বুধবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৮ | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

ঔষুধ কোম্পানীর হাতে জিম্মি মানিকগঞ্জের চিকিৎসা ব্যবস্থা

প্রকাশের সময়: ৮:৩৪ অপরাহ্ণ - সোমবার | আগস্ট ১৩, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

শফিকুল ইসলাম সুমন, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি: মানিকগঞ্জে ঔষুধ কোম্পানীদের কাছে জিম্মি চিকিৎমা ব্যবস্থা। শহরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা যে কোন ডাক্তারের চেম্বারের সামনে ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভদের হাতে নাজেহাল হতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। লম্বা সিরিয়াল শেষে যখন রোগীরা ডাক্তার দেখিয়ে বের হয় তখনই প্রেসক্রিপশন নিয়ে টানাটানি শুরু করেন বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। তাদের কোম্পানির ঔষধ লিখেছে কিনা এজন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলায়। আর এতে বাদ যায় না মূমূর্ষ রোগীরাও।

রিপ্রেজেন্টেটিভরা তাদের নিজেদের অবস্থান কোম্পানীর কাছে তুলে ধরতে রোগীর ব্যবস্থাপত্র নিয়ে মোবাইলে ছবি তুলে নিচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের প্রত্যেকটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডাক্তার চেম্বারে থাকা পর্যন্ত রোগী বেরিয়ে আসলে রিপ্রেজেন্টেটিভকে ব্যবস্থাপত্র দেখাতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। এতে করে রোগী ও তার স্বজনরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। রোগীদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে তাদের কোম্পানির ঔষুধ লেখা আছে কি না তা দেখতে রোগীদের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন তারা।
সরেজমিনে গতকাল জেলা শহরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডাক্তারদের চেম্বার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই বিভিন্ন ঔষুধ কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভদের মহড়া। মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়,সব সময় প্রত্যেকটি ডাক্তারের চেম্বারের সামনে দাড়িয়ে প্রেসক্রিপশনের ছবি নিচ্ছেন বিভিন্ন কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভরা। মনে হচ্ছে প্রেসক্রিপশনের ছবি না নিতে পারলে চাকুরী থাকবে না। হাসপাতালের ডাক্তারের চেম্বারের সামনে দল বেধে রিপ্রেজেনটেটিভরা রোগীর প্রেসক্রিপশনের অপেক্ষা করেন। তারা দলবেঁধে প্রতিটি ডাক্তারের চেম্বারের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে এবং একজন একজন করে ডাক্তারের সাথে দেখা করে প্রতিটি কোম্পানির ঔষুধ স্যাম্পল দিয়ে থাকে।

ঔষুধ কোম্পানীগুলোর মধ্যে মার্কেটিং প্রমোশনের নামে প্রতিদিন চলছে অসুস্থ বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা। ছোট বড় প্রায় সব কোম্পানী নিজ প্রতিষ্ঠানের ঔষুধ বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে মার্কেটিং প্রমোশনের নামে ডাক্তারদের পিছনে স্থানীয় প্রতিনিধি লাগিয়ে রেখেছেন, রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কোন কোম্পানী ঔষধ লেখেছেন ডাক্তার। ব্যবস্থাপত্র দেখানোকে কেন্দ্র করে অনেকরোগীর স্বজন ঔষধ প্রতিনিধিদের হাতে লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনায়ও ঘটে।

মানিকগঞ্জ নার্সিং ইনষ্টিটিউটের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ এম এম খায়রুল বাশারের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা শিবালয় উপজেলার কদ্দুস নামের এক রোগী বলেন, আমি সকাল ১০ ঘটিকার সময় হাসপাতালে আইছি। দুই ঘন্টা সিরিয়ালে দাড়িয়ে থাকার পর ডাক্তার দেখাইছি। ডাক্তার দেখিয়ে বেড়তেই প্রেসক্রিপশনের ছবি নিতে আমাকে ঘিরে ধরেছে। তিনি বলেন তাদের কোম্পানির ঔষধ লিখেছে কিনা এজন্য এক এক করে সবাই আমার প্রেসক্রিপশনের ছবি নিয়েছেন। আমি অসুস্থ তবুও এরা এক রকম জোড় করে আমার কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিছে। এতে আমি খুব বিব্রত বোধ করছি।


জোসনা আক্তার নামের গ্রামের এক সাধারণ রোগীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, হাসপাতালে রোগীর চেয়ে ঔষধ কোম্পানির লোকজন বেশি দেখা যায়। তারা আমার প্রেসক্রিপশনের ছবি নিছে। তিনি বলেন যখনই ডাক্তার দেখাই ঔষধ কোম্পানির লোকজন ছবি তুলবেই। কি কারনে তুলে তা জানি না। এরকম প্রতিদিন ঘটে। আপত্তি জানালেও কোন কাজ হয় না বলে জানান তিনি।

একটি সূত্র জানায়, ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের চাকরির পূর্বশর্ত হিসেবে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অংকের টাকার ঔষুধ বিক্রি করতে বাধ্যতামূলক টার্গেট রয়েছে কোম্পানিগুলোর। এ কারণে বিক্রয় প্রতিনিধিরা চাকরি বাঁচাতে টার্গেট পূরণ করতে নানা ছলচাতুরি ও প্রলোভন দেখিয়ে প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় সব রকমের ঔষুধ ডাক্তার ম্যানেজ করে বিক্রি করছে।
ঔষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিরা টার্গেট পূরণ করতে ডাক্তার ও প্রতিষ্ঠান ভেদে কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে কলম, প্যাড, চাবির রিং থেকে শুরু করে টিভি-ফ্রিজ, আসবারপত্র সরবরাহও করে থাকে বলে জানা যায়।

বিশ্বস্ত বিভিন্ন সূত্র থেকে আরো জানা গেছে, অখ্যাত এসব ঔষুধ বাজারজাত করার জন্যে ঔষুধ কোম্পানির এসব রিপ্রেজেন্টেটিভ একজন ডাক্তারকে দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র কোম্পানির পক্ষ থেকে উপহার দিয়ে থাকেন। তাছাড়া যে ডাক্তার যে কোম্পানির অখ্যাত ঔষুধগুলো বেশি প্রেসক্রাইব করেন সেই ডাক্তারের জন্য মাস শেষে প্রচুর স্যাম্পল ঔষুধ এবং নগদ টাকা-পয়সা উপহার দিয়ে থাকেন। ফলে বেশিরভাগ ডাক্তার বলা যায় এক প্রকার জিম্মিই হয়ে আছেন এসব ঔষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভদের কাছে।

নাম না প্রকাশের শর্তে কয়েকটি ফার্মেসীর কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ঔষুধ কোম্পানি গুলোর আগ্রাসী মার্কেটিং নীতির ফলে দেশে অপ্রয়োজনীয় ঔষধের ব্যবহার বেড়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি ঔষুধ বাজারজাতকরণ নীতিমালা থাকলেও তা কেউই মানে না। ফলে অসাধু ও অর্থলোভী ডাক্তার, হাতুড়ে ডাক্তার ও ফার্মাসিষ্টদের ফাঁদে পড়ে অশিক্ষিত ও দরিদ্র রোগীরা ভেজাল ও নিম্নমানের ঔষধ সেবন করে প্রতারিত হচ্ছেন।

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ঠ হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ লুৎফর রহমান জানান, হাসপাতালে অনেক রিপ্রেজেন্টিভরা আসে ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলতে। তাদের কোম্পানীদের ঔষূধ ডাঃ লিখেছে কি না সেটা দেখার জন্য। আমরা তাদের বেশির ভাগ সময়ই আসতে নিষেধ করি।এছাড়া জনবল কম থাকায় আমরা ঠিকমত দেখভাল করতে পারি না।

উপরে