শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল কদর

প্রকাশের সময়: ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ - বৃহস্পতিবার | জুন ২২, ২০১৭

আলহামদুলিল্লাহ। সকল প্রশংসা কেবলমাত্র এক আল্লাহর জন্য। আজ ১৪ জুলাই মঙ্গলবার দিবসের সূর্য অস্ত গেলেই এক অপার্থিব পবিত্রতায় আবৃত রজনীর আবির্ভাব ঘটবে এবং আগামী কাল বুধবার সূর্যোদয় অবধি এ রাতের মহিমাময় ফজিলত অব্যবহত থাকবে। মাহিমান্বিত এ রাতে মহান আল্লাহর কাছে পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিস্কৃতি লাভের পরম সৌভাগ্যের রজনী শবে কদর (لیلة القدر‎) আরবিতে লাইলাতুল কদর। এর অর্থ অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত বা পবিত্র রজনী। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বর্ননা অনুসারে, আল্লাহ এই রাত্রিকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই একটি মাত্র রজনীর উপাসনা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে সূরা ক্বদর নামে স্বতন্ত্র একটি পূর্ণ সুরা নাজিল হয়েছে। এই সুরায় শবে কদরের রাত্রিকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ রাতে আল্লাহ তা‘আলা পুরা কুরআন কারীমকে লাউহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানে নাযিল করেন। তাছাড়া অন্য আরেকটি মত আছে যে, (১) এ রাতেই কুরআন নাযিল শুরু হয়। পরবর্তী ২৩ বছরে বিভিন্ন সূরা বা সূরার অংশবিশেষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনা ও অবস্থার প্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র উপর অবতীর্ণ হয়। (২) এ এক রজনীর ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। (৩) এ রাতে পৃথিবীতে অসংখ্য ফেরেশতা নেমে আসে এবং তারা তখন দুনিয়ার কল্যাণ, বরকত ও রহমাত বর্ষণ করতে থাকে। (৪) এটা শান্তি বর্ষণের রাত। এ রাতে ইবাদত গুজার বান্দাদেরকে ফেরেশতারা জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির বাণী শুনায়। (৫) এ রাতের ফাযীলত বর্ণনা করে এ রাতেই একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়। যার নাম সূরা কদর। (৬) এ রাতে নফল সালাত আদায় করলে মুমিনদের অতীতের সগীরা গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াব লাভের আশায় কদরের রাতে নফল সালাত আদায় ও রাত জেগে ইবাদত করবে আল্লাহ তার ইতোপূর্বের সকল সগীরা (ছোট) গুনাহ ক্ষমা করেদেন। (বুখারী)। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয় আমি তা (কুরআন) ক্বদরের রাত্রিতে নাযিল করেছি। আপনি কি জানেন ক্বদরের রাত্রি কি ? ক্বদরের রাত্রি সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ রাত্রিতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এই রাত্রি পুরোপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার- ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত ।(সূরা আল- ক্কদর, আয়াত ১-৫) ”

আরবি ভাষায় ‘লাইলাতুন’ অর্থ হলো রাত্রি বা রজনী এবং ক্বদর শব্দের অর্থ মহাত্ম বা সম্মান, এই মহাত্ম ও সম্মানের কারণে একে লাইলাতুল ক্বদর, তথা মহিমান্বিত রাত বলা হয়। বারটি মাসের মধ্যে ফযিলতপূর্ণ মাস হল রমযান মাস। এই মাসের একটি রাত্র হচ্ছে লাইলাতুল ক্বদর। যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। কদরের রাত্রের ফযিলত ও মহাত্ম সম্পর্কে কুরআনুল করিমে সূরাতুল ক্বদর নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা আল-ক্বদর নাযিল হয়েছে । কদরের রাত্রের যাবতীয় কাজের ইঙ্গিত দিয়ে এ রজনীর অপার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের অন্যত্র ঘোষনা করেছেন,
“হা-মীম! শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) এক মুবারকময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। (সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ১-৪)”। শবে ক্বদরের ফযিলত ও মহাত্ম সম্পর্কে কুরআন পাকের এই বর্ণনাই যথেষ্ট। এ কারণে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কদর রজনীর ফযিলত সম্পর্কে তেমন কিছু বলেন নাই। তবে উহা কোন মাসে কোন তারিখে হতে পারে এবং উহা কারও নসীব হলে সে তখন আল্লাহর নিকট কি চাইবে সে সম্পর্কে তিনি উপদেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া এ রাতে ইসলামের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অনুসারীদের ভাগ্য, তাকদির পরিমাণ নির্ধারণও সন্মান বৃদ্ধি করা হয়। মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন এই রাত সর্ম্পকে হাদিস শরীফে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে।
৬১০ হিজরীতে শবে কদরের রাতে মক্কার নূর পর্বতের হেরা গুহায় ধ্যানরত মুহাম্মদের নিকট সর্বপ্রথম কোরআন নাজিল হয়। কোন কোন মুসলমানের ধারনা তার নিকট প্রথম সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়। অনেকের মতে এ রাতে ফেরেশতা জীবরাইল এর নিকট সম্পূর্ন কোরআন অবতীর্ন হয় যা পরবর্তিতে ২৩ বছর ধরে ইসলামের নবী মুহাম্মদের নিকট তার বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট আয়াত আকারে নাজিল করা হয়। ইসলাম ধর্ম মতে, মুহাম্মদ এর পূর্ববর্তী নবী এবং তাদের উম্মতগণ দীর্ঘায়ু লাভ করার কারনে বহু বছর আল্লাহর ইবাদাত করার সুযোগ পেতেন। কোরান ও হাদীসের বর্ননায় জানা যায়, ইসলামের চার জন নবী যথা আইয়ুব, জাকরিয়া , হিযকীল ও ইউশা ইবনে নূন প্রত্যেকেই আশি বছর স্রষ্টার উপাসনা করেন এবং তারা তাদের জীবনে কোন প্রকার পাপ কাজ করেননি। কিন্তু মুহাম্মদ (সঃ) থেকে শুরু করে তার পরবর্তী অনুসারীগণের আয়ু অনেক কম হওয়ায় তাদের পক্ষে স্রষ্টার আরাধনা করে পূর্ববর্তীতের সমকক্ষ হওয়া কিছুতেই সম্ভপর নয় বলে তাদের মাঝে আক্ষেপের সৃষ্টি হয়। তাদের এই আক্ষেপের প্রেক্ষিতে তাদের চিন্তা দুর করার জন্য সুরা ক্বদর নাজিল করা হয় বলে হাদিসের বর্ননায় জানা যায়। এই সুরায় শবে কদরের রাত্রিকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হজরত আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন_’তোমরা শবে কদরকে রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে সন্ধান করো।’ এই হিসাব অনুযায়ী শবে কদর ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজানের রাতগুলোতে অনুসন্ধান করা উচিত।
হজরত আবু জর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি আরো বলেছেন, হুজুর (সঃ)-এর নিকট আরজ করলাম, ‘শবে কদর নবীযুগের সঙ্গে নির্দিষ্ট, নাকি পরেও হবে?’ উত্তরে মহানবী (সঃ) ইরশাদ করলেন, ‘এটি কিয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে।’ আমি আরজ করলাম, ‘এটি রমজানের কোন অংশে হয়ে থাকে?’ তিনি বললেন, ‘শেষ ১০ দিনে অনুসন্ধান করো।‘ অতঃপর হুজুর (সঃ) অন্য কথাবার্তায় নিমগ্ন হলে আবার সুযোগ পেয়ে আমি আরজ করলাম, ‘এটা বলে দিন যে ১০ দিনের কোন অংশে হয়ে থাকে?’ এটা শুনে মহানবী (সঃ) এত বেশি অসন্তুষ্ট হলেন যে তিনি এর আগে এবং পরে আমার ওপর কখনো এরূপ রাগান্বিত হননি। এমতাবস্থায় বললেন, ‘এরূপ উদ্দেশ্য হলে আল্লাহ তাআলা কি বলে দিতে পারতেন না?’ শেষ দশকের রাতগুলোতে এটি অনুসন্ধান করো। এরপর আর কোনো কিছু এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করো না।
এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর অভিমত হলো, রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে এটি চক্কর দিয়ে থাকে। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মতে, এটি রমজান মাসের কোনো একটি রাতে হয়ে থাকে, যা নির্দিষ্ট রয়েছে; তবে আমরা অবহিত নই। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের মতে, একুশের রাতে হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-এর অভিমত, রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে এটি চক্কর দিয়ে থাকে। এ কারণে কোনো বছর এ রাতে, আবার কোনো বছর অন্য রাতে হয়ে থাকে। অধিকাংশ আলেমের অভিমত হচ্ছে, এটি ২৭ রমজানের রাতে হওয়ার ব্যাপারে প্রবল আশা রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেককেই নিজের সাহস ও সুযোগ মোতাবেক পুরা রমজান মাসেই এ রাতকে অনুসন্ধান করা উচিত। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে রমজান মাসের শেষ ১০ দিনকে গনিমত বুঝে নেওয়া উচিত। এটুকুও সম্ভব না হলে শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোকে হাতছাড়া করা যাবে না। যদি এতটুকুও সম্ভব না হয়, তাহলে ২৭ তারিখের রাতকে গনিমতরূপে মনে করতে হবে। হজরত ইবনে আব্বাস (রঃ) বলেন, ‘আমি শবে কদরের সন্ধান লাভের জন্য বেজোড় সংখ্যাগুলোর ওপর চিন্তা করে বুঝতে পারলাম ৭ সংখ্যা যুক্ত ২৭ তারিখটাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।’
অতঃপর হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এ সংখ্যাতত্ত্বের দ্বারা এটাই অনুমিত হয় যে অধিকাংশ বস্তুই আল্লাহ তায়ালা সাতের হিসাব মোতাবেক সৃষ্টি করেছেন। তাই শবে কদর যদি রমজানুল মুবারকের শেষ ১০ রাতের মধ্যে হয়, তাহলে বর্ণিত বিবরণ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে শবে কদর ২৭ তারিখের রাতেই হবে। পবিত্র কোরআনের সুরা কদরের আয়াত ‘সালামুন হিয়া’র পরবর্তী ‘হিয়া’ শব্দটি ২৭ অক্ষরের পরে এসেছে।
শবে কদরের ব্যাপারেও ইমাম আবু হানিফা থেকে একটি তাত্তি্বক বিষয় বর্ণিত হয়েছে যে সুরা কদরের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা এই রাতকে ‘লাইলাতুল কদর’ বলেছেন, যার মধ্যে হরফ সংখ্যা ৯টি; এবং এই শব্দ দুটি আল্লাহ তায়ালা এই সুরায় মোট তিনবার উল্লেখ করেছেন। তাই মোট হরফের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৩ = ২৭। এর জন্য ২৭ তারিখের রাতেই লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
শায়খ আবুল হাসান (রঃ) সারা জীবনের এ-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা মৃত্যুর সময় এভাবে বর্ণনা করেছেন যে রমজান মাসের প্রথম তারিখ রবি ও বুধবার হলে লাইলাতুল কদর ২৯ তারিখ, সোমবার হলে ২১ তারিখ, মঙ্গল ও শুক্রবার হলে ২৭ তারিখ, বৃহস্পতিবার হলে ২৫ তারিখ এবং শনিবার হলে ২৩ তারিখে হয়ে থাকে। তবে সার্বিক বিবেচনায় রমজান মাসের ২৭ তারিখে অধিকাংশ বছর শবে কদর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে বিধায় গোটা মুসলিম বিশ্বে সাধারণত এই রাতেই লাইলাতুল কদর হিসেবে ইবাদত-বন্দেগি করা হয়ে থাকে। অনেকেই লাইলাতুল কদর পাওয়ার আশায় রমজান মাসের শেষ ১০দিন ইতিকাফে লিপ্ত থাকেন। এবছর আমাদের দেশসহ পাশ্ববর্তি দেশ সমুহে পবিত্র মাহে রমযান মাস শুরু হয়েছে শুক্রবারে। তাই শায়খ আবুল হাসান (রহঃ) এর অভিজ্ঞারা আলোকে বলা যায় এবছর ২৭ রমজান লাইলাতুল কদরের রজনী হবার সম্ভবনা রয়েছে।

লাইলাতুল কদর গোটা মানবজাতির জন্য অত্যন্ত পুণ্যময় রজনী। এ রাত্রি বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর অশেষ রহমত, বরকত ও ক্ষমা লাভের অপার সুযোগ এনে দেয়। সুতরাং এ রাতে তারাবি-তাহাজ্জুদসহ অধিক নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, একাগ্রচিত্তে দোয়া এবং অতীত পাপমোচনে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য পরিবার-পরিজনকে উদ্বুদ্ধ করা উচিত। ইবাদতের মাধ্যমে রাত্রি জাগরণই মুমিন মুসলমানের প্রধান কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সিজদায় বান্দা তার প্রভুর অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। তাই তোমরা অধিক দোয়া করো।’ (মুসলিম)। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে বেশি-বেশি করে ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে লাইলাতুল কদরের ফযীলত অর্জন করে তার নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন।-

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে