সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

অনন্যা আয়েশা ও তাঁর প্রতি নবীজির ভালোবাসা

প্রকাশের সময়: ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ - সোমবার | আগস্ট ৬, ২০১৮

 

 

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মাহাতুল মুমিনীনদের মধ্য থেকে আয়েশা রাদিআল্লাহ আনহাকে সর্বাধিক ভালবাসতেন। তার প্রতি এ ভালোবাসা তিনি কারও থেকে লুকানওনি। আয়েশা (রা.) যেখান থেকে পানি পান করতেন, তিনিও সেখান থেকে পানি পান করতেন। আয়েশা যেখান থেকে খেতেন, তিনিও সেখান থেকে খেতেন।

অষ্টম হিজরিতে ইসলাম গ্রহণকারী আমর ইবনুল আস রাদিআল্লাহু আনহু নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞাসা করেন—

أي الناس أحب إليك يا رسول الله ؟  ، قال : (عائشة) قال : فمن الرجال ؟ قال : (أبوها) متفق عليه.

‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয় কে?’ তিনি বললেন, ‘আয়েশা।’ তিনি বললেন, পুরুষদের থেকে? নবীজী বললেন, ‘তার পিতা।’ (বুখারি ও মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ (সা.) তার সাথে খেলাধুলা, হাসি-ঠাট্টা ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করতেন। কোনো এক সফরে রাসূলুল্লাহ (সা.) তার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেন।

আয়েশা রাদিআল্লাহ আনহা বর্ণনা করেন, এতে তার প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা.) স্নেহ, মমতা এবং আদর-সোহাগ আরও ফুটে ওঠে। তিনি বলেন—

( والله لقد رأيت رسول الله – صلى الله عليه وسلم – يقوم على باب حجرتي ، والحبشة يلعبون بالحراب ، ورسول الله – صلى الله عليه وسلم – يسترني بردائه لأنظر إلى لعبهم من بين أذنه وعاتقه ، ثم يقوم من أجلي حتى أكون أنا التي أنصرف ) رواه أحمد .

‘আল্লাহর শপথ, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) দেখেছি, তিনি আমার ঘরের দরজায় দাঁড়াতেন, হাবশিরা যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে খেলাধুলা করত, আর রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে তার চাদর দিয়ে ঢেকে নিতেন, যেন আমি তাদের খেলা উপভোগ করি তার কাঁধ ও কানের মধ্য দিয়ে। অতঃপর তিনি আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন, যতক্ষণ না আমিই প্রস্থান করতাম।’ (আহমদ)

যেহেতু প্রসিদ্ধ ছিল আয়েশাই রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর নিকট অন্য স্ত্রীদের তুলনায় বেশি প্রিয়, তাই সবাই অপেক্ষা করতেন আয়েশার ঘরে রাসূলুল্লাহ (সা.) কবে আসবেন, সেদিন তারা তাকে হাদিয়া ও উপহার সামগ্রী পেশ করতেন। (সহীহ বুখারি ও মুসলিমে অনুরূপ বর্ণনা এসেছে)

তার প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর মহব্বতের আরেকটি আলামত হচ্ছে, মৃত্যু শয্যায় তিনি আয়েশার নিকট থাকার জন্য অন্যান্য স্ত্রীদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছেন, যেন আয়েশা (রা.) তাকে সেবা শুশ্রূষা প্রদান করেন।

আয়েশা (রা.) সম্পর্কে আরও একটি প্রসিদ্ধি ছিল যে, তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা.) নিয়ে আত্মসম্মানবোধ করতেন, রাসূলের প্রতি যা তার অকৃত্রিম ও সত্যিকার মহব্বতের প্রমাণ ছিল। তিনি তা এভাবে ব্যক্ত করেন—

‘ وما لي لا يغار مثلي على مثلك ؟ ” رواه مسلم .

‘কেন আমার মতো একজন নারী, আপনার মতো একজন পুরুষকে নিয়ে আত্মসম্মানবোধ করবে না?’ (মুসলিম)

একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) তার ঘরে অবস্থান করছিলেন, রাসূলের অপর স্ত্রী খানাসহ একটি পাত্র তার নিকট প্রেরণ করেন, আয়েশা (রা.) পাত্রটি হাতে নিয়ে ভেঙে ফেলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) খানা জমা করতে করতে বলছিলেন— غارت أمكم ‘তোমাদের মা ঈর্ষা ও আত্মসম্মানে এসে গেছে’। (বুখারি)

রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো নারীকে বিয়ে করতেন, আয়েশা (রা.) তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। যদি কোনো বিশেষত্ব বা বৈশিষ্টের কারণে সে রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর আনুকূল্য লাভ করে থাকেন, তাহলে তিনিও তা অর্জন করার জন্য প্রতিযোগিতা করবেন। এ ঈর্ষা ও আত্মসম্মানের বিরাট একটি অংশ লাভ করেছেন খাদিজা (রা.)। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে খুব স্মরণ করতেন।

কোনো এক রাতে নবী (সা.) জান্নাতুল বাকিতে (কবরস্থানে) গমন করেন, আয়েশা (রা.) ধারণা করেন, তিনি হয়তো কোনো স্ত্রীর ঘরে যাবেন, তাকে ঈর্ষায় পেয়ে বসল, তিনি তার পেছনে রওয়ানা দিলেন গন্তব্য জানার জন্য, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে তিরস্কার করে বললেন—

‘ أظننت أن يحيف الله عليك ورسوله ؟ ) رواه مسلم .

‘তুমি কি ধারণা করেছ যে, তোমার উপর আল্লাহ ও তার রাসূল অন্যায় আচরণ করবেন?’ (মুসলিম)

আয়েশা (রা.) শ্রেষ্ঠত্ব ও ফযিলত:

তার শ্রেষ্ঠত্ব ও ফযিলত সম্পর্কে আলোচনা শেষ হবে না, শেষ হবারও নয়। তিনি ছিলেন সিয়াম পালনকারী, রাত জাগরণকারী মহিষী নারী, তিনি অনেক ভাল কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন, প্রচুর দান-সদকা করেছেন। তার অধিক দান-সদকার কারণে তার নিকট খুব কম অর্থ-সম্পদই বিদ্যমান থাকত। এক সময় তিনি এক লাখ দিরহাম সদকা করেন, এক দিরহামও অবশিষ্ট রাখেননি নিজের কাছে।

আবু মুসা রাদিআল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন—

(كمُل من الرِّجال كثير ولم يكمل من النساء إلا مَريم بنتُ عمران ، و آسية امرأةُ فرعون ، وفضلُ عائشة على النساء كفضل الثريد على سائر الطعام) متفق عليه.

‘পুরুষদের থেকে অনেকেই পূর্ণতা লাভ করেছে। কিন্তু, নারীদের থেকে কেউ পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। তবে মারইয়াম বিনতে ইমরান, ফিরআউনের স্ত্রী ব্যতীত, আর আয়েশার ফযিলত অন্য নারীদের ওপর যেমন সারিদের (সারিদ: গোস্ত ও রুটের মিশেলে তৈরি আরবদের নিকট এক প্রকার প্রিয় খাদ্য) ফযিলত সকল খাদ্যের উপর।’ (বুখারি ও মুসলিম)

তার ফজিলতের আরও একটি উদাহরণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন—

( يا عائشة هذا جبريل يقرأ عليك السلام ، فقالت : وعليه السلام ورحمة الله ) متفق عليه .

‘হে আয়েশা, এ হচ্ছে জিবরিল, তোমাকে সালাম দিচ্ছে, তিনি বলেন, ওআলাইহিস সালাম ও রাহমাতুল্লাহ।’ (বুখারি ও মুসলিম)

বয়স কম সত্ত্বেও তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতি, ধীমান ও দ্রুত আত্মস্থকারী। এজন্যই তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে অধিক ইলম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন, নারীদের মধ্যে তিনিই সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী। উম্মতে মুহাম্মাদিতে কোনো নারী নেই, যিনি তার চেয়ে ইসলাম সম্পর্কে অধিক জ্ঞানের অধিকারী।

তার জ্ঞানের পরিচয় এ থেকেই পাওয়া যায় যে, আবু মুসা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন—

‘ما أشكل علينا أصحاب محمد – صلى الله عليه وسلم – حديثٌ قط فسألنا عائشة ، إلا وجدنا عندها منه علماً ” رواه الترمذي .

‘মুহাম্মদের (সা.) সাহাবি, আমাদের ওপর কোনো বিষয় অস্পষ্ট ও জটিল হলে, আমরা আয়েশাকে (রা.) জিজ্ঞাসা করতাম, তার নিকট সে বিষয়ে কোনো না কোনো ইলম অবশ্যই পেতাম।’ (তিরমিযি)

মাসরুককে (রহ.)- জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আয়েশা (রা.) কি ফারায়েজ (উত্তরাধিকার বিধান) সম্পর্কে ভাল জানেন  তিনি বলেন—

إي والذي نفسي بيده، لقد رأيت مشيخة أصحاب محمد – صلى الله عليه وسلم – يسألونها عن الفرائض ” رواه الحاكم .

‘নিশ্চয়- আল্লাহর কসম যার হাতে আমার জীবন, আমি মুহাম্মদের বড় বড় সাহাবিদের দেখেছি, ফারায়েজ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করতে।’ (হাকেম)

জুহরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—

لو ُجمع علم نساء هذه الأمة ، فيهن أزواج النبي – صلى الله عليه وسلم – ، كان علم عائشة أكثر من علمهنّ ” رواه الطبراني .

‘যদি এ উম্মতের সকল নারীদের একত্র করা হয়, যার শামিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যান্য স্ত্রীগণও, তবুও আয়েশার ইলম তাদের ইলমের চেয়ে অধিক হবে।’ (তাবরানি)

ইলমে ফিকাহ ও ইলমে হাদিসের পাশাপাশি কবিতা, জিকিৎসা বিজ্ঞান, আরবদের বংশ পরম্পরা বিষয়েও তিনি অধিক পাণ্ডিত্বের অধিকারী ছিলেন। এসব ইলম তিনি স্বামী ও নিজ পিতা থেকে অর্জন করেন। তার নিকট আরও ইলম ছিল আরবদের বিভিন্ন দল ও প্রতিনিধির, যারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আগমন করেছিল।

এ উম্মতের উপর তার বরকত অনেক। তিনি কুরআনের বেশ কিছু আয়াত নাযিলের পটভূমি ছিলেন। তার মধ্যে রয়েছে তায়াম্মুমের আয়াত। একদা তিনি বোন আসমা (রা.) থেকে একটি হার ঋণ নেন, পরে তার থেকে যা হারিয়ে যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) তার কতক সাহাবিকে হার খুঁজে আনার জন্য প্রেরণ করেন, হার অনুসন্ধানে তাদের সালাতের সময় হয়ে যায়, তাদের নিকট পানি ছিল না। তাই তারা অযু ব্যতীত সালাত আদায় করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর নিকট এসে তারা অভিযোগ করেন, অতঃপর তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল হয়, তখন উসাইদ ইব্ন হুজাইর আয়েশাকে (রা.) বলেন—

” جزاكِ الله خيراً ، فوالله ما نزل بك أمر قط إلا جعل الله لكِ منه مخرجاً ، وجعل للمسلمين فيه بركة ” متفق عليه .

‘আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, তুমি যখনই কোনো সমস্যায় পতিত হয়েছ, তোমার জন্য আল্লাহ তা থেকে মুক্তির পথ করে দিয়েছেন এবং মুসলিমদের জন্য তাকে বরকত রেখেছেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)

যখন আয়েশা (রা.) মিথ্যা অপবাদের ঘটনার শিকার হন, আল্লাহ তার পবিত্রতা ঘোষণা করে আসমান থেকে কুরআন নাযিল করেন, কিয়ামত পর্যন্ত যা তিলাওয়াত করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন—

‘নিশ্চয় যারা এ অপবাদ[১] রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে কর না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রয়েছে, যতটুকু পাপ সে অর্জন করেছে। আর তাদের থেকে যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য রয়েছে মহাআযাব। যখন তোমরা এটা শুনলে, তখন কেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা তাদের নিজেদের সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করল না এবং বলল না যে, ‘এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ?’ (সুরা নূর : ১১-১২)

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) মিসতাহ ইবন আসাসাহ, হাস্সান ইবন সাবেত ও হামনাহ বিনতে জাহশকে অপবাদের শাস্তি প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন। এরা অশ্লীলতার অপপ্রচার করেছিল। ফলে তাদের শাস্তি প্রদান করা হয়।

আয়েশা (রা.) সাতান্ন হিজরিতে মুত্যুবরণ করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল তেষট্টির চেয়ে কিছু বেশি। তার সালাতে জানাজা পড়ান আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু। অতঃপর জান্নাতুল বাকিতে তাকে দাফন করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর পাশে তার ঘরে তাকে দাফন করা হয়নি। কারণ, তিনি নিজের ওপর প্রাধান্য দিয়ে ওমর ইব্ন খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুকে সে জায়গাটি প্রদান করেন। আল্লাহ তাদের উপর ও সকল উম্মাহুতুল মুমিনদের উপর সন্তুষ্ট, তারাও তার উপর সন্তুষ্ট।

টিকা:

[১] এটি উম্মুল মুমিনীন আয়েশার (রা.) প্রতি মিথ্যা অপবাদের ঘটনা। ষষ্ঠ হিজরিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু মুস্তালিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে একস্থানে রাত্রিযাপনের জন্য অবস্থান করেন। রাতের শেষ ভাগে আয়েশা (রা.) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে একটু দূরে যান। কিন্তু, পথে তিনি তার গলার হারটি হারিয়ে ফেলেন। তিনি তা খুঁজতে থাকেন।

এদিকে, কাফেলা রওনা হয়ে যায়। তিনি হাওদার ভেতরেই আছেন মনে করে কেউ তার খোঁজ করেনি। কারণ, তার শারীরিক গড়ন ছিল হালকা। হার খুঁজে পেয়ে তিনি এসে দেখেন যে, কাফেলা চলে গেছে। তখন তিনি ছুটাছুটি না করে সেখানেই বসে পড়েন এ আশায় যে, কাফেলার রেখে যাওয়া মালামালের সন্ধানে নিয়োজিত কোনো লোক আসবেন।

অবশেষে এ কাজে নিয়োজিত সাফওয়ান (রা.) সকাল বেলায় আয়েশাকে (রা.) দেখতে পেলেন এবং নিজের উটে তাকে আরোহন করিয়ে নিজে পায়ে হেঁটে উটের রশি টেনে সসম্মানে নিয়ে কাফেলার সাথে মিলিত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই কয়েকজনকে নিয়ে আয়েশার (রা.) ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ রটাতে থাকেন। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা এ আয়াতগুলো নাযিল করে আয়েশাকে (রা.) নির্দোষ ঘোষণা করেন এবং অপবাদ রটনাকারীদের কঠোর শাস্তির কথা জানিয়ে দেন। এই ঘটনাটি ‘ইফক’ এর ঘটনা হিসেবে প্রসিদ্ধ।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে