বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৮ | ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা জঙ্গি অর্থায়নে জড়িত!

প্রকাশের সময়: ১২:১৫ অপরাহ্ণ - সোমবার | জুলাই ১০, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকমডটবিডি: বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের অনেক গ্রাহকের বিরুদ্ধে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অর্থায়নের অভিযোগ উঠেছে। জঙ্গি অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের গঠিত কমিটির বৈঠকে এ অভিযোগ করা হয়। বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের বিষয় অভিযোগ করেন খোদ ব্যাংকের পর্ষদের একজন পরিচালক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত অভিযোগসহ বিভিন্ন অনিয়ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবেন। বৈঠকে উপস্থিত সরকারের বেশিরভাগ নীতিনির্ধারকই ইসলামী ব্যাংকের নানা ধরনের অনিয়ম নিয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, ব্যাংকে আমানত রেখে যেসব গ্রাহক মুনাফা নিচ্ছেন না তাদের খাতে বরাদ্দ অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি সরকার দেশে জঙ্গিবাদের অর্থের উৎস অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদারকরণ এবং এ কার্যক্রম অধিকতর সমন্বয়ের লক্ষ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের ট্রাস্কফোর্স গঠন করে। গত ২১ জুন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ ট্রাস্কফোর্সের তৃতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওইসব সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু সালেহ মো. জহরুল হক, বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ও গেয়োন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত বেশিরভাগ প্রতিনিধিই ইসলামী ব্যাংকের নানা অনিয়ম নিয়ে কথা বলেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়ন ও নানা অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাপকভিত্তিক তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুতর অভিযোগ উপস্থাপন করেন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের স্বতন্ত্র পরিচালক ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল। তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকে বর্তমানে ৬৭ হাজার ৯২৫ কোটি টাকার ডিপোজিট আছে। গ্রাহক সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ, যার ৮০ শতাংশ ধর্মভীরু। এর মধ্যে ২০ শতাংশ আমানতকারী মওদুদী আদর্শের জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের লোক। এই ২০ শতাংশ আমানতকারী জঙ্গিবাদের অর্থের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকে মোট ঋণের পরিমাণ ৬১ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা। বর্তমানে ৭ লাখ ৫১ হাজারের মতো ঋণগৃহীতা আছে, যার ৮০ শতাংশ হলো জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের ত্যাগী নেতা ও ক্যাডার। বাকি ২০ শতাংশ সাধারণ ঋণগ্রহীতা ও ব্যবসায়ী। জনগণের আমানতের টাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন ধারণ এবং এর অংশবিশেষ দিয়ে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ লোক জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি ও সন্ত্রাস-জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত।’

মহাপরিচালক বলেন, ‘ব্যাংকের অধিকাংশ কর্মকর্তা আগে শিবিরের সঙ্গে জড়িত ছিল বিধায় তারা বিভিন্ন ধরনের জঙ্গি অর্থায়নে ভূমিকা রাখে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হামিদ মিঞার সঙ্গে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভ করেন তার একান্ত সচিব। তিনি জানান, আলোচ্য বিষয়ে এমডি কোনো মন্তব্য করবেন না। তিনি আরও জানান, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কোনো বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে মন্তব্য করতে পারবেন একমাত্র চেয়ারম্যান। ব্যাংকের সর্বশেষ বোর্ড মিটিংয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ইসলামী ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএমডি আবু রেজা ইয়াহিয়া বলেন, চেয়ারম্যান ছাড়া এ বিষয়ে ব্যাংকের অন্য কেউ কোনো মন্তব্য চান না। ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বর্তমানে দেশের বাইরে। তার সঙ্গে মোবাইল অ্যাপস ইমো ও ভাইবারে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। ফলে এসব বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব কোনো বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। সভায় সিদ্ধান্তে সব গোয়েন্দা সংস্থা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ ব্যাংককে ইসলামী ব্যাংকের ৯০ শতাংশ ঋণগ্রহীতা জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এই ঋণের অর্থ জঙ্গিবাদে ভূমিকা রাখছে কিনা তা বাংলাদেশ ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে তদারকির জন্য বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, এ বিষয়ে কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। বিষয়টি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) দেখাশোনা করেন। তাই কোনো কিছু না জেনে এখনই মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ইসলামী ব্যাংক বিধিমোতাবেক পরিচালনা করার জন্য সাতজন নিরপেক্ষ পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক পরিচালনা পরিষদ ইসলামী ব্যাংকের জঙ্গি অর্থায়নসহ বিভিন্ন অনিয়ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবেন। এ ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক গঠিত বিএফআইইউ আইন নিয়োগকারী সংগঠনের মাধ্যমে অবৈধ স্বার্থের লেনদের বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।

তিনি আরও বলেন, শরিয়া ব্যাংকের দুটি নীতি ওয়াদিয়া ও মুদারাবা অনুযায়ী আমানতকারীর কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করা হয়। মুদারাবা আমানতকারীদের চুক্তি অনুযায়ী লভ্যাংশ দেয়, যা ওই আমানতকারীদের হিসাবে প্রদান করা হয়। কিন্তু আল ওয়াদিয়া আমানতের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হয় না। আল ওয়াদিয়া আমানতের ক্ষেত্রে লভ্যাংশের হিসাবায়ন করা হয় না, বিধায় আমানতকারীদের উদ্বৃত্ত লভ্যাংশের বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

বৈঠকে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ মো. জহরুল হক বলেন, ইসলামী ব্যাংকের কিছুসংখ্যক আমানতকারী সুদমুক্ত আমানত রাখেন। প্রচলিত ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী, ওই আমানতের সুদ বা লভ্যাংশের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার বিধান থাকলেও ইসলামী ব্যাংক তা জমা করেন না। এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বিএফআইইউর মহাব্যবস্থাপক দেব প্রসাদ দেবনাথ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অবৈধ অর্থের লেনদেন বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত সিএসআর নীতিমালার নির্দেশনা মোতাবেক বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকে সিএসআরের অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বলেন, ইসলামী ব্যাংক সিএসআরের অর্থের বিষয়ে এখন পর্যন্ত বাস্তব কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। তবে সরকারকে দেখানোর মতো কিছু টাকা বিভিন্ন খাতে দেওয়া হয়েছে।(আমাদের সময়)

উপরে