রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

কুরআন শরীফের কসম করা শিরক

প্রকাশের সময়: ৩:১৮ পূর্বাহ্ণ - শনিবার | আগস্ট ৪, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

কারো নামে কসম করার অর্থ তার সত্তাকে পবিত্র জ্ঞান করা ও তাকে সম্মান দেওয়া। আর আল্লাহ তাআলাই এ জাতীয় সম্মানের একমাত্র হকদার। যে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোনো সত্তার নামে কসম বা শপথ করল সে মূলত আল্লাহর সম্মান ও অধিকারে ওই সত্তাকে শরিক ও অংশীদার করল। এটা শিরক। আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করা কবিরা গুনাহ, তবে তা শিরক নয়।

শিরক কবিরা গুনাহ থেকেও বড়, হোক সেটা ছোট শিরক। যে পীরের নামে কসম করল, সে পীরকে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করল। যে নবী-অলি-বুজর্গের নামে কসম করল সে তাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করল। অনুরূপ আল্লাহ ও তার গুণাগুণ ব্যতীত কোনো বস্তুর নামে যে কসম করল, সে আল্লাহর অধিকার তথা বিশেষ সম্মানে ওই বস্তুকে শরিক করল।

ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ وقال ابن مسعود رضي الله عنه: لأَنْ أَحْلِفَ بِاللَّهِ كَاذِبًا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَحْلِفَ بِغَيْرِهِ صَادِقًا
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত কারো নামে শপথ করল সে কুফরি করল, অথবা শিরক করল’। (তিরমিযি: ১৫৩৫, আবু দাউদ: (৩২৫১)

ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘গায়রুল্লাহর নামে সত্য কসম অপেক্ষা আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করব, এটা আমার নিকট অধিক প্রিয়।’ (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক: ১৫৯২৯)

ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
((لَا تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ مَنْ حَلَفَ بِاللَّهِ فَلْيَصْدُقْ، وَمَنْ حُلِفَ لَهُ بِاللَّهِ فَلْيَرْضَ، وَمَنْ لَمْ يَرْضَ بِاللَّهِ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ)).
‘তোমরা তোমাদের পিতাদের নামে কসম করো না। যে আল্লাহর নামে কসম করে তার উচিত সত্য বলা, আর যার জন্য আল্লাহর নামে কসম করা হলো তার উচিত সন্তুষ্টি প্রকাশ করা, আর যে আল্লাহর নামে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল না, তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক নেই।’ (ইবনে মাজাহ: ২১০১)

যদি কেউ কুরআনুল কারিম কিংবা তার কোনো আয়াতের কসম করে, যা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিল করা হয়েছে, তবে তার এ কসম বৈধ। কারণ, কুরআন আল্লাহর কালাম, যা তার সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর সকল সিফাত দ্বারা কসম করা যায়, তাই কুরআনুল কারিম দ্বারা কসম করাও বৈধ। কেউ যদি কুরআন দ্বারা উদ্দেশ্য করে কাগজ, কালি ও আরবি বর্ণমালা, তাহলে এটা জায়েয নয়, বরং শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, কাগজ-কালি ও আরবি বর্ণমালা মাখলুক তথা সৃষ্টিজীব। তাই কুরআনুল কারিমের কসম না করাই ভালো, কারণ তাতে যেরূপ আল্লাহর কালাম রয়েছে, অনুরূপ কাগজ-কালি এবং আরবি বর্ণমালাও রয়েছে।

কসম ও মান্নতের ক্ষেত্রে সাধারণত কসম ও মান্নতকারীর নিয়ত গ্রহণযোগ্য হয়, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
((إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى)).
‘সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে যা সে নিয়ত করেছে।’ (বুখারি: ১)

তবে কসমের সাথে যদি অপরের হক জড়িত হয়, তাহলে অপর ব্যক্তি তথা কসম গ্রহণকারী ও বিচারকের নিয়ত গ্রহণযোগ্য হবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
((يَمِينُكَ عَلَى مَا يُصَدِّقُكَ بِهِ صَاحِبُكَ)). وفي روايَةٍ: ((الْيَمِينُ عَلَى نِيَّةِ الْمُسْتَحْلِفِ)).
‘তোমার সাথী যার উপর তোমাকে সত্যারোপ করছে তার উপর তোমার কসম সংগঠিত হবে।’ অপর বর্ণনায় আছে, ‘কসম গ্রহণকারীর নিয়তের উপর কসম সংগঠিত হয়।’ (মুসলিম: ১৬৫৪)

অতএব কসমকারী যদি ভিন্ন কিছু নিয়ত করে, তার সে নিয়ত গ্রহণযোগ্য নয়। হ্যাঁ, কসমকারী যদি মজলুম হয়, তাহলে তার নিয়ত গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি কসমের সময় কোনো নিয়ত না থাকে, তাহলে কসমের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী বস্তু ও তার কারণ নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে।

কুরআনুল কারিমের উপর কিংবা তার ভেতর হাত রেখে কসম করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত, তবে কসর কঠোরতা বুঝানো ও মিথ্যা কসমকারীকে ভীতি প্রদর্শন স্বরূপ কেউ কেউ তার অনুমতি প্রদান করেছেন।

শায়খ উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহুকে কুরআনুল কারিমের কসম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি উত্তরে বলেন, ‘আল্লাহ তা’আলার নাম কিংবা তার সিফাত ব্যতীত কোনো বস্তুর কসম করা বৈধ নয়, ব্যক্তি যখন আল্লাহর নামে কসম করে, তখন তার সামনে কুরআনুল কারিম উপস্থিত করা জরুরি নয়। কুরআনুল কারিমের কসম করার রীতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে, কিংবা তার সাহাবীদের যুগে, এমনকি কুরআন লিপিবদ্ধ হওয়ার পরও ছিল না। তাই প্রয়োজনের মুহূর্তে কুরআনুল কারিম উপস্থিত করা ছাড়া আল্লাহর নামে কসম করাই শ্রেয়।’ (ফাতাওয়া নুরুন আলাদ-দারব)

ইবনে কুদামাহ মাকদিসি- রাহিমাহুল্লাহ, কুরআনুল কারিমের উপর হাত রেখে কসম করার রীতিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘শাফেঈ বলেন- আমি তাদেরকে দেখেছি মুসহাফের উপর হাত রেখে কসম মজবুত করতেন। সানা (বর্তমান ইয়ামানের রাজধানী) এর কাজী ইবনে মাজিনকে দেখেছি কুরআনুল কারিম দ্বারা কসম মজবুত করতেন।

শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহর সাথীগণ বলেন, কুরআনুল কারিম উপস্থিত করে কসম মজবুত করা জরুরি, কারণ তাতে আল্লাহর কালাম ও তার নামসমূহ রয়েছে। ইবনে কুদামাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কসমের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং তার খোলাফায়ে রাশেদাহ ও তাদের বিচারকগণ যা করেছেন তার উপর এটা সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি, যার পশ্চাতে মজবুত ভিত্তি ও কোনো দলিল নেই। অতএব ইবনে মাজিন কিংবা কারো কর্মের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীদের কর্ম কখনো ত্যাগ করা যায় না।’ (আল-মুগনি: ১২/১১৯)

কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘ইবনুল আরাবি বলেছেন- কুরআনুল কারিমের উপর হাত রেখে কসম করা বিদআত, কোনো সাহাবী এরূপ করেননি।’ (তাফসিরে কুরতুবি: ৬/৩৫৪)

দ্বিতীয়ত কসম করার জন্য কুরআনুল কারিম কেন, আল্লাহ তাআলার নাম কিংবা তার সিফাতের কসম করা হয় না কেন, যা বৈধ এবং যাতে পাপের কোনো আশঙ্কা নেই! তাই কসমের প্রয়োজন হলে আল্লাহর নামে কসম করুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
((مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ أَوْ لِيَصْمُتْ)).
‘যার কসম করতে হয়, সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, অথবা চুপ থাকে।’ (বুখারি: ২৬৭৯)

উল্লেখ্য, তাওরাত, ইঞ্জিল ও জাবুরের উপর হাত রেখে কসম করা কোনো মুসলিমের পক্ষে জায়েয নয়, কারণ এসব কিতাব সংশ্লিষ্ট নবীদের উপর আল্লাহ তা’আলা যেভাবে নাযিল করেছেন, সেরূপ অক্ষত ও অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান নেই। দ্বিতীয়ত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরিয়ত তার পূর্বের সকল শরিয়ত মানসুখ ও রহিত করে দিয়েছে। যদি অনৈসলামিক দেশের ঘটনা হয় এবং বিচারক মুসলিমকে তাওরাত বা ইঞ্জিলের উপর কিংবা উভয় কিতাবের হাত রাখতে বাধ্য করে, তাহলে সে বলবে আমার থেকে কুরআনুল কারিমের কসম গ্রহণ করুন, আমি তার উপর হাত রাখব, যদি বিচারক তার কথা না শুনে তাহলে সে অপারগ, অক্ষম ও মজলুম গণ্য হবে, তখন তার পক্ষে তাওরাত বা ইঞ্জিলের উপর কিংবা উভয় কিতাবের উপর হাত রাখতে সমস্যা নেই। তবে কসমের সময় এসব কিতাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার নিয়ত করবে না।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে