মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৮ | ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

৩২ নম্বরে যাচ্ছি, মেয়েদের দেখে রেখো : কর্নেল জামিল

প্রকাশের সময়: ৭:৫২ অপরাহ্ণ - মঙ্গলবার | আগস্ট ১৪, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

বাবার কথা মনে হলে গর্বে বুক ভরে যায় শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। সেই যে ১৫ আগস্ট ভোর রাতে বাবা বঙ্গবন্ধু আক্রান্ত হয়েছে জেনে বাড়ি থেকে বের হলেন, মাকে বললেন আমার মেয়েদেরকে দেখে রেখো। এরপর বাবা আর ফেরেননি। মঙ্গলবার (১৪ আগস্ট) একান্ত আলাপাচারিতায় কর্নেল জামিলের (বিগ্রেডিয়ার হিসেবে পদোন্নতি প্রাপ্ত এবং বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত) মেয়ে আফরোজা জামিল এসব কথা বলেন।

স্বামীহারা কর্নেল জামিলের স্ত্রী আনজুমান আরান জামিল নিজে অকাল বৈধব্য বরণ করেও চার মেয়েকে মানুষ করেছেন। তার মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ে আফরোজা জামিল তিনি এখন ঢাকায় বসবাস করছেন। কাজ করেন চিত্রশিল্পী হিসেবে। এছাড়া এ্যাসিড সারভাইবাল বাল্যবিবাহরোধ, শিশু অধিকার ও নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করেন। চার বোনোর মধ্যে সবার বড় তাহমিনা এনায়েত আরেকজন ফাহমিদা আহমেদ। সবার ছোট কারিসমা জামিল। কারিসমা জামিল তার বাবার মৃত্যুর পর জন্ম নেয়।

আফরোজা জামিল বলেন, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে বাবা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মা কিছু একটা বলছিলেন, এ সময় কিছুটা বিরক্তবোধ করে মাকে বাবা উত্তর দেন, বঙ্গবন্ধু আক্রান্ত হয়েছে আর আমি ঘরে বসে থাকবো। এরপর মা আর কোনো কথা বলেন নি। এরপর বাবা একগ্লাস পানি খেয়ে গাড়িতে উঠে বসে মাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমার মেয়েদের দেখে রেখো। সেই যে গেলেন বাবা তারপর আর ফিরে পাইনি।

এক প্রশ্নের জবাবে আফরোজা জামিল বলেন, ২০১২ সালে মা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাবার স্মৃতি চারন করতেন। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে বাবার মত মাও ভালবাসতেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আমাদের খোঁজ খবর রাখেন। তিনি ১৯৯৬ সালে মাকে কুষ্টিয়া থেকে এমপি হিসেবে মনোনীত করেন। এছাড়াও ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদা কার্যকর ও বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেন।

তিনি আরো বলেন, জামিল ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমরা এখন নানা সমাজ সেবা ও সচেতনমূলক কাজ করছি। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো, জনকল্যানমূলক কাজ, বাল্যবিবাহরোধ,শিশু অধিকার ও নারী নির্যাতনরোধে কাজ করছি। পাশাপাশি চিত্রকর্ম নিয়ে কাজ করি এটা আমার ভাল লাগে।

বাবার মেয়ে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি এমন বাবার সন্তান- এ পরিচয় নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। আমার বাবা জাতীয় বীর। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন-এর চেয়ে গর্ব করার আর কি হতে পারে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিচার করেছে। ২ জন ফাঁসির আসামীর মধ্যে একজন কানাডায় একজন যুক্তরাষ্টে আছেন। এদের এনে দন্ড কার্যকর করতে পারলে আরো ভাল লাগতো।

যেভাবি নিহত হন জামিল : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দিন আহমেদ মূলত কর্নেল জামিল নামেই পরিচিত। মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম জামিল উদ্দিন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেহরক্ষী হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত হন। তিনি ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিলেন। ঘটনার সময় শুধু সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন এবং নিহত হন। তিনি রাষ্ট্রপতির বিদায়ী প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল। তার ড্রাইভার এবং মামলার ২০ নম্বর সাক্ষী আইনউদ্দিন মোল্লার চোখের সামনেই নিহত হন কর্নেল জামিল। ভোর ৫টার দিকে তার রুমের কলিং বেল বেজে ওঠে। তখন তিনি অজু করছিলেন। তাড়াতাড়ি বাসার সামনে গেলে কর্নেল জামিল ওপর থেকে দ্রুত গাড়ি তৈরি করতে এবং গণভবনে গিয়ে সব ফোর্সকে হাতিয়ার-গুলিসহ পাঁচ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার নির্দেশ জানাতে বলেন। গণভবনে সৈনিকদের নির্দেশ জানিয়ে তিনি ফিরে এলে কর্নেল জামিল তার ব্যক্তিগত গাড়িতে রওনা হন। ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোডের মাথায় গণভবন থেকে আসা ফোর্সদের দেখেন। সোবহানবাগ মসজিদের কাছে পৌঁছলে দক্ষিণ দিক থেকে গুলি আসতে থাকে। তখন ফোর্স অ্যাটাক করানোর কথা বললে কর্নেল জামিল বলেন, এটা ওয়ার-ফিল্ড নয়, ফোর্স অ্যাটাক করালে সিভিলিয়ানদের ক্ষতি হতে পারে। তখন আইনউদ্দিনকে প্রতিপক্ষের অবস্থান জেনে আসতে নির্দেশ দিয়ে কর্নেল জামিল গাড়িতেই বসে থাকেন। আইনউদ্দিন যখন দেয়াল ঘেঁষে ৩২ নম্বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পাঁচ-ছয়জন সেনা সদস্য দৌড়ে জামিলের গাড়ির দিকে যায়। কর্নেল জামিল দুই হাত উঠিয়ে তাদের কিছু বলার বা বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা দুই-তিনটি গুলি করলে কর্নেল জামিল মাটিতে পড়ে যান বলে গাড়ি চালক আইনুদ্দিন বাসায় এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

আফরোজা জামিল আরো বলেন, বাবা ছিলেন, স্বাধীনচেতা দেশভক্ত একজন মানুষ। এই বাবাই আমাদের শক্তি। বাবা নেই কিন্তু জীবিত বাবার চেয় শহীদ বাবা কমকি ? বলতে পারি আমি ব্রিগেডিয়ার জামিলের মেয়ে বলতে পারি মায়ের কথা। যে মা অকাল বৈধব্য বরণ করেও চার কন্যা সন্তানকে বুকে আগলে রেখে মানুষ করেছেন। বাবার অভাব বুঝতে দেননি।

উপরে