বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

দিনাজপুরে ইয়াসমিন ট্রাজেডি দিবস আজ

প্রকাশের সময়: ৬:০৪ অপরাহ্ণ - শুক্রবার | আগস্ট ২৪, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর থেকে: আজ ২৪ আগস্ট। দেশের ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বরোচিত ঘটনা পুলিশ হেফাজতে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ২৩ বছর পূর্তি এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ দিবস আজ। ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরের কয়েকজন বিপদগামী পুলিশ সদস্য ওই কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। ওই ঘটনার পর থেকেই দিনটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

ইয়াসমিনের মা শরিফা খাতুন দেশের সকল রাজনৈতিক দলসহ সামাজিক সংগঠনের নেতাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শিশু ও নারী নির্যাতন বন্ধে কঠোর আইন প্রনয়ন এবং সামাজিক আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান।

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সর্বস্তরের জনতা। তখন প্রতিবাদী জনতার ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে দিনাজপুর শহরের সামু, সিরাজ, কাদেরসহ সাতজন নিরপরাধ ব্যক্তি নিহত হন। এরপর তৎকালীন দিনাজপুর সিআইডি জোনের এএসপি আফজাল আহমেদ বাদী হয়ে অভিযুক্ত ৩ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোতয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি মাহফুজার রহমান তদন্ত শেষে তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল মোতালেবসহ নয়জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র পেশ করেন। মামলাটি নিরাপত্তাজনিত কারণে দিনাজপুর থেকে রংপুরে স্থানান্তর করা হয়।

তৎকালীন রংপুর জেলা ও দায়রা জজ মো. আব্দুল মতিনের আদালতে ইয়াসমিন হত্যা মামলার সাক্ষ্য প্রমাণ শেষে ২০০৭ সালের ৩১ আগস্ট ৩ পুলিশ সদস্যেকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দেয়া রায় পরে উচ্চতর আদালতে বহাল থাকে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি পুলিশের এএসআই ময়নুল ইসলাম, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার এবং পিকআপ চালক অমৃত লালের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে।

এ দিনটির স্মরণে মহিলা পরিষদ, বালুবাড়ী মহিলা উন্নয়ন সংস্থা, পল্লীশ্রীসহ বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইয়াসমিনের কবর জিয়ারত, দিনব্যাপী দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। এছাড়া ইয়াসমিনের মা শরিফা বেগম তার দিনাজপুর শহরের লালবাগ মহল্লার বাড়িতে কোরআনখানি ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছেন।

দিনাজপুর শহরের রামনগর এলাকার গরিব ঘরের শরীফা বেগমের মেয়ে ইয়াসমিন। গরিব পরিবারে জন্ম নেয়ায় চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়তে পেরেছিল সে। টাকা জমিয়ে আবার লেখাপড়া করার স্বপ্ন বুকে নিয়েই পাড়ি জমায় ঢাকায়। ঢাকায় এসে একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেয়। ৮/৯ মাস কাজ করার পর নিজের বাড়িতে যেতে চায়। কিন্তু গৃহকর্তা তাকে দুর্গা পূজায় বাড়িতে যেতে বলেন। কিন্তু মায়ের জন্য মন ছুটে যায় ইয়াসমিনের। আর সে কারণেই হয়তো ২৩ আগস্ট ওই পরিবারের ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে একাই দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয় ইয়াসমিন।

১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরছিল কিশোরী ইয়াসমিন। ভুল করে ঠাকুরগাঁওগামী নৈশকোচ হাছনা এন্টারপ্রাইজে উঠে পড়ে সে। বাসটি রাত ৩টার পরে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-রংপুরের সংযোগ মোড় দশমাইল এলাকায় এসে পৌঁছায়। তিন রাস্তর মোড় বলে সেখানে রাতেও চায়ের স্টল, খাবারের দোকান প্রায়ই খোলা থাকে। বাসের সুপারভাইজার খোরসেদ আলম ও হেলপার সিদ্দিকুর রহমান ইয়াসমিনকে সেখানে নামিয়ে জনৈক চা দোকানদার জোবেদ আলীকে অনুরোধ করেন, যেন ইয়াসমিনকে দিনাজপুরগামী কোনো গাড়িতে উঠিয়ে দেন।

স্থানঃ দশ মাইল মোড়। সময়ঃ তখন ভোর ৪টা। দিনাজপুর শহর অভিমুখে ফিরতে অপেক্ষামান তরুণী ইয়াসমিন। ফজরের নামাজ পড়তে বের হওয়া স্থানীয় মুসল্ল¬ীরা নিরাপদে যেতে তাকে তুলে দিলেন একটি পুলিশ ভ্যানে। মুসল্লিরা কোতয়ালী পুলিশকে অনুরোধ করলেন তরুনীকে দিনাজপুরে পৌছে দিতে। কিন্তু পুলিশ ভ্যানে উঠেই ইয়াসমিনকে বিদায় নিতে হয় পৃথিবী থেকে। ১০ মাইল থেকে দিনাজপুর শহরে আসার পথে ব্রাক স্কুলের সামনে ভোরের দিকে পুলিশ ভ্যানে উপস্থিত ৩ জন সদস্য এসআই মইনুল কনেস্টবল সাত্তার ও অমৃত ইয়াসমিনের শ্লীলতাহানী ঘটিয়ে চলন্ত পিক আপ ভ্যান থেকে ছুড়ে ফেলে দিলে তার মৃত্যু ঘটে।

ইয়াসমিনের এই হৃদয়বিদারক মৃত্যুর ঘটনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যার জের ধরে বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার জনতা কোতয়ালী থানা ঘেরাও করে। লুট হয় একে একে কাষ্টমস্ গোডাউনসহ শহরের বিভিন্ন সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। জ্বালিয়ে দেয়া হয় ৪ টি পত্রিকা অফিস ও প্রেসক্লাব। ২৭ আগষ্ট বিক্ষুব্ধ জনতা একে একে রাজপথে নেমে এসে সকল প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি এবং দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তি দাবী করলে জনতার উপর পুলিশ নির্বিচারে গুলী করে। এ ঘটনায় সামু, কাদের ও সিরাজসহ ৭ জন নিহত হয়। আহত হয় আরও শতাধিক ব্যক্তি। তারা এখনও বেঁেচ আছে মৃত্যু যন্ত্রণায়।

দিনাজপুর থেকে নিরাপত্তাজনিত কারনে ইয়াসমিন হত্যা মামলাটি স্থানান্তর করা হয় রংপুরে। রংপুর বিশেষ আদালতে ইয়াসমিন হত্যা মামলার স্বাক্ষ্য প্রমান শেষে দোষী প্রমানিত ৩ পুলিশ সদস্যেকে ফাঁসি দেয়া হয়। উপমহাদেশের ইতিহাসে দোষী পুলিশদের ফাঁসিতে মৃত্যু কার্যকরের ঘটনা এটাই প্রথম।

ইয়াসমিনের স্মরণে দিনাজপুরের দশ মাইল এলাকায় তৈরী করা হয়েছে ইয়াসমিন স্মরণী। দিবসটি বিভিন্ন সংগঠন নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। দিবসটি পালনে ইয়াসমিনের পরিবার এবং বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান দিনব্যাপী দোয়া মাহফিল, কবর জিয়ারত ও আলোচনা সভাসহ গ্রহন করেছে বিভিন্ন কর্মসূচী। ইয়াসমিন ট্রাজেডি’র কালের স্বাক্ষী এই ইয়াসমিনের মা। ইয়াসমিনের মায়ের প্রাণের দাবী- আর যেন না ঘটে আইন-শৃংখলা বাহিনী’র হেফাজতে ইয়াসমিন ট্রাজেডি’র মতো জঘন্যতম ঘটনা।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে