সোমবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৮ | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে হাঁস পালনে স্বাবলম্বী যুবক শফিকুল! ৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে কোটিপতি

প্রকাশের সময়: ৩:০০ অপরাহ্ণ - বুধবার | নভেম্বর ৮, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি
গোলাম রব্বানী-টিটু (শেরপুর) প্রতিনিধি:
হাঁস পালনে স্বল্প পূঁজিতে বেশি লাভ,জয়গা লাগে কম। বিল,ঝিল,খাল পুকুর বা ভাসমান পদ্ধতিতেও হাঁস পালন করা যায়। বেকারত্ব দূর হয় সহজেই। হাঁস পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছে অনেক যুবক। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশ ভ’মিকা রাখছে হাঁস খামারীরা। হাঁস পালনে স্বাবলম্বী এমনি এক যুবক জিরো থেকে হিরো হয়েছেন শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে। তিনি প্রমান করে দিয়েছেন পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। নাম তাঁর শফিকুল ইসলাম। অত্যন্ত সহজ সরল শান্ত ও হাসি মুখে কথা বলেন সব সময়। নালিতাবাড়ী উপজেলার কলসপাড় ইউনিয়নের উত্তর নাকশী গ্রামের মো: সিরাজুল ইসলামের বড় ছেলে শফিকুল ইসলাম(২৮)। আজ থেকে ৮ বছর আগে মাত্র ৬ হাজার টাকা বিণিয়োগ করে হাঁসপালন করে তিনি এখন প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।
শফিকুলের পরিবারের পূর্বের ইতিহাস
শফিকুলের বাবা অল্প বেতনে বা পেটে ভাতে কাজ করতো অন্যের বাড়িতে। মা করতো ঝিয়ের কাজ। আর শফিকুল কাজ করতো চা-য়ের দোকানে। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো তাদের। মাথা গুঁজার ঠাঁই ছিল না। অন্যের জায়গায় জঙ্গলে ছিল একটি ঝোপড়িঘর। বনপাতায় ছাউনি। সেই ঘরেই বাস করতো তারা। বাবা সারাদিন শ্রমিকের কাজ করে যা পেত তা দিয়েই সংসার। অভাব যাদের ঘর ছাড়েনা তাদের পড়া লেখার চিন্তাই করা যায় না। যে বয়সে শিশুরা স্কুলে যেত সেই বয়সে শফিকুল চা-য়ের দোকানের পিচ্চি। বাবার বড় সন্তান শফিকুল। তাই সংসারের চাপ তার উপরেও ছিল। ছোট ভাই বোনদের ভরণ পোষণ তাকেও বহন করতে হতো। শফিকুলের জন্মের পর বাবার স্বপ্ন ছিল তাকে মানুষের মতো মানুষ গড়বে। বাবা তাকে যথারীতি স্কুলে ভর্তি করে। লেখাপড়া চলতে থাকে। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ওঠে। সংসারের ঘানি টানতে টানতে বাবা অস্থির হয়ে যায়। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যায়। স্কুল পড়–য়া শফিকুলের গায়ের পোশাক ছিড়ে যায়। স্কুলে যাওয়ার মতো কোন পোষাক থাকে না। খালি গায়ে স্কুলে যাওয়া সম্ভব নয়। একটি প্যান্ট ও একটি গেঞ্জি কিনে দেওয়ার মতো অর্থ থাকে না বাবার। তাই তার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তার লেখাপড়া একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকেই শফিকুল কর্ম বেছে নেয়। ১০ টাকা বেতনে চাকরি পায় চায়ের দোকানে। শিশু বয়সটা কেটে যায় তার চায়ের দোকানে। পরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে সে সংসারের হাল ধরে।
খামারের শুরু
বাবা সিরাজুল ইসলাম স্থির করে পুত্রকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তাই বহু কষ্টে ঋণধার করে ৬ হাজার টাকা সংগ্রহ করে। শফিকুলকে বুদ্ধি দেয় হাঁস খামার গড়ে তুলতে। শফিকুল এই টাকা দিয়ে নান্দাইল চৌরাস্তা থেকে ৬০টি হাঁসের বাচ্চা ক্রয় করে। বাচ্চাগুলো বাড়ির পাশের্^ বিলে ভাসমান অবস্থায় পালন করতে থাকে। এই বাচ্চাগুলো পরিণত বয়সে ডিম দিতে শুরু করে। পরবর্তীতে এই ডিম কোম্পানীতে দিয়ে শফিকুল আবার ৫শ’ বাচ্চা ক্রয় করে নিয়ে আসে। বিলের ধারে একটি ছোট্ট ঘর ওঠায়। সেই ঘরেই হাঁসগুলো পালন করতে থাকে। প্রতি বছর বেশ লাভ আসতে থাকে। হাঁসের ডিম বিক্রি করে প্রচুর লাভ আসতে থাকে। বিলের ধারে এক চিলতে জায়গা ক্রয় করে শফিকুল। এভাবে তাঁর আয় বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে জায়গাও কিনতে থাকে। পুকুর খনন করে। হাঁস পালনের সাথে সাথে সে মাছ চাষ শুরু করে। কারণ মাছ চাষে তাঁর কোন ব্যয় নেই। হাঁসের বিষ্ঠা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে। হাঁস এবং মাছ দুটোই সমানতালে চলতে থাকে।
শফিকুলের বর্তমান অবস্থা
শফিকুলের খামারে বর্তমানে হাঁস আছে ১ হাজার ৫শ’টি। দু’এক মাস হলেই এই বাচ্চাগুলোর পরিণত বয়স হবে। ডিম দিতে শুরু করবে। হাঁসের থাকার জন্য রয়েছে দুটি ঘর। দুটি ঘরের নিচে রয়েছে বিশাল দুটি পুকুর। পুকুরে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। পুকুর পাড়ে শোভা পাচ্ছে আম, লিচু, জাম, কলা, মরিচ গাছ। যা হাইব্রিড জাতের। মরিচ বারো মাস ধরে। যা সংসারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করে ভাল উপার্জন করে। অন্যান্য ফলগুলো থেকেও বছরে বেশ মোটা অংকের আয় আসে। আর মাছ সাড়া বছর বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করে। আগে বাস করতো অন্যের জমিতে ঝোপড়িঘরে। এখন তাঁর বাস নিজস্ব জমিতে হাফ বিল্ডিং ঘরে। ঘরের আসবাবপত্রও কম নেই। সুন্দর পরিবেশ। নিজে লেখাপড়া করতে পারেনি। কিন্তু বোনকে পড়াচ্ছে ইউনিভার্সিটিতে। হাঁস পালনে স্বাবলম্বী হওয়ার পর বিয়ে করেছে। ৮ম শ্রেণি পাস স্ত্রী। তাদের দাম্পত্য জীবনে ২ পুত্র সন্তান এসেছে। এখন সে খামারে প্রতিদিন ৩ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ করায়। প্রতিমাসে খামারে তাঁর খরচ ১ লাখ বিশ হাজার টাকা। আর শুধুমাত্র ডিম বিক্রিতে আসে ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা। প্রতি ৩ মাস পর পর তাঁর আয় হয় আড়াই লাখ থেকে ৩ টাকা। তাঁর সংসারে এখন শুধু সুখ আর সুখ।

শফিকুল নিজে লেখাপড়া জানেন না। খামারের বিষয়ে কোনদিন প্রশিক্ষণ নেননি। সরকারী কোনো কর্মকর্তা তার খামারে যায়নি কখনও। নিজের বুদ্ধিতেই তিনি খামারের পরিচর্যা করেন। তাঁর বোন যখন ৮ম শ্রেণিতে পড়ে তখন কৃষিশিক্ষা বইয়ে তিনি সমন্বিত চাষ সম্পর্কে জানতে পান। সেই বইটি তিনি আজো যতœ করে রেখে দিয়েছেন। ওই বই অনুসরণ করেই তিনি খামারের পরিচর্যা করেন। কৃষি শিক্ষা ব্যবহারিক বইটিতেই হাঁস ও মাছ চাষের সকল নিয়ম-কানুন, রোগ নির্ণয়, খাদ্য,  চিকিৎসা বিষয়ে ধারণা নিয়ে তিনি নিজস্ব উদ্যোগে সমন্বিত পদ্ধতিতে হাঁস-মাছ চাষ করে যাচ্ছেন।

শফিকুল জানান, আগে আমার কিছুই ছিল না। অর্থের অভাবে পড়তে পারি নাই। আমি চায়ের দোকানে কাজ করতাম। বাবার কথায় আমি ৬ হাজার টাকা দিয়ে খামার শুরু করে এখন ২৭০ শতাংস জমিতে(যার আনুমানিক মুল্য হবে প্রায় ৩ কোটি টাকা) হাঁস-মাছ চাষ এবং বিভিন্ন ফলের গাছ রোপন করে লাখ লাখ টাকা আয় করছি। আমাকে অনুসরন করে একই এলাকার আজিম উদ্দিন সহ প্রায় ১৫ টি হাঁস খামার হয়েছে। অনেক খামারিরা আমার কাছ থেকে বুদ্ধি পরামর্শ নিয়ে বেশ লাভবান হচ্ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের মতো হাঁস খামারীদের কোনো প্রকার সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন না। এমনকি আমাদের কোনো প্রশিক্ষণ পর্যন্তও দেওয়া হয় না। আমার খামারটি একটি উন্নত হাঁস খামার হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা বিরাট প্রয়োজন।

উপরে