদন কম হয়েছে। যা দেশে মোট বোরো উৎপাদনের ৮ শতাংশের কম। এ পরিস্থিতি উচ্চতর প্রবৃদ্ধির দাবিটি প্রশ্ন তোলার সুযোগ রাখে বলে মনে করেন তিনি।

বিনিয়োগ সম্পর্কে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এ মুহূর্তে পুরো অর্থনীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে ধাবিত হচ্ছে। এখানে ব্যক্তি বিনিয়োগ ও ভোগ দুটোই কমেছে। এর বিপরীতে সরকারি বিনিয়োগ ও ভোগ বাড়ছে। অথচ অর্থনীতিতে সব সময় চালকের আসনে থাকে বেসরকারি খাত। এ খাতটির নিষ্ক্রিয়তায় কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। ফলে দেশ থেকে অর্থ অবৈধ উপায়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। সামনে আসছে নির্বাচন। এ নির্বাচন যত সামনে আসবে, অর্থ পাচার তত বাড়বে বলেও আশঙ্কা তার।

তিনি বলেন, এর কারণ হচ্ছে অর্থনীতির কাঠামোগত রুগ্নতা। এ কারণে দেশে বিনিয়োগের চেয়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে বিনিয়োগকেই অনেকে বেশি লাভজনক মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্য দিয়ে পুঁজি দুর্ভিক্ষের দেশ এখন পুঁজি রফতানির দেশে পরিণত হচ্ছে। অথচ আমরা ব্যয়বহুল ভোগ কাঠামোর দিকে যাচ্ছি। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি দেশে বিএমডব্লিউ ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধিকে উল্লেখ করেন।

সার্বিক বাজেট কাঠামোর গুণগত পরিবর্তনের পরামর্শ রেখে সিপিডির অপর ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটের আকার বড় হলেও তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ছে না। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি সম্প্রসারণশীল বা বড় বাজেট নেয়ার অবস্থা বিদ্যমান। তবে বড় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে বড় বড় নীতির সংস্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি বাস্তবায়ন পর্যায়ে সংস্কার কর্মসূচিকে অধিক গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, দেশে প্রকল্প খরচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ভারতে ১ কিমি. সড়ক নির্মাণে সাড়ে ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে থাকে। অথচ আমাদের দেশে এ পরিমাণ রাস্তা নির্মাণে ব্যয় তার চাইতে ৩-৪ গুণ বেশি।

মধ্যম আয়ের দেশ কিংবা উন্নত দেশ হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা, তা প্রকল্প বাস্তবায়নে এ বাড়তি খরচ অন্যতম বাধা। এ কারণেই ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রবাহ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন হচ্ছে না। এটার কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধি না হওয়ার জন্যও দায়ী বলে মনে করেন তিনি।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভ্যাট আইনে নতুন হার ১২ শতাংশে নামানো উচিত। এটা একবারে না হলেও ধাপে ধাপে ভ্যাট কমিয়ে আনা যেতে পারে। নতুবা এ নতুন ভ্যাট আইন উৎপাদক ও ভোক্তার ওপর চাপ বাড়াবে।

আবার ১৫ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনার ফলে রাজস্বে যে ঘাটতি তৈরি হবে, সেটা পূরণে পেট্রোলিয়াম পণ্য, সিমেন্ট ও মোবাইল ফোন সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক না বসানোরও পরামর্শ দেন তিনি।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকিং খাত অর্থনীতিতে চরম নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। এটা আগের চেয়ে আরও অবনতি হয়েছে। খেলাপি ঋণের কারণে সুশাসনের অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে আছে। সরকার সেটা জনগণের করের টাকায় পূরণ করছে। কোনোরকম জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে না। একই অবস্থা বেসরকারি ব্যাংকেরও।

তিনি বলেন, গত ৪ বছর পর্যন্ত সিপিডির পক্ষ থেকে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে একটি কমিশন গঠন জরুরি। আমরা আশা করব, সরকার এর একটা পদক্ষেপ নেবে।

চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ (তৃতীয় সংস্করণ) সংক্রান্ত মূল প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাজস্ব আয়ে ৩৮ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকতে পারে। যদিও রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি ক্রমেই ভালো হচ্ছে। এরপরও সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা কমাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের বিপরীতে রাজস্ব আদায় সাড়ে ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যেই আটকে আছে। এর থেকে উত্তরণে তিনি ভ্যাট আইন কার্যকরের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ করে বিশেষ নজর এবং উৎসে কর সুনির্দিষ্ট করার কথা বলেন।

তিনি বলেন, অর্থনীতির আরেকটি দুর্বলতা হল সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার বেশি ঋণ নিচ্ছে। এটা অনেক আগেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। আর এসব ঋণের ফলে সরকারকে বাড়তি সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থ পাচার প্রতিরোধে তিনি আইনগত কাঠামোর গুণগত পরিবর্তন এবং এনবিআরের ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিএফআইইউকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দেন।

ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎসের আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ার বিষয়টিও শঙ্কার কারণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে খাদ্য মজুদ সর্বনিন্ম বলে দাবি করেন তিনি।

এবার শস্য খাতে প্রবৃদ্ধি বাস্তবতার চেয়ে বেশি ধরা হয়েছে বলেও মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, হাওরে ১৬ লাখ টন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হিসাবে এটা বিবেচনায় রাখা হয়নি।

তৌফিকুল ইসলাম খান আরও বলেন, এবার রফতানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। ফলে রফতানি বাড়াতে এ খাতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে।

শেয়ারবাজার এখন অনেক চাপে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু সংস্কার হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। মার্কেটে মূলধন কমে যাচ্ছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির উৎপাদন ও বিনিয়োগের মধ্যে সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে না।

বিও অ্যাকাউন্টে অস্বচ্ছতা দূর এবং আইপিওতে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকাণ্ড জোরদারের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সরকারি কোম্পানি বাজারে ছাড়াসহ ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট বাস্তবায়ন জরুরি। আমদানি খাত ভালো হলেও তার বেশিরভাগই হচ্ছে মূলধনী যন্ত্রপাতি। এগুলোর বেশিরভাগই বিদ্যুৎ খাতের। কিন্তু আমদানি খাতে বিনিয়োগ অনুযায়ী রিটার্ন আসছে খুবই কম।

রেমিটেন্সের ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে আইনগত ও কাঠামোগত জোরালো উদ্যোগ এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে