শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

বেঁচে থাকা ছেলের মাঝে বীরত্ব দেখতে চান এসি রবিউলের মা

প্রকাশের সময়: ৬:৩০ অপরাহ্ণ - রবিবার | জুলাই ১, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি:

শফিকুল ইসলাম সুমন, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি: বেঁচে থাকা ছোট ছেলের মাঝে বীরত্ব দেখতে চান গুলশান হলি আর্টিসানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এসি রবিউলের মা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, যাকে হারিয়েছি আর তাকে পাব না। রবিউল অনেক পরিশ্রম করেছে। লেখাপড়া করেছে। ভাবছিলাম রবিউল অনেক বড় হবে এবং হয়েছেও। কিন্তু নিজের জীবন দিয়ে। এতদিনে ছেলের জন্য শুধু চোখের পানি ফেলেছি। এখন বুঝতে পারছি, ছেলেটি সত্যিকার অর্থে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ায় দেশই তাকে এ সম্মান দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমার দেবর-ভাশুর ছিল না। ছিল না ননদিনীও। নিজের মেয়ে নেই, রবিউলের স্ত্রীই এখন আমার মেয়ে। আর একমাত্র ছেলে শামস বেঁচে আছে। আমার এ দুটি সন্তানকে যেন সরকার চাকরি দেয়। শামসের চাকরির বয়স শেষ। তার বড় ভাই বীর হয়ে থাকলে, সরকার তো তাকে বয়সের বাধা ভেঙে চাকরি দিতেই পারে। আমি চাই দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে রবিউলের বীরত্ব শামসের মধ্যে ফুটে উঠুক।

মোহাম্মদ রবিউল করিম । রবিউলের পিতা আব্দুল মালেক একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থায় চাকুরীরত অবস্থায় ২০০৬ সালে ৪৫ বছর বয়সে মারা যান। পিতার অকাল মৃত্যুতে গোটা পরিবার পড়ে যায় বিপাকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স করে ৩০তম বিস্এিসের মাধ্যমে পুলিশ বিভাগে যোগ দেন। রবিউলের চাকুরী হওয়ার পর পরিবারটি খানিকটা ঘুরে দাঁড়ায়। তিনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনারের (এসি) দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। গত বছরের আগের বছর ১ জুলাই রাজধানীর গুলশান হলি আর্টিসানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন তিনি। পরিবারে এখন বেঁচে আছেন মা করিমন নেছা, স্ত্রী উম্মে সালমা, ছয় মাসের শিশুকন্যা কামরুন নাহার নায়না এবং ভাই শামসুজ্জামান শামস।
২০১১ সালে রবিউল প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিকনিং লাইট অর্গানাইজেশন অফ ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড সোসাইটি- (বøুমস) নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে এর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪১ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে রবিউল স্কুল ইউনিফর্ম, টিফিন, বই, স্টেশনারি, সরঞ্জাম এবং স্কুল-ভ্যানসহ স্কুলের শিক্ষার্থীদের সব খরচ বহন করতেন। তিনি শিক্ষার্থী এবং দরিদ্রদের জন্য ক্যাম্পাসে একটি আবাসিক ভবন এবং হাসপাতাল নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, অসচ্ছল বৃদ্ধদের জন্য বৃদ্ধনিবাস গড়তে চেয়েছিলেন বলে জানান তাঁর ভাই শামস।
কথা হয় এসি রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমার সাথে তিনি জানান, রবিউল মারা যাওয়ার পর তার পরিবারের হাল ধরার মতো কেউ ছিল না। সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে জাহাঙ্গীর নগর বিশ^ বিদ্যালয়ে রেজিষ্ট্রার অফিসে শিক্ষা শাখায় । চাকরি পাওয়ার পর এখন তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা মোটামুটি ভাল। তিনি আরো জানান, চাকরি ক্ষেত্রে সবচাইতে ভাল লাগে সম্মানের বিষয়টা । যখন সবাই জানে আমি এসি রবিউলের স্ত্রী তখন ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে সকলেই আমাকে অন্যভাবে সম্মান করে।

রবিউলের একমাত্র ছোট ভাই শামসুজ্জামান সামস বলেন, আমার ভাই ছিলেন একজন সাংস্কৃতিমনা মানুষ। বাংলা সংস্কৃতিকে ধারণ করার প্রচষ্টা তার মধ্যে সবসময়ই আমরা দেখেছি। আমার ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল প্রতিবন্ধীদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। সেই স্বপ্ন আমার ভাই বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। আরো স্বপ্ন ছিল অসচ্ছল বৃদ্ধদের জন্য বৃদ্ধনিবাস গড়ে তোলা। কিন্তু সেটা বাস্তবায়নের আগেই ঘাতকরা আমার ভাইকে কেড়ে নিয়েছে।
সামস আরোবলেন, স্কুলের সব খরচ আমার ভাই ও তার বন্ধুরা মিলে চালাতো। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য বন্ধুদের পাশাপাশি স্কুল পরিচালনায় যুক্ত হয়েছেন দেশের সবাই। যার যার অবস্থান থেকে তারা স্কুলের জন্য সাহায্য সহযোগিতা করে চলেছেন। আমাদের একার পক্ষে স্কুল পরিচালনা করা সম্ভব না। তাই সরকার যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তবেই ভাইয়ের এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ হবে। সব শেষে একজন শহীদের ভাই হিসেবে আমি গর্ববোধ করি।
এ ব্যাপারে এসি রবিউলের প্রতিষ্ঠিত ঐ স্কুলের পরিচালক (প্রশাসন) জাহাঙ্গীর আলম জানান, স্কুলটি ছিল রবিউল এর স্বপ্ন। তার পরিবার, অন্যান্য সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ বিদ্যালয়টিকে রবিউলের পরিকল্পনা অনুসারে চালাতে ও সহায়তা দিতে অঙ্গীকার করেছেন। ২০১১ সালে, রবিউল প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখন এর শিক্ষার্থী সংখ্য ৪১। প্রতিষ্ঠার পর থেকে রবিউল ইউনিফর্ম, টিফিন খাদ্য, বই, স্টেশনারি এবং সরঞ্জাম এবং স্কুল-ভ্যানসহ স্কুলের শিক্ষার্থীদের সমস্ত খরচ বহন করতেন।

উপরে