মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

নবীজির সংসারে উম্মাহাতুল মু’মিনীনের জ্ঞানচর্চা

প্রকাশের সময়: ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ - মঙ্গলবার | আগস্ট ৭, ২০১৮

 

 

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

ইলম অর্জন ব্যতীত নারী-পুরুষের মানসিক উন্নতি অসম্ভব। আর উন্নত মানসিকতার নারী ব্যতীত সংসার সুখের হওয়া সম্ভব নয়। নবীজি তার স্ত্রীদের ইলম অর্জনের ব্যাপারে যাবতীয় সহযোগিতা করেছেন। স্ত্রী মানেই ঘরের পুতুল নয় বরং নবীজি নারীর শিক্ষা ও সমৃদ্ধিকে প্রয়োজনীয় মনে করতেন।

নারীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর রাসূল সপ্তাহে একদিন তাদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট করে দেন।

১. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার জ্ঞানের গভীরতায় উরওয়া ইবনে যুবায়েরের বিস্ময়ের সীমা নেই। এক আশ্চর্য মহিয়সী! কতকিছু জানেন! সবচেয়ে বড় বিষয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার তিনি দুর্লভ সব বিষয়েও জ্ঞান রাখেন। অবশেষে একদিন বিস্মিত কণ্ঠে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে প্রশ্ন করেই বসলেন, ‘আমি আপনার বিষয়ে যত ভাবি ততই আশ্চর্য হই। আপনাকে সবচেয়ে বড় ফকিহ হিসেবে দেখে ভাবি— হতেই পারে, যেহেতু তিনি নবীর স্ত্রী এবং আবু বকরের মেয়ে। আরবের ইতিহাস, বংশগণনা ও কবিতা সম্পর্কে আপনার জ্ঞান ও দক্ষতা দেখে ভাবি— এটাও হতে পারে, যেহেতু তার পিতা কুরাইশের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। কিন্তু, এটা অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার যখন দেখি আপনি চিকিৎসাবিদ্যায়ও পারদর্শী। কোথা থেকে এ জ্ঞান অর্জন করলেন?’

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, ‘শোনো উরওয়া, নবীজি প্রায়ই অসুস্থ হতেন। তখন তাঁর চিকিৎসার জন্য আরব-আজমের চিকিৎসকগণ আসতেন। সেখান থেকে শিখেছি।’

২. এ কথা সহজেই অনুমান করে নেয়া যায় যে, কত উদার ছিলেন নবীজি। অসুস্থতার সময়ও স্ত্রীর চিকিৎসাবিদ্যা অর্জনের সমর্থন করেছেন। না হলে অসুস্থ স্বামী ঘরে রেখে এমনি এমনি এমন কঠিন বিদ্যা শিখে নেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্ত্রীদের শিক্ষক ছিলেন খোদ নবীজি। বিশেষ করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার। সীরাত ও হাদিসের কিতাবসমূহে নবীজির কাছে আয়েশার অসংখ্য জিজ্ঞাসা ও জিজ্ঞাসার জবাবসমূহে ভরপুর। নবীজি অত্যন্ত ধৈর্য ও ভালোবাসা সহকারে তাঁকে দীন শিক্ষা দিতেন। প্রতিদিন মসজিদে নববীতে জ্ঞানার্জনের মজলিস বসতো। আয়েশার কামরা ছিল মসজিদের গা ঘেঁষে। আয়েশা ঘরে বসে তাতে শরিক হতেন। কোনো কারণে শুনতে না পারলে কখনো কখনো মজলিসের কাছাকাছি চলে যেতেন অথবা কোনো কারণে বুঝতে না পারলে নবীজি ঘরে এলে জিজ্ঞেস করে নিতেন।

৩. একবার সকালে নবীজি দেখলেন জুওয়াইরিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা দোয়া করছেন। তিনি চলে গেলেন। দুপুরে এসে তাঁকে একই অবস্থায় দেখে বললেন, ‘তুমি এখনো আগের অবস্থায় আছো?’ তিনি ‘হ্যাঁ’ বললেন।

এরপর নবীজি বললেন, ‘আমি কি তোমাকে এর চেয়ে ভালো কিছু শিখিয়ে দেব না, যা এই নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ?’

তারপর তিনি জুওয়াইরিয়াকে চমৎকার এই দোয়াটি শিখিয়ে দিলেন—

سبحان الله وبحمده، عدد خلقه، ورضا نفسه، وزنة عرشه، ومداد كلماته.

৪. হাফসা ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী। আয়েশার মতো শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি তার ছিল বড় আগ্রহ। তাঁর জ্ঞানার্জনের প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময় তাকে বিভিন্ন বিষয় শেখানোর চিন্তা করতেন। নবীজির নির্দেশে তখনকার একমাত্র পড়ালেখা জানা মহিলা শিফা বিনত আবদুল্লাহ হাফসাকে লিখতে ও পড়তে শেখান। তিনি রোগ নিরাময়ের কিছু পথ্যও জানতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নির্দেশ দেন— তার জানা বিদ্যা হাফসাকে শেখানোর জন্য।

৫. নবীজি শুধু জ্ঞান দান অথবা জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থা করে দিতেন তা নয়। বরং ইলমের সাথে সাথে আমলের জন্যও উৎসাহ দিতেন, সহযোগিতা করতেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন—

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى [المائدة]

‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যপারে পরস্পরকে সহযোগিতা কর।’

নবীজি ছিলেন কুরআনি আমলের ব্যাপারে সবচেয়ে অগ্রগামী। তিনি মাঝরাতে জেগে তাহাজ্জুদ পড়তেন এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকেও জাগিয়ে দিতেন। তিনি স্বামীর সাথে নামাযে অংশগ্রহণ করতেন। কখনো কখনো সারারাত দু’জনে মিলে নামায পড়তেন।

৬. নবীজির শিক্ষা, উৎসাহ ও সহযোগিতার কারণে তার স্ত্রীদের মন-মানসিকতা ছিল মুক্ত ও সমৃদ্ধ। নবীজির স্ত্রীদের জনগণের কল্যাণে কাজ করার ব্যাপারটি ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই শুরু হয়। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা প্রচুর অর্থ সম্পদ দিয়ে মুসলমানদের আর্থিক সংকট দূর করেন।

ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে রাসূলের চাচা আবু তালিবের চেয়ে তাঁর সহযোগিতা কোনো অংশে কম ছিল না।

পরবর্তী সময়ে এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও নবীজির প্রিয়তমা আয়েশাকে দেখা যায় পিঠে পানির মশক বেঁধে উম্মে সুলাইমের সাথে পুরো যুদ্ধের ময়দান ঘুরে ঘুরে মুজাহিদদের পানি পান করাচ্ছেন।

৭. সর্বসাধারণের কাজে নবীজির স্ত্রীদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে ইমাম মুসলিম (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘একদিন উম্মে সালমা তাঁর ঘরে ছিলেন। এক দাসী তার চুল আাঁচড়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ তিনি শুনলেন নবীজি বলছেন, ‘হে মানুষ সকল!’ উম্মে সালমা দাসীকে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি চুল বেঁধে দাও, আমাকে যেতে হবে।’

দাসী বললেন, ‘তিনি তো পুরুষদের ডেকেছেন, নারীদের ডাকেননি!’ তিনি বললেন, ‘আমিও একজন মানুষ।’

তারপর নিজের চুল দ্রুত বেঁধে নবীজির পূর্ণ ভাষণটি শুনতে চলে যান।

৮. নবীজির সফরগুলো হতো জিহাদ এবং সমাজসেবামূলক। নবীজির স্ত্রীরাও তাঁর সাথে সফরে বের হতেন। প্রত্যেক সফরে যাওয়ার আগে নবীজি স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করতেন এবং যার নাম উঠতো তাঁকে সঙ্গে নিতেন। কখনো কখনো একাধিক স্ত্রীকেও সঙ্গে নিতেন।

৯. অথচ আজকাল আর কোথায় দেখা যায় দ্বীনদার স্বামীদের তাদের স্ত্রীদের নিয়ে সফরে বের হতে! কোথায় দেখা যায় স্ত্রীর শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিতে! শুধু স্ত্রীর জন্য নয় বরং নিজের সন্তানের জন্য হলেও সন্তানের মাকে শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে। ইলম ব্যতীত সংসার ও সমাজের ঘোরপ্যাচ থেকে মুক্তি অসম্ভব। সুখ ধরাছোঁয়ার বাইরের বস্তু! নবীজির প্রজ্ঞাময় আদর্শেই আছে জাতির মুক্তির সূর্য।

 

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে