শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ | ২রা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

রাসূল (সাঃ) যেসব খাবার পছন্দ করতেন

প্রকাশের সময়: ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ - বৃহস্পতিবার | ডিসেম্বর ৭, ২০১৭

রসূল সা. পানাহার রুচিটা ছিল অত্যন্ত ছিমছাম ও ভদ্রজনোচিত। তিনি গোশতের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। সবচেয়ে বেশী পছন্দ করতেন পিঠ, উরু ও ঘাড়ের গোশত। পাশের হাড়ও তার বিশেষ প্রিয় ছিল। গোশতের ঝোলের মধ্যে রুটি টুকরো টুকরো করে ভিজিয়ে রেখে ‘ছারীদ’ নামক যে উপাদেয় আরবীয় খাবার তৈরী করা হতো, সেটাও তিনি খুবই পছন্দ করতেন।

অন্যান্য প্রিয় খাবারের মধ্যে মধু, সের্কা ও মাখন ছিল অন্যতম। দুধের সাথে খেজুর খেতেও ভালোবাসতেন। (এটা একটা চমৎকার পুষ্টি খাদ্যও বটে।) মাখন মাখানো খেজুরও তাঁর কাছে একটা মজাদার খাবার ছিল। রোগীপথ্য হিসাবে ক্যলরিযু্ক্ত খাদ্য পছন্দ করতেন এবং অন্যদেরকেও খাওয়ার পরামর্শ দিতেন। প্রায়ই জবের ছাতু খেতেন। একবার বাদামের ছাতু খেতে দেয়া হলে তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করলেন যে, এটা বিত্তশালীদের খাদ্য। বাড়ীতে তরকারী রান্না হলে প্রতিবেশীর জন্য একটু বেশি করে তৈরী করতে বলতেন।

পানীয় দ্রব্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল মিষ্টি পানি এবং তা বিশেষ যত্নের সাথে দু’দিনের দূরত্ব থেকে আনানো হতো। পানি মেশানো দুধ ও মধুর শরবতও সাগ্রহে পান করতেন। মাদক নয় এমন খেজুরের নির্যাসও পছন্দীয় ছিল। মশক বা পাথরের পাত্রে পানি ঢেলে খেজুর ভেজানো হতো এবং তা এক নাগাড়ে সারা দিন ব্যবহার করতেন। কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ রাখা হলে মাদকতার সৃষ্টি হতে পারে, এই আশংকায় ফেলে দিতেন। আবু মালেক আশয়ারীর বণর্না ‍অনুসারে তিনি বলেছেনও যে, আমার উম্মতের কেউ কেউ মদ খাবে, কিন্তু তার নাম পাল্টে নাম রাখবে। (ইতিহাস সাক্ষী যে, পরবর্তী কালের শাসকরা ফলের নির্যাস নামে মদ খেতো।)

এক এক ব্যক্তির আলাদা আলাদাভাবে খাওয়া দাওয়া করা পছন্দ করতেন না। একত্রে বসে খাওয়ার উপদেশ দিতেন। চেয়ার টেবিলে বসে খাওয়া দাওয়া করাকে নিজের বিনয়ী স্বভাবের বিপরীত মনে করতেন। অনুরুপভাবে দস্তরখানের উপর ছোট ছোট পেয়ালা পিরিচে খাবার রাখাও নিজের রুচি বিরোধী মনে করতেন। স্বর্ণরৌপ্যের পাত্রকে একেবারেই হারাম ঘোষণা করেছেন। কাঁচ, মাটি, তামা ও কাঠের পাত্র ব্যবহার করতেন। দস্তরখানের ওপর হাত ধোয়ার পর জুতো খুলে বসতেন। ডান হাত দিয়ে নিজের সামনের দিক থেকে খাবার তুলে নিতেন। পাত্রের মাঝখানে হাত রাখতেন না। হেলান দিয়ে বসে পানাহার করার অভ্যাস ও তাঁর ছিল না। কখনো দুই হাঁটু খাড়া করে এবং কখনো আসন গেড়ে বসতেন।

প্রতি গ্রাস খাবার মুখে তোলার সময় তিনি বিছমিল্লাহ পড়তেন। যে খাদ্যদ্রব্য অপছন্দ হতো কোন দোষ উল্লেখ না করেই তা বাদ দিতেন। বেশী গরম খাবার খেতেন না। কখনো কখনো রান্না করা খাবার ছুরি দিয়ে কেটে খেতেন। তবে এটা তাঁর কাছে কৃত্রিমতা ও আড়ম্বর মনে হতো এবং এটা তেমন ‍ভালবাসতেন না। [বুখারী ও মুস্লিম (আমর বিন উমাইয়া কর্তৃক বর্ণিত) আবু দাউদ ও বায়হাকী (হযরত আয়েশা কর্তৃক বর্ণিত)।]

রুটি ইত্যাদি তিনি সব সময় আঙ্গুল দিয়ে ধরতেন এবং আঙ্গুলে তরকারী ইত্যাদি লাগাতে দিতেন না। কখনো কখনো ফলমূল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বা হাটা চলা করা অবস্থায় খেতেন না। দুটো ফল এক সাথেও খেতেন–যেমন এক হাতে খেজুর অপর হাতে তরমুজ ইত্যাদি। খেজুরের আটি বাম হাত দিয়ে ফেলে দিতেন। দাওয়াত কখনো ফেরত দিতেন না। যদি অন্য কে‍উ ঘটনাক্রমে তাঁর সাথে থাকতো (আলাপরত থাকার কারণে বা অন্য কোন কারণে) তবে তাকে সাথে নিয়ে যেতেন ঠিকই, কিন্তু বাড়ীওয়ালার কাছ থেকে তার জন্য অনুমতি নিতেন।

কোনো মেহমানকে খাওয়ালে বারবার তাকে বলতেন যে, লজ্জা শরম বাদ দিয়ে তৃপ্তি সহকারে খাও। খাবার মজলিস থেকে ভদ্রতার খাতিরে সবার শেষে উঠতেন। অন্যদের খাওয়া আগে শেষ হলে তিনি ও দ্রুত শেষ করে তাদের সাথে উঠে যেতেন। খাওয়ার শেষে হাত অবশ্যই ধুয়ে নিতেন এবং আল্লাহর শোকর আদায় এবং জীবিকা ও বাড়ীওয়ালার জন্য বরকত কামনা করে দোয়া করতেন। কোনো খাবার জিনিস উপঢৌকন পেলে উপস্থিত বন্ধুদের তাতে শরীক না করে ছাড়তেন না এবং অনুপস্থিত বন্ধুদের অংশ রেখে দিতেন। খাবার মজলিসে একটি দানাও নষ্ট হয় না, এরুপ যত্নসহকারে খেতে সবাইকে প্রশিক্ষণ দিতেন।

পানি পান করার সময় তিনি ঢক ঢক শব্দ করতেন না এবং সাধারণত তিনবার মুখ সরিয়ে শ্বাস নিয়ে খেতেন। প্রতিবার বিছমিল্লাহ বলে আরম্ভ ও আলহামদুলিল্লাহ বলে শেষ করতেন। সাধারণত বসে পানি খাওয়াই তাঁর নিয়ম ছিল। তবে কখনো কখনো দাঁড়িয়েও পানি পান করেছেন। মজলিসে কোন পানীয় জিনিস এলে সাধারণত‍ঃ ডান দিক থেকে পরিবেশন শুরু করতেন। যেখানে একটা জিনিসের পরিবেশন শেষ হতো, সেখান থেকেই পরবর্তী জিনিসের পরিবেশন শুরু হতো। বেশী বয়স্ক লোকদের অগ্রাধিকার দিতেন, তবে ডান দিক থেকে শুরু করা ধারাবাহিকতায় যাদের প্রাপ্য, তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই ধারাবাহিকতা ভংগ করতেন।

বন্ধুদের কিছু পান করালে নিজে সবার শেষে পান করতেন এবং বলতেন, ‘যে পান করায় সে সবার শেষে পান করে’। খাদ্য পানীয়ে ফু দেয়া ঘ্রাণ নেয়া অপছন্দ করতেন। মুখের দুর্গন্ধ অপছন্দীয় ছিল বিধায় কাঁচা পেয়াজ ও রশুন খাওয়া কখনো ভালবাসতেন না। খাদ্য পানীয় দ্রব্য সব সময় ঢেকে রাখার নিদেশ দিয়েছেন। নতুন কোন খাবার এলে খাওয়ার আগে তার নাম জেনে নিতেন। বিষ খাওয়ার ঘটনার পর তাঁর অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল যে, কোন অজানা লোক খানা খাওয়ালে প্রথমে এক দু’লোকমা তাকে খাওয়াতেন।

এত তীব্র রুচিবোধের পাশাপাশি বেশীর ভাগ সময় ক্ষুধা ও দারিদ্রের কষাঘাতে জজরিত থাকতেন। এ ব্যাপারে যথাস্থানে বিশদ বিবরণ দেয়া হবে। তিনি বলেছেন, ‘আমার খানাপিনা আল্লাহর একজন সাধারণ বান্দর মতই।’

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রতিটি আদর্শ পঙ্খনুপঙ্খু ভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন। সূত্র: গ্রন্থ- মানবতার বন্ধু রাসূলুল্লাহ (সাঃ)


আর্কাইভ

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে