শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে সাদাকাতুল ফিতর

প্রকাশের সময়: ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ - বৃহস্পতিবার | জুন ২২, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকমডটবিডি: দেখতে দেখতে মাহে রমজানের শেষ দিকে চলে এসেছি আমরা। আজ ২৫ রমজান। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা শেষে মোমিন-মুসলমানের আরেকটি কর্তব্য হচ্ছে ফিতরা আদায় করা। শরীয়তে ফিতরাকে ‘যাকাতুল ফিতর এবং সাদাকাতুল ফিতর’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ ফিতরের যাকাত বা ফিতরের সদকা।

যাকাতুল ফিতর বলা হয় ওই জরুরি দানকে যা, রোজাদাররা ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অভাবীদের দিয়ে থাকে। এই যাকাতুল ফিতরের সঙ্গে ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ যাকাতের পার্থক্য রয়েছে। যাকাতুল ফিতর ব্যক্তির দিকে এবং যাকাত সম্পদের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। তাই ফকিহগণ যাকাতুল ফিতরকে শরীর কিংবা ব্যক্তির যাকাত হিসেবে বিবেচনা করেন। এটি একটি কল্যাণকর বিধান।

যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা। রোজাদার ব্যক্তি নিজের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে তাকে বিশুদ্ধ ও পবিত্র করেন। তাই তাকে যাকাতুল ফিতর বলা হয়। যাকাত শব্দের অন্য অর্থ হচ্ছে প্রবৃদ্ধি বা বাড়ানো। রোজাদার এই যাকাতের মাধ্যমে রোজাকে পবিত্র করে এর সওয়াব বৃদ্ধির কাজ করে থাকেন বলে এটিকে যাকাতুল ফিতর বলা হয়। শরীরের ময়লা দূর করার জন্য যেমন পানি দিয়ে গোসল করা দরকার, তেমনি রোজার ত্রুটি ও কালিমা দূর করার জন্যও যাকাতুল ফিতর দরকার।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূল (সা.) যাকাতুল ফিতরকে রোজাদারের বেহুদা কথা ও কাজ এবং গুনাহ থেকে পবিত্র করা এবং নিঃস্ব-অসহায় মিসকীনের খাবার উদ্দেশ্যে নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে তা আদায় করে, সেটি আল্লাহর কাছে কবুল হবে। আর যে ঈদের নামাজের পর তা আদায় করে তা অন্যান্য সাধারণ দান-সদকার মতো বিবেচিত হবে।’

এ হাদিসে যাকাতুল ফিতরের দুটি প্রধান উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে। রোজাদার অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গুনাহর কাজ করে রোজাকে অপবিত্র করে ফেলে এবং তাতে রোজা অপূর্ণাঙ্গ থাকে। তাদের এই দুর্বলতা কাটানোর জন্য রোজার শারীরিক ইবাদতের সঙ্গে কিছু আর্থিক ইবাদত তথা দান-সদকা আদায় করে রোজাকে পূর্ণাঙ্গ করার প্রচেষ্টা চালানো দরকার।

রাসূলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘আজ তাদের ধনী করে দাও।’ অর্থাৎ ঈদের দিন গরীব-মিসকীন ও অসহায় মানুষকে ধনীদের ন্যায় আনন্দ দান করার উদ্ধেশ্যে সচ্ছল করে দাও। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন অভাবী মানুষের দুঃখ দুর্দশা দূর করা হয়, অন্যদিকে পবিত্র উৎসবের দিনে এটি একটি বিরাট মানবিক বিষয়। কিছু লোক ঈদের আনন্দ উৎসব করবে, আর কিছু লোক তা থেকে বঞ্চিত হবে তা কি করে হয়?

ধনীর সম্পদ থেকে সামান্য অংশ গরীবদের মাঝে বিতরণ করলে যদি তাদের দারিদ্র দূর হয়, তাহলে মানবতার শ্রেষ্ঠ জীবন ব্যবস্থা ইসলাম কি করে এ ব্যাপারে উদাসীন থাকতে পারে এবং তাদেরকে ঈদের দিন মহান উৎসব থেকে নিরাশ করতে পারে? তাই এই মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইসলাম রোজাদারের ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছে।

ফিতরা দেয়ার সামর্থ্য রাখে এরকম প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের ও পরিবারের ঐ সমস্ত সদস্যদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে যাদের লালন-পালনের দায়িত্ব শরীয়ত কর্তৃক তার উপরে অর্পিত হয়েছে। (বোখারি)

ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- ‘আল্লাহর রাসূল (সা.) যাকাতুল ফিতর স্বরূপ এক সা খেজুর কিংবা এক সা যব দেওয়ার জন্য বলেছেন মুসলিম দাস ও স্বাধীন, পুরুষ ও নারী এবং ছোট ও বড়র প্রতি। আর তা লোকদের ঈদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বে আদায় করে দিতে আদেশ করেছেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)

অপর এক হাদিসে এসেছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমরা রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশায় এক সা’ খাদ্য, কিংবা এক সা’ খেজুর, কিংবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ পনির অথবা এক সা’ কিসমিস সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় করতাম। (বোখারি ও মুসলিম)

সুতরাং গম, আটা, খেজুর, কিসমিস, পনির ও যব ইত্যাদি পণ্যের যেকোনো একটি দিয়ে ফিতরা আদায় করা যায়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবার ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে এভাবে- গম ও আটা দিয়ে ফিতরা আদায় করলে অর্ধ সা’ বা এক কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৬৫ টাকা আদায় করতে হবে। যব দিয়ে আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৫৬০ টাকা আদায় করতে হবে।

কিসমিস দিয়ে আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১ হাজার ২৫০ টাকা আদায় করতে হবে। খেজুর দিয়ে আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১ হাজার ৬৫০ টাকা আদায় করতে হবে। আর পনির দিয়ে আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১ হাজার ৯৮০ টাকা আদায় করতে হবে।

মোমিন-মুসলমানরা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযাযী উপরোক্ত পণ্যগুলোর যেকোনো একটি পণ্য বা তার বাজার মূল্যের সমান ফিতরা আদায় করতে পারবেন। উপরোক্ত পণ্যসমূহের স্থানীয় খুচরা বাজার মূল্যের তারতম্য রয়েছে। ফলে এ অনুযায়ী স্থানীয় মূল্যে পরিশোধ করলেও ফিতরা আদায় হবে।

মুসলমান নারী-পুরুষ, ছোট-বড় ও শিশুদের ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। স্ত্রী ও শিশুদের ফিতর স্বামী কিংবা পিতা আদায় করবেন। ইমাম আবু হানিফা (র.),ইমাম শাফেঈ (র.), ইমাম আহমদ (র.) ও ইমাম মালেক (র.)-এর মতে স্বামীর ওপর স্ত্রীর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। কেননা স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর।

রাব্বুল আলামিন আমাদের যথাযথভাবে রোজা পালন ও সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের তাওফিক দান করুন। -আমিন।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে