বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৮ | ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

বাঙালী পরিচয়ে রোহিঙ্গা নারীদের বিয়ে করছে জঙ্গিরা

প্রকাশের সময়: ১২:১৮ অপরাহ্ণ - শনিবার | ডিসেম্বর ২, ২০১৭

কারেন্টনিউজ ডটকমডটবিডি: বাঙালীদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের মিশে যাওয়া ঠেকাতে সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর আবারও কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, সম্প্রতি বাঙালীদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের গোপনে রেজিস্ট্রি ছাড়াই মোবাইল ফোনে, বাঙালী পরিচয়ে ও জঙ্গী কায়দায় বিয়ে হচ্ছে। বিয়ে করা বাঙালী যুবকের অধিকাংশই বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন ও ইসলামী সংগঠনের নেতাকর্মী। নিঃস্ব রোহিঙ্গা নারীকে বিয়ে করে তাদের জঙ্গীবাদের দিকে টানতেই এমন বিয়ের ঘটনা ঘটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিচয় গোপন

করে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাঙালীদের রেজিস্ট্রির মাধ্যমে বিয়ে হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করতে কক্সবাজারসহ আশপাশের জেলার কাজী অফিসের রেজিস্টার ঘন ঘন চেক করার কথা বলা হয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আত্মীয়তার সুবাদে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করার চিন্তাভাবনা চলছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জাতিগত দাঙ্গাসহ নানা নির্যাতনের কারণে সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারের প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছে। চলতি বছরের ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কয়েকটি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনাঘাঁটিতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি কর্তৃক হামলার অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই সেখানে সেনাবাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ চালিয়ে আসছে। নিপীড়নের মাত্রা এতটাই মারাত্মক যে, রোহিঙ্গারা নিজ দেশ ছেড়ে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা দশ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বাঙালীদের সঙ্গে ভাষাগত পার্থক্য ব্যতীত অনেক কিছুর মিল রয়েছে রোহিঙ্গাদের। এজন্য অনায়াসে তারা বাঙালীদের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

মিশে যাওয়া ঠেকাতে চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দফতর একটি বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে শরণার্থী শিবির ব্যতীত রোহিঙ্গারা অন্য কোথাও বসবাস করতে পারবে না। রোহিঙ্গাদের কোন প্রকার আশ্রয়-প্রশয়, বাসা ভাড়া, বিয়ে করা, চাকরি, বসবাসের ব্যবস্থা, অন্যত্র চলে যেতে সহায়তা করা যাবে না।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, এরপর থেকে সারাদেশে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করার সময় পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের যাতায়াত শুধু কক্সবাজারের নির্দিষ্ট ক্যাম্পগুলোয় সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। আগে থেকেই বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে অনেকেই ক্যাম্পের বাইরে তাদের আত্মীয়-স্বজন অথবা পরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে অবস্থান বা আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিককে রোহিঙ্গাদের লঞ্চ, বাস ও ট্রেনসহ যাতায়াতের কোন বাহনে না নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ এমন নির্দেশ মানা হচ্ছে না।

বৃহস্পতিবার ভোর ছয়টার দিকে র‌্যাব-১০ এর হাতে রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানাধীন মোখলেছুর রহমানের বাড়ি থেকে রোহিঙ্গা শিশু শফিকা (৬) ও তার মা রোহিঙ্গা নারী সেতারা বেগম (২৫) এবং রোহিঙ্গা নারী জাহেদা বেগম (১৬) আটক হয়। আটক রোহিঙ্গাদের বিদেশে পাঠানোর চেষ্টাকারী দুই বাংলাদেশী রাজু মোল্লাকে (৪৫) ছয় মাসের আর মোখলেছুর রহমানকে (৬৫) এক মাসের কারাদ- দেয়া হয়। আর রোহিঙ্গা শিশু ও দুই নারীকে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।

র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোঃ শাহাবুদ্দিন খান জানান, মাস ছয়েক আগে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সলিমুল্লাহ নামে এক বাঙালীর সঙ্গে রোহিঙ্গা নারী জাহেদা বেগমের বিয়ে হয়। এরপর থেকেই জাহেদা বেগম সেতারার পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছে। দুই রোহিঙ্গা নারীকে বাংলাদেশী পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশ পাঠানোর চেষ্টা চলছিল।

পুলিশ সদর দফতরের ইন্টেলিজেন্স এ্যান্ড স্পেশাল এ্যাফেয়ার্স শাখার অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি ইউনিটে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্দেশনা মোতাবেক সারাদেশেই পুলিশ, র‌্যাব চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, মানিকগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চলছে। এসব জেলার চেকপোস্টে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত হওয়া রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছিল। আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে তাদের সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণ করার কাজ চলছে।

পুলিশ সদর দফতরের এক উর্ধতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রোহিঙ্গাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন ও স্বাধীনতাবিরোধীরা নানাভাবে সহযোগিতা করছে। এমনকি অনেক জঙ্গী সংগঠনের সদস্যরা রোহিঙ্গা নারীকে ভুয়া বাঙালী পরিচয়ে বিয়ে করছে। এজন্য কক্সবাজারসহ আশপাশের কাজী অফিসের বিবাহ রেজিস্টার ঘন ঘন চেক করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গোয়েন্দাদের নজরদারির কারণে সম্প্রতি জঙ্গীরা রোহিঙ্গা নারীদের জঙ্গীবাদের আদলে বিয়ে করছে। এক্ষেত্রে কোন রেজিস্টার মানা হচ্ছে না। ইসলামের নামে তাদের খেজুর খাইয়ে বা কালেমা পড়ে বিয়ে হচ্ছে। এদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। এ ধরনের বিয়ের পরই ওইসব দম্পতি আত্মগোপন করতে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। যেসব যুবতী রোহিঙ্গা পরিবারের সবাইকে হারিয়েছেন, জঙ্গীরা বিয়ের ক্ষেত্রে তাদেরই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আত্মঘাতী নারী জঙ্গী স্কোয়াড তৈরি করতেই এ ধরনের রোহিঙ্গা নারীকে টার্গেট করতে পারে জঙ্গীরা।

র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, সারাদেশে বাড়তি চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বাঙালীর সঙ্গে মিশে যাওয়া ঠেকাতে তাদের কৌশলী তৎপরতা অব্যাহত। সীমান্তসহ বিভিন্ন পয়েন্টে র‌্যাবের তরফ থেকে নানামুখী তৎপরতা চালানো হচ্ছে। সূত্র: জনকণ্ঠ

উপরে