শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

ট্যানারি শ্রমিকদের সঙ্গী চর্মরোগ-হাঁপানি

প্রকাশের সময়: ১২:৩৬ অপরাহ্ণ - শুক্রবার | আগস্ট ১৮, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি:

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থেকে আট বছর আগে ভাগ্যান্বেষণে ঢাকায় আসেন সালমা বেগম। ঠিকানা হয় হাজারীবাগের একটি ট্যানারি কারখানায়। সেই থেকে তার পরিচয় ট্যানারি শ্রমিক। এই আট বছরে সালমা বেগমের ভাগ্য কতটা ফিরেছে বোঝা না গেলেও রোগের চিহ্নটা বেশ স্পষ্ট। চার বছর ধরেই চর্মরোগ নিয়ে কাজ করছেন। ট্যানারি না ছাড়লে এ থেকে মুক্তি নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। স্বামী-সন্তান নিয়ে তাই গ্রামে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সালমা বেগম।

সালমা বেগম ট্যানারি ছাড়ার কথা ভাবলেও সে উপায় নেই নোয়াখালীর ইলিয়াস আলীর। ২০ বছর ধরে ট্যানারিতেই কাজ করছেন। অন্য কিছু আর শেখা হয়নি। তবে বেড়েছে পরিবারের সদস্য সংখ্যা। চিকিৎসকরা ট্যানারি ছাড়তে বললেও পরিবারের দিকে তাকিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে ১০ বছর ধরে চর্মরোগে ভোগা ইলিয়াস আলীকে।

দীর্ঘমেয়াদি এ চর্মরোগ শুধু সালমা বেগম বা ইলিয়াস আলীর একার নয়, ট্যানারিতে কর্মরত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শ্রমিকই এ সমস্যায় ভুগছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের এক জরিপও বলছে, ট্যানারি শ্রমিকদের প্রায় ৭৪ শতাংশই চর্মরোগে আক্রান্ত। আর হাঁপানিতে ভুগছেন ৫০ শতাংশ শ্রমিক।

সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের আগে গত বছরের মাঝামাঝি সময় হাজারীবাগের ট্যানারি শ্রমিকদের ওপর জরিপটি চালায় লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট। ১৫ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ২৭৬ জনকে বেছে নেয়া হয় জরিপের জন্য। তাদের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনা ও রোগ পরীক্ষার মাধ্যমে জরিপটি সম্পন্ন করা হয়। তাতে দেখা যায়, চর্মরোগ ছাড়াও ট্যানারি শ্রমিকরা শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েডেও ভুগছেন উচ্চহারে।

জরিপ দলের প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির সহকারী অধ্যাপক উত্তম কুমার রায় বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বুট-গ্লাভসের মতো সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহার না করায় ট্যানারি শ্রমিকরা চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করলে রোগের প্রকোপ কম হতো।

এসব সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার যে অপ্রতুল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরী পরিদর্শনেও। গত মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ কারখানায়ই শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহারের ব্যবস্থা নেই। সুপ্রতিষ্ঠিত দু-একটি কারখানায় এসব সরঞ্জাম ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকলেও তা যত্সামান্য। যদিও ট্যানারির মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে গ্লাভস, অ্যাপ্রোন, নিরাপত্তা বুট ও গগলসের মতো সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে।

সাভারের ট্যানারিপল্লীতেই কথা হয় চার বছর ধরে চর্মরোগে ভোগা শ্রমিক সালমা বেগমের সঙ্গে। চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর মাঝেমধ্যে হাতে গ্লাভস ব্যবহার করলেও সবসময় তা মেলে না বলে জানান এ শ্রমিক। তার ভাষায়, অনেক চাওয়ার পর এক জোড়া গ্লাভস পাওয়া যায় হয়তো, কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করতে হয় টানা ১৫ দিন পর্যন্ত।

কয়েকটি ট্যানারি ঘুরে দেখা যায়, বুট ব্যবহারকারী শ্রমিকের সংখ্যাও অনেক কম। একটি কারখানায় মাত্র কয়েকজন শ্রমিককে বুট পরিহিত অবস্থায় দেখা গেলেও বেশির ভাগই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খালি গায়ে কাজ করছেন। মাস্ক, গগলস বা অ্যাপ্রোনের ব্যবহারও সেভাবে নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের ওই জরিপও বলছে, কাজের সময় ব্যক্তিগত সুরক্ষায় গ্লাভস ব্যবহার করেন মাত্র ২৬ শতাংশ শ্রমিক। এছাড়া নিরাপত্তা বুট পরে কাজ করেন ১৬ ও মাস্ক ব্যবহার করেন ২৬ শতাংশ শ্রমিক। তবে অ্যাপ্রোন ও গগলসের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এ দুটি নিরাপত্তা উপকরণ ব্যবহার করেন ট্যানারি শ্রমিকদের যথাক্রমে ২ ও ১ শতাংশ। সুরক্ষামূলক উপকরণ ছাড়াই যেসব শ্রমিক কাজ করেন, তাদের মধ্যেই এসব রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি।

এসব রোগের পাশাপাশি ট্যানারি শ্রমিকদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা।

ট্যানারি শ্রমিকরা ব্যাপক মাত্রায় চর্মরোগে ভুগলেও তাদের চিকিৎসার জন্য সরকার কিংবা ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেই। ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিত্সার ব্যবস্থা পর্যন্তও নেই তাদের জন্য। শ্রমিকদের আক্ষেপ, হাজারীবাগেও চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, কিন্তু সেখানে তো হাতের কাছে চিকিৎসক পাওয়া যেত। সাভারে সে ব্যবস্থাও নেই।

ট্যানারি শ্রমিক আবুল হাসান বলেন, ১০ বছর ধরে ট্যানারিতে কাজ করছি। চার-পাঁচ বছর হলো চর্মরোগে ভুগছি। ১ হাজার টাকা ফি দিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে ডাক্তার দেখিয়েছি। চিকিৎসা খরচ আমাদেরই চালাতে হয়। মালিকপক্ষের তরফ থেকে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই আমাদের জন্য।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিয়ে আমরাও চিন্তিত। এজন্য সাভারে একটি হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি তাদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা ও জীবন বীমা করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। সাধ ও সাধ্যের মিল হলে ভবিষ্যতে এ পদক্ষেপগুলো নেয়া হবে।

ট্যানারি শ্রমিকদের আরেকটি সাধারণ রোগ হাঁপানি। অধিকাংশ শ্রমিকই এ সমস্যায় ভুগছেন। হাঁপানি আক্রান্ত শ্রমিকদের নিজেদের টাকায় ইনহেলারসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্য কিনতে হয়। তবে ট্যানারিতে কাজ করে যে মজুরি পান, তা দিয়ে অনেকের পক্ষেই এ ব্যয় সংকুলান করা সম্ভব হয় না। বেশির ভাগ ট্যানারি শ্রমিকের মাসিক মজুরি ১০ হাজার টাকার নিচে। যেসব শ্রমিক ১৫-২০ বছর ধরে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত, তারাই কেবল ১৫ হাজার টাকা মজুরি পান।

ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ট্যানারি হাজারীবাগে থাকার সময় থেকে শ্রমিকদের জন্য ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতালের দাবি জানিয়ে আসছি আমরা। জায়গা সংকটের কারণে ট্যানারি মালিকরা আমাদের সে দাবি রাখেননি। সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর হলে শ্রমিকদের জন্য হাসপাতালের ব্যবস্থা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মালিকরা। সে প্রতিশ্রুতিও এখন পর্যন্ত রাখেননি তারা।

উপরে