শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

এক মাত্র শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক ৩ জন !

প্রকাশের সময়: ৪:৪০ অপরাহ্ণ - সোমবার | আগস্ট ১৩, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

নিয়াজ আহমেদ সিপন, লালমনিরহাট: প্রথম থেকে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত এবতেদায়ী শাখার ৫টি শ্রেনী মিলে মাত্র একজন শিক্ষার্থী। যার পাঠদানের জন্য সরকারী বেতনভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন তিন জন।লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউনিয়নের মোস্তফি ভুড়িধোয়া দাখিল মাদরাসার  বাস্তব চিত্র এটি।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানান, অবহেলিত এ গ্রামের কোমলমতি ছেলে মেয়েদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে স্থানীয়দের উদ্যোগে ১৯৯০ সালে মোস্তফি ভুড়িধোয়া দাখিল মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে প্রথম শ্রেনী থেকে ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি পেলেও পরে দাখিল পর্যন্ত অনুমোদন দেন মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড। এরপর ২০০০সালের ২৪ এপ্রিল মাসে এবতেদায়ী শাখায় ৩ শিক্ষক ও দাখিল শাখায় ১৪জন শিক্ষক কর্মচারী নিয়ে এমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে। সেই থেকে প্রথম শ্রেনী থেকে দাখিল পর্যন্ত ১০টি শ্রেনীর পাঠদান চলে নিভৃত্য পল্লী গ্রামের এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

শিক্ষকরা বেতন ভুক্ত হওয়ার পরে পাঠদানে অবহেলা শুরু করলে শিক্ষার্থীরাও মাদরাসা ছেড়ে যেতে শুরু করে। সরকারী বেতন ভুক্ত কর্মচারী হিসেবে সরকারের খাতায় নাম অন্তভুক্ত হলে তা আর কোন ভাবেই মুছে যায় না। এ ধারনায়  শিক্ষকরাও ইচ্ছেমত আসেন স্বাক্ষর করেন আর চলে যান। বেতন ভোগ করলে শ্রম দিতে হয় বা দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেটা তাদের অজানা। এছাড়া ভুলেও সরকারী দফতরের কেউ খোঁজ নেন না সরকারী বেতন ভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটির। যার ফলে শিক্ষার পরিবেশ হারিয়ে ফেলেছে। ফলশ্রুতিতে মাদরাসা ছাড়তে শুরু করে শিক্ষার্থীরা।

সাম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কাগজ কলমে ১০টি শ্রেনীতে ২২৮জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে ৪০ জন খুজে পাওয়া যায় নি। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেনী পর্যন্ত কোন শিক্ষার্থী বা শ্রেনী কক্ষ নেই। পুরো ইবতেদায়ী শাখা মিলে ৫ম শ্রেনীতে রয়েছে একমাত্র শিক্ষার্থী নাঈম মিয়া। পড়া শুনার কোন পরিবেশ নেই। পাশের বেঞ্চে খেলা করছে দুইটি মুরগি। ওই কক্ষে নাঈমকে পাঠদান করছেন জুনিয়ার মৌলভী আক্কাস আলী। তার নিজেরও কোন প্রস্তুতি নেই। সংবাদকর্মীরা মাদরাসায় এসেছেন শুনে ভোঁ দৌড়ে ছুটে এসে একমাত্র শিক্ষার্থী নাঈম মিয়াকে নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করেন শিক্ষক আক্কাস আলী। পাশেই মুরগিরা খেলা করছে সেটাও ভুলে গেছেন তিনি। শিক্ষক আক্কাস আলী বলেন, প্রতিদিন ৫/৭ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। তবে অজ্ঞত কারনে আজ শিক্ষার্থীরা অনুপস্থিত। এবতেদায়ী শাখার অন্যসব শ্রেনী কক্ষ কোথায় এমন প্রশ্নে – পাশের সাইকেল রাখা ফাঁকা একমাত্র কক্ষটিকে দেখান তিনি।

৬ষ্ঠ থেকে ১০ম পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে ৫/৮ জন করে শিক্ষার্থী বসে রয়েছেন শিক্ষকের আগমনের অপেক্ষায়। কোন ক্লাসে শিক্ষক গেলেও প্রস্তুতিহীন। সংবাদকর্মীদের আগমনে পুরো প্রতিষ্ঠান আতংকিত। সকল শিক্ষক কর্মচারীর মাঝে অপরাধ আতংকের ছাপ। শিক্ষক হাজিরা খাতায় ছুটি নেই, স্বাক্ষর দেয়ার ঘরটিও ফাঁকা। তবুও প্রতি মাসে বেতন আসে তাদের। এটা দেখে যে কেউ মনে করবেন প্রতিষ্ঠানটির জন্মলগ্ন থেকে কোন দিন সরকারী দফতরের কেউ পরিদর্শন করেননি।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক ৮ম শ্রেনীর এক শিক্ষার্থী জানান, কয়েক মাস পরেই জেডিসি পরীক্ষা অথচ তাদের ইংরাজী বিষয়ে দুই অধ্যায়ও পড়ানো হয়নি। সংবাদকর্মীরা এসেছেন শুনে শরীর চর্চার শিক্ষক নুর ইসলাম মিয়া এসেছেন ইংরাজী ক্লাসে। তাদের কোন ক্লাস রুটিন নেই। যেদিন যখন ইচ্ছে শিক্ষকরা ক্লাসে আসেন। প্রতিদিন দুপুরেই মাদরাসা ছুটি হয়ে যায়। প্রতিবাদ করলে বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করে দেয়ার হুমকী।

মাদরাসার অফিস সুত্রে জানা গেছে, ১০টি শ্রেনীতে মোট শিক্ষার্থী ২২৮ জন। শিক্ষক কর্মচারী মিলে ১৭ জনের বেতন বাবদ প্রতি মাসে সরকারী বরাদ্ধ দুই লাখ ৮৫ হাজার ২২২টাকা। গত দাখিল পরীক্ষায় ২৮জন অংশ নিলেও পাস করেছে ৭জন। যার মধ্যে বিগত বছরের দুইজন শিক্ষার্থী। জেডিসি পরীক্ষায় ৩৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিগত বছরের ৩ জনসহ পাস করে মাত্র ১৬জন। মাত্র ৭/৮জন শিক্ষার্থীকে পাস করাতে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন বাবদ সরকারী খরচ বছরে ৩৪ লাখ ২২ হাজার ৬৬৪টাকা ও দুইটি উৎসব ভাতা।

পাশের গ্রামের মোড়ল ও আজিজার রহমান বলেন, শিক্ষকরা ক্লাস না করায় ছেলে মেয়েরা মাদরাসায় গিয়ে গল্পগুজব করে বাড়ি ফিরে যায়। শিক্ষকরা এক দিন এসে ছয় দিনের স্বাক্ষর করেন হাজিরা খাতায়। লেখাপড়ার পরিবেশ না থাকায় তারা তাদের ছেলে মেয়েকে অন্যত্র পাঠাচ্ছেন। সরকারী উচ্চ মহলের সুষ্ঠ তদন্ত দাবী করেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার দুইজন স্কুল শিক্ষক জানান, পাঠদান না করায় মাদরাসাটির এবতেদায়ী শাখায় কোন শিক্ষার্থী নেই। উচ্চ মহলের তদন্ত এলে পাশেই ভুড়িধোয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ডেকে নিয়ে দেখানো হয়। মুলতই এবতেদায়ী শাখাটি বন্ধ করে দেয়া উচিৎ বলে মন্তব্য করেন তারা।

মোস্তফি ভুড়িধোয়া দাখিল মাদরাসার সুপার আবুল বাশার নাঈমী জানান, অজ্ঞত কারনে প্রথম থেকে ৪র্থ শ্রেনীর শিক্ষার্থীরা ক’দিন ধরে মাদরাসায় আসছে না। তাই পাঠদান হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা না এলে শিক্ষকদের কি করার আছে?  তবে এবতেদায়ী শাখার শিক্ষার্থীর শ্রেনী কক্ষ দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে পারেননি। উল্টো একাডেমিক ভবন দাবি করেন।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে