বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ | ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

‘পাতা খেয়ে টানা আটদিন হেঁটেছি’ -রোহিঙ্গা নারী রশিদা

প্রকাশের সময়: ৯:৩৫ অপরাহ্ণ - সোমবার | সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি:

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয়দের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার হয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা। এদেরই একজন রাখাইন রাজ্য থেকে আসা রশিদা। তিনি চট্টগ্রামের কক্সবাজারের উখিয়ার উনচি প্রাঙ্ক শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আলজাজিরার প্রতিবেদক।

সহিংসতায় সবকিছু হারানো রশিদা বিশ্ববাসীর কাছে যে বার্তা তুলে ধরেছেন, তা অনুবাদ করে তুলে ধরা হলো।

“আমার নাম রশিদা, বয়স ২৫। রাখাইনে সহিংসতা শুরুর আগে আমি অত্যন্ত সাধারণ জীবন-যাপন করতাম। আমাদের ধানিজমি ছিল, আমরা সেটা চাষাবাদ করতাম। একটি বাড়ি ছিল, যেখানে স্বামীসহ তিন সন্তান নিয়ে থাকতাম। শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপন করতাম। এই সংকট শুরু হওয়ার আগে আমরা অনেক সুখী ছিলাম।

কিন্তু এখন আমি সবকিছু হারিয়েছি। আমাদের বাড়িঘর, ধানক্ষেত সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আমাদের আর কোনো উপার্জনের উপায় নেই।

যখন গ্রামে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গুলি করতে শুরু করে, তখন আমি আমার তিন সন্তান নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাই। তাদের সেখানে লুকিয়ে রাখি। জঙ্গলের ভেতর বন্য পশুর ভয়ে আমার সন্তানরা সব সময়ই ভীত থাকত। কিন্তু আমি যখন বাড়ির অবস্থা দেখতে যাই, দেখি, আমাদের লোকজনকে সামরিক বাহিনী হত্যা করেছে। তাদের লাশ ওই অবস্থাতেই পড়ে আছে।

এ অবস্থা দেখার পর আমি জঙ্গলে ফিরে এসে সন্তানদের নিয়ে সীমান্তের উদ্দেশে রওনা দেই। টানা আটদিন হাঁটার পর বাংলাদেশে আসতে সক্ষম হই। জঙ্গলে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিলাম। কিন্তু খাবার মতো কিছুই ছিল না। বাধ্য হয়ে গাছের পাতা খেয়েছি। ক্ষুধায় কাতর বাচ্চারা খাবার চেয়েছে, কিন্তু কিছুই দিতে পারিনি। কারণ তিন সন্তান ছাড়া সঙ্গে আর কিছুই আনতে পারিনি।

মিয়ানমার আর বাংলাদেশের সীমান্তে নদী রয়েছে। আমরা সেই নদী ছোট্ট একটি নৌকায় করে পার হয়েছি। এটা ছিল খুবই বিপজ্জনক। মাঝে মাঝে মনে হতো নৌকা বুঝি ডুবে যাচ্ছে। তখন কাপড় দিয়ে আমি আমার সন্তানদের শক্ত করে বাঁধি।

আমি বাংলাদেশে ভালো নেই। ফেলে আসা গৃহপালিত পশু-পাখি, এক একর ধানিজমি, একটি বাড়ি আর আমাদের সেই অত্যন্ত সুন্দর গ্রামটা, সেখানে আমি চলে যেতে চাই। আমরা সব ফেলে এসেছি। আমি নিশ্চিত, (প্রতিবেদককে উদ্দেশ্য করে) আপনি কল্পনা করতে পারছেন না, আমরা কতটা কষ্টে আছি।

আমার বাড়ির কথা মনে পড়ে। এখানে আমরা খুব অসহায়। আমি জানি না, আমাদের ভাগ্যে কী আছে। কী ঘটতে যাচ্ছে।

আমরা এখানে প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছি না। বাংলাদেশের মানুষ অনেক ভালো, দয়ালু। তারা আমাদেরকে কাপড় ও খাবার দিয়েছে। কিন্তু আমি কোনো আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থাকে আমাদের সাহায্য করতে দেখিনি। আশা করছি, তারা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। আমাদের এখনো খাওয়ার মতো খাবার নেই।

বিশ্ববাসীর কাছে আমি এই বার্তা দিতে চাই, আমরা শান্তি চাই। শান্তি ছাড়া আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।’

কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলে আসছিল নির্যাতন। এর মধ্যে গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ২৪টি পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ‘বিদ্রোহী রোহিঙ্গাদের’ সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) এই হামলার দায় স্বীকার করে। এ ঘটনার পর থেকেই মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন শুরুর পর থেকে রোহিঙ্গারা পাড়ি জমাতে শুরু করে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে অবস্থানের সুযোগ পেলেও, অনেকেই আবার অবস্থান করছেন দুই দেশের সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মতে, নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর প্রায় তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা বেড়ে তিন লাখের ওপরে যাবে। বাংলাদেশ সরকার বলছে, মিয়ানমারে চলমান সহিংসতায় প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা মারা গেছে।

উপরে