বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

বুনো সবুজঘেরা পাথারিয়া পাহাড়ে

প্রকাশের সময়: ৪:২২ অপরাহ্ণ - শুক্রবার | আগস্ট ৩, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

বুনো জঙ্গলে ঘেরা পাথারিয়া পাহাড়। এ পাহাড়ের পূর্ব নাম আদম আইল। প্রায় এক হাজার বছর আগে অঞ্চলটি গভীর অরণ্য ছিল। এখানে বাস করত পাথরি নামক নাগা জনগোষ্ঠীর একটি উপশাখার অধিবাসীরা। কালক্রমে বসবাসকারীদের নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম পাথারিয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আদম আইলের প্রাকৃতিক মুগ্ধতার পরশে ঝোপঝাড়ে ফুটে থাকা নাম না-জানা নানা রঙের ফুলের বুনো গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা রিমঝিম ছন্দের আবেশ সঙ্গী করে, কিছুটা চড়াই-উতরাইয়ের পর প্রথমেই দেখতে পাই ঝুড়ঝুড়ি ঝরনা

ছুটছি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখায়। পৌঁছি রাত সাড়ে ১০টায় হাজীগঞ্জ বাজার। আকাশ বেয়ে তখন ঝরছিল ঝুমঝুম বৃষ্টি। কোনোমতে গাড়ি থেকে নেমেই ঢুকি খাবার হোটেলে। আগে থেকেই অপেক্ষমাণ ছিলেন বন্ধু প্রিন্স। কুশল বিনিময় শেষে পেটপুরে রাতের খাবার খেয়ে নিই। যাব যেহেতু গহিনে, সকালের নাশতায় কপালে কী জুটবে কে জানে। খেয়ে দেয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। যাচ্ছি এবার সমনভাগ। রাত সাড়ে ১২টায় পৌঁছি দক্ষিণ সমনভাগ সরকারি চা বাগানের সদর দরজায়। নিরাপত্তারক্ষী বেশ কিছুটা সময় নেন অনুমতি দেয়ার, অতঃপর ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মিলে। ঠাঁই হয় অফিসার্স কোয়ার্টারে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পুঁচকে দুজন গাইড আর সঙ্গে কিছু চিড়া, মুড়ি, গুড় নিয়ে ছুটি এবার বুনো জঙ্গলে ঘেরা পাথারিয়া পাহাড়ে। আজ সারা দিনের জন্য দুটো পা-ই সম্বল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত দক্ষিণ সমনভাগ চা বাগানের ভেতর দিয়ে কাঁচা চা পাতার ঘ্রাণ নিতে নিতে ঢুকে যাই ঝোপঝাড় জঙ্গলে। পাথারিয়া পাহাড় নামটাই কেমন যেন অদ্ভুত। এ পাহাড়ের পূর্ব নাম ছিল আদম আইল। প্রায় এক হাজার বছর আগে অঞ্চলটি গভীর অরণ্য ছিল। এখানে বসবাস করত পাথরি নামক নাগা জনগোষ্ঠীর একটি উপশাখার অধিবাসীগণ। কালক্রমে বসবাসকারীদের নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম পাথারিয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আদম আইলের প্রাকৃতিক মুগ্ধতার পরশে ঝোপঝাড়ে ফুটে থাকা নাম না জানা নানা রঙের ফুলের বুনো গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা রিমঝিম ছন্দের আবেশ সঙ্গী করে, কিছুটা চড়াই-উতরাইয়ের পর প্রথমেই দেখতে পাই ঝুড়ঝুড়ি ঝরনা। এর পর আবারো হাঁটা। একটা সময় চোখ আটকায় ওই দূর পাহাড়ে, প্রথমে বুঝতে ভুল হয় তারপর জানতে পারি হাকালুকি হাওড়ের পানি। ওহ সে মোহনীয় দৃশ্যের বর্ণনা দেয়া সত্যিই কঠিন। বেশ খানিকটা সময় হঠাৎ দেখা অপার্থিব সৌর্ন্দয চোখে ধারণ করে এগিয়ে যাই। অতঃপর পেয়ে যাই বান্দর ডুবা কুম। বান্দর ডুবায় ডুবানোর সুযোগ নেই। এর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দুই নয়ন আর মন দিয়ে দেখতে দেখতে হাইকিং চলে দেহের সাধ্য অনুসারে।

পাথারিয়া পাহাড় বেল্টে চড়াই-উতরাইয়ের মাঝে পাথুরে ঝিরির পানিতে গুঁড়া চিংড়ির সঙ্গে চলে খুনসুটি। কখনো চিংড়ি কখনো হেরেছে দে-ছুটের দামালরা। যেগুলোরে বাগে পেয়েছি বার-বি-কিউ করেছি। এরপর হাইকিং- ট্র্যাকিং চলে বেশ কিছুটা সময়। অতঃপর খানিকটা সময় ঝিরির পানিতে ট্রেইল শেষে দেখা মেলে পাইথুং ঝরনার। প্রথম দেখায় নজর কেড়ে নেয় আমার। পুরো পরিবেশটাই বুনো।

পানির অমিয় ধারায় সামনে হয়েছে গভীর বেসিন। বহুদিন পর ঝরনার গা থেকে নেমে আসা সে রকম হিম হিম পানিতে দিয়েছি বেশ কয়েকবার লাফ। ঘণ্টাখানেক লাফঝাঁপ শেষে ছুটি পুছুমের পানে। সঙ্গে ছিল শুকনো খাবার, তাই চিন্তা ছিল না। তবে এবার পানযোগ্য পানির জন্য হয়েছে হাহাকার। জোহর নামাজের জন্য কিছুটা সময় বিরতি দিয়ে আবারো হাঁটা। জোঁকের কবল থেকে বাঁচার জন্য সাদাপাতার মিশ্রণে নারকেল তেল সারা গায়ে মেখেছিলাম। তা না হলে জোঁক মামুর অত্যাচারে দেহের কী হতো, তা আল্লাহই মালুম। উঁচু-নিচু পথটাকে বন্ধু ভেবে ঝোপঝাড়ে হয়ে থাকা আবাত্তি জাম্বুরা চিবিয়ে পড়ন্ত দুপুরে নেমে যাই সোজা বড় বড় বোল্ডারে ভরা ঝিরির পানিতে। দিন  শেষে আসল মজা যেন এ পথটাতেই। একটু এদিক সেদিক হলে সোজা সিআরপি। সাবধানে আগাই, এভাবেই চলে অনেকটা সময়। এর পরই দেখা মেলে ইয়া উঁচু থেকে গড়িয়ে নামা পুছুম জলের। আনন্দে উচ্ছ্বাসে যখন সবাই দিশেহারা, তখনই আকাশজুড়ে দেয় মায়াকান্না। মুহূর্তের মধ্যে পুছুম ঝরনার ভাবসাব বদলে যায়। শুরু হয় ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাড, যাকে বলে খাঁটি বাংলায় হড়কা বান। অপ্রত্যাশিত এমন রূপের পসরা দেখে যখন বিমোহিত সবাই, তখনই ফ্যাকড়া বাজায় গাইড মহোদয়। তাদের সাবধানবাণী আমলে নিয়ে ভাগি পাহাড় বেয়ে। যেটা বাকি ছিল দেখার, তারও দেখা পেয়েছে আমাদের কেউ কেউ। সেটা হলো পাথারিয়া পাহাড়ের জঙ্গলে বিচরণ করা কালনাগ। ওরা ভয় পাওয়া তো দূরে থাক, উল্টো তারা বেশ পুলকিত। আর যারা না দেখতে পেল তাদের ভাবখানা এমন, সারা দিনের ট্র্যাকিংটাই যেন মাঠে মারা গেল। এর পরেও কথা থেকে যায়। দলের সবার জন্যই যেন পুছুম তার সৌন্দর্যের নির্যাস দিয়ে সারা দিনের ক্লান্তি পুষিয়ে দিয়েছে।

যোগাযোগ: ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ সমনভাগ। মাইক্রোবাস নিয়ে গেলে সবচেয়ে সুবিধা বেশি হবে। আর যারা বাসে যেতে চান, তারা সায়েদাবাদ থেকে বড়লেখার বাসে যাবেন। ভাড়া ৫০০ টাকা ও বড়লেখা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে সমনভাগ পর্যন্ত ভাড়া ৩৫০ টাকা। এছাড়া ট্রেনেও যাওয়া যাবে কুলাউড়া পর্যন্ত। ভাড়া ২৭০-৩৫০ টাকা। আরো বেশি তথ্য জানতে ক্লিক করুন গুগল সার্চে। আমি শুধু যাতায়াতের ধারণা দিলাম মাত্র।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে