সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

তাঁতের বুনন

প্রকাশের সময়: ৭:৩৮ অপরাহ্ণ - শনিবার | সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

মাকুর টানে টানা আর পড়েনের ঐকতানে তৈরি হয় বারো হাত লম্বা টাটকা তাঁতের শাড়ি। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য এই সুতোয় বোনা রঙিন তাঁতের শাড়ি। তাঁতের বুননে তৈরি শাড়ির খোঁজ পাওয়া যায় বিশ্ব পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাংয়ের লেখনীতে। প্রাচীনতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বিখ্যাত ভ্রমণ পুঁথির তাঁত নিয়ে লেখা শব্দগুচ্ছ। নিখুঁত বুনন সুতায় বৈচিত্র্য, নরম ও আরামদায়কতা এই জনপ্রিয়তার কারণ। বাংলার তাঁতিরা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন হাজার বছর ধরে। বংশপরম্পরায় করছে এই কাজ। তাঁত হচ্ছে এক ধরনের যন্ত্র, যা দিয়ে তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে শাড়ি বানানো হয়। তাঁত বিভিন্ন রকম হতে পারে। এই যন্ত্র দিয়ে তাঁতিদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আসে একেকটা শাড়ি। তাঁতযন্ত্রে বোনা শাড়িগুলোই তাঁতের শাড়ি হিসেবে চিনি আমরা। সুতার ধরনের ভিন্নতা থেকে আসে শাড়িতে ভিন্নতা। সিল্ক্ক, রেশম, সুতি সুতা সবই তাঁতের শাড়ির অন্তর্ভুক্ত। রেশম বা সিল্ক্ক শাড়ির সুতাগুলো বেশ দামি হয় বলে শাড়িগুলো সুতি শাড়ির থেকে দামি। একই রঙের হালকা বা গাঢ় মিশেল, বিপরীত রঙের সুতা দিয়ে ঐতিহ্যবাহী নকশা ফুটিয়ে তোলেন তাঁতিরা। ডুরে পাড়, নকশা করা পাড়, টেম্পল পাড়, জরিপাড়সহ আরও বাহারি পাড় তাঁতের শাড়ির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শাড়ির জমিনে বুটিক কাজ, বড় নকশা বা কাজ ছাড়া সব ধরনের শাড়িই বাঙালি নারীর পছন্দের শীর্ষে। বর্ষা শেষে সাদা-নীল মেঘের ভেলায় চড়ে শরতের আগমন ঘটেছে। শরতের মৃদু বাতাসের সঙ্গে আছে ঝকঝকে আকাশের কড়া রোদের দাবদাহ। এ সময়ের পোশাক নিয়ে বিপাকে নারীরা। নরম ও আরামদায়ক বলে সবচেয়ে বেশি কদর বাড়ে তাঁত কাপড়ের। শুধু শাড়ি নয়, সালোয়ার-কামিজ সেট, ফতুয়া-পাঞ্জাবিও হয় তাঁতে। এ সময়ের আবহাওয়ার সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে যায় সুতি তাঁত। শরতের কাশবন আর সাদা তুলোর মতো মেঘের দিনে হালকা আসমানি রঙের সুতি শাড়িতে গাঢ় চিকন ডুরে পাড়ের শাড়ি- ভাবতেই চোখের সামনে একটি স্নিগ্ধ সুন্দর প্রতিমূর্তি ভেসে ওঠে। নীল, আসমানি, হালকা গোলাপি, সবুজ ইত্যাদি রঙের শাড়ি ভালো লাগবে এ সময়।

তাঁতের শাড়িতে অলঙ্করণ করে বৈচিত্র্য আনা যায় খুব সহজ ও দারুণভাবে। ব্লকপ্রিন্ট, অ্যাপ্লিক, এমব্রয়ডারি, হাতের কাজ অলঙ্করণ মাধ্যম হিসেবে অধিক জনপ্রিয়। তবে ইদানীং স্ট্ক্রিনপ্রিন্টের প্রচলন অনেক। বিভিন্ন ধরনের মোটিফ ব্যবহার হচ্ছে, মোটিফেও নতুনত্ব এসেছে। ফিগারটিভ, গল্প-কাহিনীভিত্তিক মোটিফ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তাঁতের সুতি শাড়িতে কোনো কোনো ব্র্যান্ড ব্যবহার করছে দেশি ও সংস্কৃতিনির্ভর নকশা। গল্পনির্ভর কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ চরিত্রনির্ভর মোটিফ হচ্ছে, সংলাপ কবিতা বা যে কোনো লেখাকে মোটিফ হিসেবে শাড়িতে ব্যবহার খুব চলছে এখন। মোটা পাড়ের শাড়ি যেমন নারীর পছন্দ, ঠিক তেমনি সরু পাড়ের শাড়িও। সাধারণত যারা একটু লম্বা, মোটা পাড়ের শাড়ি তাদের মানিয়ে যায় বেশ। সরু পাড়ের শাড়িগুলোর জমিনে কাজ থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। চেক ও স্ট্রাইপ শাড়ির প্রিন্ট হিসেবে খুবই জনপ্রিয়, বিশেষ করে তাঁতের শাড়িতে। কিছুদিন আগেও কুচি প্রিন্টের খুব চল ছিল। শুধু কুচির জায়গায় অন্যরকম নকশা। আড়াআড়ি চেক ও লম্বালম্বি চেক, দু’রকমই ভালো লাগে শাড়িতে। তাঁতিরা তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা পরিচয় দেন প্রতিটি শাড়িতেই। রঙের ব্যবহার, নকশা-কাজ, ডিজাইনে নতুনত্ব দেখলে বোঝা যায়, কতটা দক্ষ ও বিচক্ষণ।

রঘুনাথ বসাক, এ রকমই একজন তাঁতি, যিনি কি-না ধরে রেখেছেন এই ঐতিহ্য। বাপদাদার ব্যবসাকে নিজের পেশা হিসেবে নিয়েছেন। ছোটবেলা থেকে তাঁত-তাঁতিদের সান্নিধ্যে থেকে একটা ভালোবাসা জন্মে যায়। তার ছেলেও এই ধারার বিপরীতে যাননি। তিনিও করছেন এই ঐতিহ্য বহনকারী কাজ। ‘যজ্ঞেশ্বর’ সারাদেশে শাড়ি সরবরাহ করার পাশাপাশি দেশের বাইরেও রফতানি করে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শাড়ি রফতানি করেন তারা। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি সারাদেশের মানুষের কাছেই পরিচিত। যুগ যুগ ধরে শাড়ি তৈরির সঙ্গে জড়িত টাঙ্গাইলের তাঁতপ্রেমী মানুষরা। ব্যবসায়িক বিষয়ের সঙ্গে ভালোবাসা আর ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টাও জড়িত। সুতি বা সিল্ক্ক কোটা, মার্সেলাইজ সুতি শাড়ি, হাফসিল্ক্ক ইত্যাদি তাঁত শাড়িতে এনেছে নতুনত্ব। শাড়িগুলোতে সুতার বুনন করা পাড় ও জমিনে কাজ থাকে, আবার অনেক সময় শুধু জরির পাড় দিয়ে থাকেন তাঁতিরা। তাঁত শাড়ি যে কোনো উৎসব অনুষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে মানানসই ও রুচিশীল পোশাক। অফিসে যাওয়ার শাড়ি হিসেবে বাঙালি নারীর প্রথম পছন্দ তাঁত। এ ছাড়া আড্ডা, দাওয়াত বা বাইরে যাওয়ার জন্য আরামদায়ক ও রুচিশীল মাধ্যম তাঁতের শাড়ি। শাড়ির সঙ্গে হালকা মেকআপ ও গহনা পরে চলে যাওয়া যায় যে কোনো কাজে। অনেকেই অফিস শেষে দাওয়াতে যেতে পড়েন বিপাকে। সে ক্ষেত্রে তাঁত শাড়ি এনে দিতে পারে সমাধান ও স্বস্তি। তাঁতের শাড়ি রঙের জন্য জনপ্রিয় সব সময়। তাঁতের সুতার রঙ অন্য সব সুতা থেকে সুন্দর ও সঠিক। তাই মনমতো কম্বিনেশন পাওয়া যায়। দেশি ব্র্যান্ড রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন সব সময়ই। তাঁতের বুননে তৈরি টাটকা শাড়ি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘টাঙ্গাইলের তাঁত রঙ বাংলাদেশের নিয়মিত আয়োজন। বুননের ক্ষেত্রে তাঁতের টানা ও পড়েনের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আগে থেকেই। থিমের সঙ্গে মিল রেখে মোটিফ ও রঙ নির্দিষ্ট করে তবেই শুরু করা হয় বুনন কাজ।’

তাঁত শাড়ির কিছু বৈশিষ্ট্য যুগে যুগে জনপ্রিয়তা কমার পরিবর্তে বাড়িয়ে দিচ্ছে দিন দিন। ফ্যাশন জগতে যারা নতুন পা রাখছেন, তাদের অনেকেই তাঁত নিয়ে কাজ করছেন। বেরিয়ে আসছে নতুনত্ব, তৈরি হচ্ছে নতুন শাড়ি নতুন ডিজাইনে।

তাঁত শাড়ির নাম শুনলেই চোখ বন্ধ করে সবার আগে মনে পড়ে টাঙ্গাইলের নাম। যদিও মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জেও বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হচ্ছে তাঁতের শাড়ি। পাবনা, ঠাকুরগাঁও, কুষ্টিয়াও তাঁতের জন্য বেশ জনপ্রিয়। একেক এলাকার শাড়ির বৈশিষ্ট্য একেক রকম। ঠাকুরগাঁওয়ের তাঁত একটু মোটা ও ভারী। পাবনার তাঁত নরম ও পাতলা হয়ে থাকে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় তাঁত শাড়ির দাম। তাঁতিদের কাছে ৪০০ থেকে ৮০০০ টাকা পর্যন্ত দামের শাড়ি পাওয়া যায়। দাম, আরামদায়কতা ও সহজলভ্যতা- এই ১২ হাত লম্বা বস্ত্রের জনপ্রিয়তা ধরে রাখছে যুগের পর যুগ।

সুত্র: সমকাল

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে