শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

যশোরে চিকিৎসকের ভুল অস্ত্রোপচারে গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগ

প্রকাশের সময়: ৩:০৫ অপরাহ্ণ - রবিবার | আগস্ট ২০, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি:

ইয়ানূর রহমান, যশোর প্রতিনিধি: শনিবার (১৯ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১০টা। ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্রোপচারে জীবন সংকটাপন্ন হওয়া প্রসূতি তাহমিনা শারমিনকে (৩০) নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে। তাকে পুনরায় অস্ত্রোপচার করবেন সরকারি এই হাসপাতালের চিকিৎসকরা।

কক্ষের মধ্যে নেয়ার আগেই প্রসূতি তাহমিনা তার স্বামী ও স্বজনদের হাত ধরে বলছেন, অস্ত্রোপচারের পর আমি বেঁচে যাবো তো। আমি মারা গেলে আমার শিশু সন্তানরা বড় অসহায় হয়ে যাবে। আমার কিছু হয়ে গেলে তোমরা ওদের দিকে খেয়াল রেখো। সন্তান দুটোকে আমি খুব ভালোবাসি। কথাগুলো বলার সময় এই প্রসূতি রোগীর দু’চোখে পানি টলমল করছিলো। আর মায়ের মুখে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো ৪ বছরের শিশুকন্যা সীনা খাতুন। কিন্তু চিকিৎসকরা কয়েক ঘণ্টা আপ্রাণ চেষ্টা করে বাঁচাতে পারেননি দু’সন্তানের জননী তাহমিনা শারমিনকে। অস্ত্রোপচার করার পরই তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাহমিনা শারমিন মাগুরার শালিখা উপজেলার পিয়ারপুর গ্রামের সাজ্জাদুর রহমান ওরফে সাজ্জাদের স্ত্রী। তার স্বজনদের অভিযোগ, যশোর মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ডা. তানজিলা ইয়াসমিনের ভুল অস্ত্রোপচারের কারণে প্রসূতি তাহমিনা শারমিনের মৃত্যু হয়েছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তাহমিনা শারমিন নামের অন্তঃসত্ত্বা এই গৃহবধূকে গত ১ আগস্ট ভর্তি করা হয় যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের এক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এদিন বিকেলে যশোর মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ডা. তানজিলা ইসলাম সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওই রোগীর পেট থেকে একটি কন্যা সন্তান বের করেন।

তাহমিনা শারমিনের স্বামী সাজ্জাদুর জানান, অস্ত্রোপচার করার সময় চিকিৎসক তাকে বলেছিলেন, রোগীর রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না। রোগীকে বাঁচাতে হলে তার জরায়ু কেটে ফেলতে হবে। এ সময় জরায়ু কেটে ফেলার অনুমতিও দেন সাজ্জাদুর। তিনি জানতেন তার স্ত্রীর জরায়ু কেটে ফেলা হয়েছে। ৫ আগস্ট অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক ছাড়পত্র দিলে তিনি স্ত্রী তাহমিনাকে বাড়িতে নিয়ে যান। সাজ্জাদুর রহমান আরো জানান, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য ১০ হাজার টাকায় চুক্তি করা হয়েছিলো। পরে জটিল অস্ত্রোপচার করা বাবদ ১৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন ওই চিকিৎসক। সব মিলিয়ে তার খরচ হয় ৪৬ হাজার টাকা।

স্বজনরা জানিয়েছেন, বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পরেই প্রসূতি তাহমিনা শারমিনের পেটে ব্যথা শুরু হয়। গত ১৬ আগস্ট ব্যথা প্রচন্ড আকার ধারণ করলে ডা. তানজিলা ইসলামের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারস্থ ব্যক্তিগত চেম্বারে আনা হয় রোগীকে। ওই চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ভর্তি করা হয় উত্তরা হসপিটালে। সেখানে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৭ আগস্ট যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পরে আল্ট্রাসনো রিপোর্টের মাধ্যমে জানা যায়, রোগীর জরায়ুর ভিতর রক্ত জমাট হয়ে গেছে। বিষয়টি জানার পর হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা রোগীর ফের অস্ত্রোপচারের উদ্যোগ নেন। কেননা জরায়ুতে রক্ত জমাট হওয়ার কারণে তার অবস্থা ছিলো সংকটাপন্ন। শনিবার তাকে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে অপারেশন কার্যক্রম চালায় চিকিৎসকরা। কিন্তু রোগীর অবস্থার অবনতি হতে থাকে ক্রমেই। যে কারণে চিকিৎসকরা তাকে খুলনায় স্থানান্তর করেন। দুপুর আড়াইটার দিকে তাহমিনাকে নিয়ে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হন স্বজনেরা। পথিমধ্যে রূপদিয়ার কাছে পৌঁছাতেই মারা যান প্রসূতি তাহমিনা শারমিন। বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রসূতির স্বামী সাজ্জাদুর রহমান অভিযোগ করেন ডা. তানজিলা ইয়াসমিনের ভুল অস্ত্রোপচারে তার স্ত্রী অকালে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো। বড় অসহায় হয়ে গেলো তার দু’শিশু সন্তান। বেশি কষ্ট হচ্ছে ১৯ দিনের ওই শিশু কন্যার কথা ভেবে। ভুল অস্ত্রোপচারে স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় তিনি ডা. তানজিলা ইসায়মিনের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ডা. তানজিলা ইয়াসমিনের সাথে। তিনি আমাদের প্রতিনিধিকে জানান, রোগীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে কোনো প্রকার ত্রুটি ছিলো না। তিনি রোগীকে সুস্থ করে ছাড়পত্র দিয়েছেন। অন্য কোনো কারণে রোগীর জরায়ুতে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে জানান, অস্ত্রোপচার করাকালীন রোগীর জরায়ু দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় সেটি কেটে ফেলার জন্য তার স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জরায়ুটি তিনি আর কাটেননি। তাহলে অস্ত্রোপচারের পরে কিভাবে ওই রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে গেলো এ ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি ডা. তানজিলা ইয়াসমিন।

ওই রোগীর ফের অস্ত্রোপচার কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ওয়াহিদুজ্জামান আজাদ জানান, প্রসূতি তাহমিনা শারমিনের জরায়ুর মধ্যে রক্তক্ষরণ হয়ে তা জমাট বেঁধে যায়। এছাড়া পেটের নাড়িগুলো ছিলো অগোছালো অবস্থায়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অনেক চেষ্টা করেও ওই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

এই চিকিৎসক আরো বলেন, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর জরায়ুটি কেটে বাদ দিলে এমনটার সৃষ্টি হতো না।

উপরে