সোমবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৮ | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

মনোনয়নের দৌঁড়ে খাগড়াছড়ির আ’লীগ নেতারা

প্রকাশের সময়: ৪:১৯ অপরাহ্ণ - শনিবার | সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

বিপ্লব তালুকদার, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই  ঘনিয়ে আসছে, সংঘাত ততই বেড়ে চলেছে খাগড়াছড়িতে। এই সংঘাতে লাভবান হচ্ছে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি। অপরদিকে নির্বাচনে জয়ী হওয়া নিয়ে দুর্ভাবনার মেঘ জমছে জেলা আওয়ামী লীগে। চলতি বছরের শুরু থেকেই ‘ইউপিডিএফ’, নবগঠিত ‘গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ’ এবং জনসংহতি (এমএন লারমা) অংশের ত্রিমুখী সশস্ত্র সংঘর্ষে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি বিরাজমান। স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন চলছে আগামী নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশ নেয়, তাহলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে আওয়ামী লীগ।

খাগড়াছড়ি ২৯৮ নং আসনে বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শক্ত প্রতিপক্ষ ছিল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিফ)। অষ্টম, নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ইউপিডিএফ’র ভোট ক্রমশ: বেড়েছে।কিন্তু জনসংহতি ও গণতান্ত্রিক ইউপডিএফ’র যৌথ সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে ‘ইউপিডিএফ’র এখন চরম দুর্দিন যাচ্ছে। এই অবস্থা নির্বাচন পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে কি হয় সেই দুশ্চিন্তাও ভর করেছে আওয়ামী শিবিরে।

আবার নির্বাচনী বছরেও আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকায় মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে দেখা যাচ্ছে দোদুল্যমান সংশয়। ঠিক তার বিপরীতে ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে অঙ্গসংগঠনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেছে বিএনপি।ঘরে-বাইরে অস্থিরতার মধ্যেও বিপুল সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত কর্মী বাহিনী নিয়ে ঠিকে থাকার এবং এগিয়ে যাবার কৌশলে দিন পার করছে ‘ইউপিডিএফ’। ধর-পাকড়, হামলা-মামলার সত্ত্বেও মাঠ ছাড়েনি দলটির নেতাকর্মীরা।

জেলা নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ৯ উপজেলা নিয়ে খাগড়াছড়ি একটি সংসদীয় আসন (২৯৮নং)। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লক্ষ ৪১ হাজার ৬৮ জন। গত সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লক্ষ ৮১ হাজার ৫১৬ জন। এবার ভোটার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬০ হাজার। যার অধিকাংশই তরুণ প্রজন্মের।

.বিগত ২০০৯ সাল থেকে টানা দুই মেয়াদে সরকারের পাশাপাশি খাগড়াছড়ি আসনেও আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দশম সংসদে নির্বাচিত এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এখন প্রতিমন্ত্রী পদ-মর্যাদায় শরণার্থী পূর্নবাসন টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদে আছেন। বিএনপি বিহীন আলোচিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ইউপিডিএফ প্রধান প্রসিত খীসাকে ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয়ী হন তিনি।

নির্বাচিত হবার ২ বছরের মাথায় ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত খাগড়াছড়ি পৌরসভার নির্বাচনে দলের জেলা কমিটির দীর্ঘ দিনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহেদুল আলমের আপন ছোট ভাই রফিকুল আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো পৌর মেয়র নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে জাহেদুল আলমের আরেক জেঠাতো ভাই শানে আলম দলীয় মনোনয়নে ‘নৌকা’ প্রতীকে নির্বাচন করাকে কেন্দ্র করে দলের ভেতর সহিংস পরিস্থির সৃষ্টি হয়।

জাহেদুল আলম ও যুগ্ম-সম্পাদক এসএম শফিসহ অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের বেশকিছু নেতাকর্মী দলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিকুল আলমের পক্ষে অবস্থান নেন। সেই বিরোধের জেরে এখনো খাগড়াছড়িতে দ্বন্ধ সংঘাত অব্যাহত আছে।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সর্বশেষ বর্ধিত সভার সিদ্ধান্তে জাহেদুল আলমকে সাময়িক বহিস্কার করে তার স্থলে ১নং যুগ্ম-সম্পাদক এসএম শফিকে (যিনি নিজেও পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে ছিলেন) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনে মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু তিনিও সেই পুরোনো ধারায় অবস্থান করায় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে এক ধরণের স্থবিরতা বিরাজ করছে।

গত প্রায় ৩ বছর ধরেই জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ও দলীয় কর্মসূচি পালিত হচ্ছে দ্বিধাবিভক্ত এবং দুটি কার্যালয় থেকে। ফলে সাধারণ নেতাকর্মী এবং তৃণমূলে দলটির কার্যক্রম অনেকটা লোক দেখানো-দায়সারা পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ যতোই ঘনিয়ে আসছে ততোই সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

মূল দলের বিরোধে ছাত্রলীগের কার্যক্রম ইতোমধ্যে স্থগিত হয়ে গেছে। যুবলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগও প্রায় বিলীন হয়ে গেছে বললেই চলে। অন্যান্য সহযোগি ও অঙ্গসংগঠনের প্রতিটি ইউনিটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। উভয় অংশের কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণ কমে গেছে।

এই কঠিন অবস্থার মধ্যেও সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা যথাসম্ভব নেতাকর্মীদের সাথে মাঠে থাকার চেষ্টা করছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাবেন, এমন আত্মবিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনি ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ভৌগলিক আয়তনে বিশাল এই জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্নয়ন কর্মকান্ডের পাশাপাশি গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। দলের বৃহৎ অংশকে নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি।

বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক এই নেতার বিপরীতে এখন পর্যন্ত আগের মেয়াদের এমপি (সর্ম্পকে তাঁর কাকা) যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা, বর্ষীয়াণ আওয়ামী লীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা (কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা’র বেয়াই) রণ বিক্রম ত্রিপুরা (সর্ম্পকে তাঁর বেয়াই), পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম সহ-সভাপতি কংজরী চৌধুরী, কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ও বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি বাসন্তী চাকমা এবং এছাড়া পৌর মেয়র মো. রফিকুল আলম (সাময়িক বহিস্কৃত জেলা আওয়ামী লীগের সা: সম্পাদক জাহেদুল আলমের ছোট ভাই) দলটির মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে ধারণা করছেন অনেকেই। আর যদি মনোনয়ন নাও পান তাহলে তিনি আঞ্চলিকতার ইস্যুতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবার গুঞ্জন রয়েছে।

পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পার্লামেন্টারি বোর্ডে ডেকেছিলেন। তাঁর বদান্যতায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। তিনি যাঁকেই উপযুক্ত মনে করবেন, তাঁকে জিতিয়ে আনাই হবে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে আসেন আশির দশকে। নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান, মনোনীত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছাড়া ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘নৌকা’ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রী পদ-মর্যাদায় শরণার্থী পূর্নবাসন টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি জানান, এবার অবশ্যই দলের মনোনয়ন চাইবেন। গত নির্বাচনে অসুস্থতার কারণে মনোনয়ন চাননি। তৃণমূল ও কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। সাধারণ নেতাকর্মীরা এখনো তাঁর নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, জননেত্রী এবং দল যাঁকে মনোনয়ন দেয়, তার পক্ষেই আমি সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে কাজ করবো।

খাগড়াছড়ির বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা প্রতিটি সভায় প্রায়ই বলেন, মনোনয়নের চুড়ান্ত এখতিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেই। আমরা যাঁরা মাঠের কর্মী আমাদের দায়িত্ব হলো দলকে জনগণের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলেন, মনোনয়ন যিনিই পাবেন তাঁর পক্ষেই আমি অতীতের মতো সর্বশক্তি নিয়ে কাজ করবো। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি ধরে রাখাই জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মীর উদ্দেশ্য।

উপরে