বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

যাদের ত্যাগে স্বাধীনতাঃ ঠাকুরগাঁওয়ের বীরঙ্গনা টেপরি রানী

প্রকাশের সময়: ২:৪২ অপরাহ্ণ - বুধবার | সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

মোঃ সাদ্দাম হোসেন,ঠাকুরগাঁও॥ স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্ব অর্জনের ৪৭ বছর পেরিয়েছে। লাল সবুজের পতাকা পতপত করে উড়ছে। কিন্তু যাদের ত্যাগের বিনিময় অর্জিত এই রক্তগৌরবময় স্বাধিনতা, কেমন আছেন তারা…? কিভাবে চলছে আলো-আঁধারের দিনগুলো, এমন প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে বারবার। এমনই সম্ভ্রমহারা এক নারী টেপরি রানী।
বয়সটাও বেড়েছে, শরীরটাও নুয়ে পড়েছে। ঘটেছে স্মৃতিভ্রম। বাসা বেঁধেছে নানা রোগ-বালাই। এর পরেও জীবন থেমে নেই। চলছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে।
সালটা ১৯৭১, চারদিকে যুদ্ধের ডামাডোল। তখনও সিঁথীর সিঁদুর মুছে যায়নি। নব-বধুর রেশটাও কাটেনি। বিয়ের সপ্তাহখানেক পরেই টেপরি রানীকে ধরে নিয়ে যায় পাক সেনারা। এর পর পাশাবিক নির্যাতন চালানো হয় তার ওপর। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে বন্দীদশায় কেটে যায় টেপরি’র ৬ মাস। সেই নারকীয় দিনের ঘটনা তার কাছে স্পস্ট হলেও ভয়ে বাকরুদ্ধ তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার বলিদ্বারা গ্রামে বাবা মুদিরাম বর্মণের বাড়িতে বসবাস করতেন টেপরি। বিয়ে হয়েছিলো পাশের গ্রামের বৈশাখু বর্মনের সাথে। এ সময় পাক হানাদাররা ছড়িয়ে পরে পুরো উপজেলায়। চলে হত্যাযজ্ঞ, লুট, অগ্নিসংযোগ আর নারীদের ওপর বিরূপদৃষ্টি। তাদের রোশানল থেকে বাঁচতে বসতবাড়ি ফেলে প্রতিবেশীদের সাথে টেপরি রানীর পরিবারও আশ্রয় নেয় অন্যত্র। বাড়িতে কাউকে না পেয়ে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায় তাদের ৫টি গরু। বাড়িতে ফিরে টেপরি ছোটভাইকে নিয়ে গরু উদ্ধারে ক্যাম্পে গেলে তাকে আটক করা হয়। চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন।
সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ছোট ভাই সনাতন বলেন, আমার বোনের সম্মানের বিনিময়ে সেদিন আমাদের প্রাণ বাঁচে। কিন্তু যুদ্ধের পর ফিরে এসে আমাদের অনেক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। টেপরির সর্বস্ব লুটে নিয়ে দীর্ঘ ৬ মাস পর ছেড়ে দেয় হানাদাররা। গ্লানিকর ভাবে তাঁর গর্ভে আসে যুদ্ধশিশুর ভ্রƒণ।
ততদিনে যুদ্ধ শেষ, চারদিক বিজয় উল্লাস। তখন টেপরি ভেতরে জ¦লছিলেন ক্ষোভের আগুনে। বাড়িতে ফিরেই জন্ম নেয় অনাহুত একটি পুত্র সন্তান। সন্তানের শোকে সবুজ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তার বাবা-মা। স্বামীও ত্যাগ করেন তাকে। বুকভরা যন্ত্রণা, ক্ষোভ আর কষ্টে অনেকগুলো বছর পার হয়েছে।
গেল বছর পেয়েছেন বীরঙ্গনার স্বীকৃতি। এবছর পেলেন মুক্তিযোদ্ধার ভাতা। সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিলেন জেলা প্রশাসক আখতারুজ্জামান।
বিদায়ী জেলা প্রশাসক আব্দুল আউয়াল উদ্যোগ নিয়ে দুই রুম বিশিষ্ট একটি বাড়ি করে দেন টেপড়ী রাণীকে তবে সেটার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ , বাথরুম বা বারান্দাবিহীন বাড়ি।
বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার আশ^াস দিলেন এবং জেলার প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গণার জন্য বর্তমান সরকার সবকিছু করছে বলে জানিয়ে দিলেন।

ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য এ এলাকার মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গর্বিত উত্তরাধিকারী সেলিনা জাহান লিটা এমপি বলেন, আর্থিক সহযোগীতা আর সমবেদনাই যথেষ্ট নয় এ বীরাঙ্গনাসহ সকল বীরাঙ্গনার প্রতি মন থেকে সম্মান দিতে হবে প্রত্যেক দেশবাসীকে। তিনি বলেন, অনেক লাঞ্চনা গঞ্জনার মধ্য দিয়ে টেপড়ী রাণী ও তাঁর যুদ্ধশিশুর জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছে , সেসব দিনকে আমরা চিরবিদায় জানাতে চাই।
টেপরি রানীর বেশি চাওয়া নেই; জীবনের শেষ সন্ধিক্ষণে পড়ে থাকা নিথর দেহটাকে লাল সবুজের পতাকায় মুড়িয়ে জাতি তাকে বিদায় জানাবে এমন প্রত্যাশা তাঁর।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে