সোমবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৮ | ৭ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

ইসলামই নারীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল

প্রকাশের সময়: ৭:০২ পূর্বাহ্ণ - বুধবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮

 

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

নারী-পুরুষের যৌথ উদ্যোগেই গড়ে উঠেছে মানব সভ্যতার মজবুত ভীত। সমাজ গঠনে একে অন্যের অনিবার্য পরিপূরক। পুুরুষের বিপরীত শব্দ নারী। এ বৈপরীত্য শুধু শব্দে নয়, দেহ-মনে, চালচলনে, কাজে-কর্মে, কণ্ঠে ও আচার-আচরণে। পুরুষ কঠোর ও কঠিন, নারী কোমল ও লাজুক। শাব্দিক, শারীরিক ও মানসিক ভিন্নতার পাশাপাশি উভয়ের কর্মক্ষেত্রও ভিন্ন। পুরুষ রাত-দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জীবিকার তাগিদে ছুটে বেড়ায় দিগ্দিগন্তে। স্ত্রী মনের মাধুরী দিয়ে ঘর সাজায়, রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়। সন্তানকে মমতায় গড়ে তোলে। আদর্শ আগামী প্রজন্ম উপহার দেওয়ার মহান দায়িত্ব পালন করে স্ত্রী।

সংসার নারীর রাজ্য। প্রধান কর্মক্ষেত্র। নারী উন্নয়নের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। উন্নয়নের অর্থ যদি হয় অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও নিরাপত্তার অধিকার, তাহলে বিবস্ত্র ও বেপর্দা হয়ে অবাধ বিচরণের কী প্রয়োজন? পর্দায় থেকে কি অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা পাওয়া অসম্ভব? কখনোই নয়। তবে হ্যাঁ, উন্নয়নের অর্থ যদি হয় নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিশ্চিত করা, ইয়াবাসহ মাদক সেবন, লিভটুগেদার, উলঙ্গপ্রায় হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, বিয়ের আগেই সন্তানের মা হওয়ার অধিকার, তবে একমাত্র ইসলামই এ অধিকারের অন্তরায়। একবার নয়, হাজারবার ইসলাম সে প্রগতির প্রধান বাধা।

পর্দা কি নারী উন্নয়নের একমাত্র অন্তরায়? এর উত্তরে নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, ‘উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত ভগ্নীদের সহিত দেখা সাক্ষাৎ হইলে তাঁহারা প্রায়ই আমাকে বোরকা ছাড়িতে বলেন। বলি, উন্নতি জিনিসটা কী? তাহা কি কেবল বোরকার বাহিরেই থাকে? যদি তাই হয়, তবে কি বুঝিব যে, জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা আমাদের অপেক্ষা অধিক উন্নতি লাভ করিয়াছে?’ (মতিচূর প্রথম খণ্ড, বোরকা : ৫৯-৬৩)

‘নারীবাদী হয়েও কেন হিজাব ও বোরকা পরেন?’ এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়েমেনের বিশ্ববিখ্যাত নারীবাদী নেতা, নোবেল বিজয়ী তাওয়াক্কুল কারমান আরো সুন্দর করে বলেছেন : ‘Man in the early times was almost naked, and as his intellect evolved he started wearing clothes……It’s the removal of clothes again that is regressive back to ancient times.’ অর্থাৎ আদিম যুগে মানুষ থাকত প্রায় নগ্ন হয়ে। তার বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সে পোশাক-পরিচ্ছদ পরতে শুরু করে। আজ আমি যা হয়েছি তা মানুষের অর্জিত ধ্যান-ধারণা ও সভ্যতার সর্বোচ্চ পর্যায়, এটা পশ্চাদ্গামিতা নয়। পোশাক-পরিচ্ছদ অপসারণ সেই আদিম যুগে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা। সেটাই পশ্চাদ্গামিতা।’ (উইকিপিডিয়া)

ইসলাম কি নারী উন্নয়ন ও প্রগতির পথে বাধা? এর উত্তর শুনুন বেগম রোকেয়ার ভাষায়- ‘জগতে যখনই মানুষ বেশি অত্যাচার-অনাচার করিয়াছে, তখনই এক-একজন পয়গম্বর আসিয়া দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করিয়াছেন। আরবে স্ত্রী জাতির প্রতি অধিক অত্যাচার হইতেছিল; আরববাসীগণ কন্যা হত্যা করিতেছিল। তখন হযরত মুহাম্মদ কন্যাকুলের রক্ষকস্বরূপ দণ্ডায়মান হইয়াছিলেন। তিনি কেবল বিবিধ ব্যবস্থা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন নাই, স্বয়ং কন্যা পালন করিয়া আদর্শ দেখাইয়াছেন। তাহার জীবন ফাতেমাময় করিয়া দেখাইয়াছেন- কন্যা কিরূপ আদরণীয়া।

সে আদর, সে স্নেহ জগতে অতুল। আহা! তিনি নাই বলিয়া আমাদের এ দুর্দশা।’ (অর্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড-৪৮) নোবেল পুরস্কারের তালিকায় ওঠা পৃথিবীবিখ্যাত কবি ও লেখিকা ড. কমলা সুরাইয়াকে (কমলা দাস) প্রশ্ন করা হয়েছিল- ‘মানুষ মনে করে আপনার ইসলাম গ্রহণের পেছনে একজন পুরুষের হাত রয়েছে।’ কমলা দাস বলেছিলেন, ‘অবশ্যই! ঠিকই শুনেছেন। আমার মুসলমান হওয়ার পেছনে অবশ্যই একজন পুরুষের হাত রয়েছে। তিনি হলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। এই মহামানবের শিক্ষাই আমার জীবন বদলে দিয়েছে। (ইমানজাগানিয়া সাক্ষাৎকার, ৪ : ৩৭৯)

পরিবার, সমাজ এমনকি ইসলামপূর্ব ধর্মও যখন নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতিটুকুও দেয়নি; দেখেছে কেবলই ভোগের বস্তু হিসেবে, সেই চরম সংকটকালেই নারীমুক্তির বারতা নিয়ে বিশ্ব মানবতার কাছে হাজির হলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সৃষ্টিগত দুর্বলতাকে পুঁজি করে নারীর ওপর বয়ে যাওয়া নির্যাতনের অপ্রতিরোধ্য সাইক্লোন থামিয়ে দিলেন কঠোর হস্তে। নির্যাতনের উত্তাল সাগরের ঢেউ থামিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ন্যায় ও ইনসাফের শাশ্বত নারী অধিকার। ক্ষেত্রবিশেষে নারীকে দিলেন পুরুষের চেয়ে বেশি অধিকার। অন্যদিকে ‘সভ্য’ দুনিয়ার ইতিহাস দেখুন :

ইংল্যান্ডে ডাইনি বলে নারীকে পুড়িয়ে মারার আইন রদ করা হয় ১৭৩৬ সালে। হিন্দু নারীরা আজও বঞ্চিত উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে। ১৮৮২ সলের ‘Married Women’s Property Act 1882’-এর আগে ব্রিটিশ আইনে নারীর সম্পত্তিতে ছিল না কোনো অধিকার। বিবাহপূর্ব সময়ে নারীর উপার্জিত সম্পদের মালিকানা বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে চলে যেত তার স্বামীর হাতে। (উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া) ব্যক্তিগত পরিচয়ও ছিল না ইউরোপীয় নারীদের। স্বামীর পরিচয়েই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এর ১৩০০ বছর আগেই মরুভূমির প্রান্তে দাঁড়িয়ে মহানবী (সা.) সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের কথা ঘোষণা করেছিলেন দীপ্ত কণ্ঠে।

হিন্দু ধর্মের হাত ধরে সমাজে চালু হয়েছে অভিশপ্ত যৌতুক প্রথা। রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮২৯ সালে হিন্দু নারীদের স্বামীর সঙ্গে পুড়িয়ে মারা নিষিদ্ধ হয়। মুসলিম নারীদের তাদের স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার কোনো বিধান ছিল না বলেই এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রয়োজনও হয়নি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৫৬ সালে আইনগতভাবে বিধবাবিবাহ সিদ্ধ হয়। কিন্তু এরও ১২৬০ বছর আগে মহান সংস্কারক আমাদের প্রিয়নবী (সা.) নিজে বিধবাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বিধবাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এসব ভেবেই ভারতের রাষ্ট্রীয় অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত তামিল অভিনেত্রী মনিকা আলী ইসলামের সৌন্দর্যের কাছে হার মেনে হিজাব পরে হয়ে যান এমজি রহিমা। তিনি বলেন, ‘কাউকে ভালোবাসা বা অর্থের লোভে আমি ইসলাম গ্রহণ করিনি, ইসলামের মৌলিক নীতিকে পছন্দ করেই এর সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছি।’ (টাইমস অব ইন্ডিয়া : ৩১ মে, ২০১৪) ব্রিটিশ মডেল কারলি ওয়াটসের মাথায়ও হিজাব উঠেছে একইভাবে। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন একজন নারী। সেই ধারাবাহিকতা থেমে যায়নি আজও। পশ্চিমা মিডিয়াগুলোতে ইসলামের বিরুদ্ধে অব্যাহত বিষোদগারের এ সময়েও ফরাসি সংগীতশিল্পী দিয়ামস, মার্কিন চিকিৎসক ডা. ইউ এস অরিভিয়ার মতো শান্তিকামী নারীদের মিছিল নীরবে ছুটছে ইসলামের দিকেই।

বলা হয়, নারীর ক্ষমতায়ন হলেই নারী নির্যাতন কমবে। আসলেই কি তাই? বর্তমান বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের স্বর্ণযুগ চলছে। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের প্রধান, স্পিকার, কৃষিমন্ত্রী- সবাই নারী। রয়েছেন একাধিক নারী প্রতিমন্ত্রী। বিচারালয় থেকে স্থানীয় সরকার- সর্বত্রই নারীর জয়জয়কার। নারীর ক্ষমতায়নের এ স্বর্ণযুগেও নারী নির্যাতন কমছে, নাকি ক্রমেই বাড়ছে? ঘরের বাইরে গিয়ে নারী কি পেয়েছে তার নিরাপত্তা? ক্ষমতায়ন হলেই যদি নারীর নিরাপত্তা হবে তাহলে তো এখন বাংলাদেশে নারী নির্যাতন শূন্যের কোটায় থাকার কথা ছিল।

কিন্তু ক্ষমতায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে নারী নির্যাতন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে এক হাজার ১২৭টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় এক হাজার ২৪৫টি। এপ্রিলে এক হাজার ৯৯৮, মে মাসে দুই হাজার ৬৯, সেপ্টেম্বরে দুই হাজার ৩১৭ জন নারী নির্যাতনের শিকার। (কালের কণ্ঠ, ২৫-১১-২০২৪) সম্প্রতি প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা গেছে, এক বছরে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মাধ্যমে নির্যাতিত হয়েছে ৪৪ জন নারী। তাদের ৪০ জনই নির্যাতিত হয়েছে পুলিশের দ্বারা। (প্রথম আলো, ১৬-০৫-২০১৪)

ইসলাম পরিবারকেই নারীর প্রধান কর্মক্ষেত্র বলেছে। কিন্তু ইদানীং কেউ কেউ বলছে, ‘ঘরের কাজ নারীর জন্য সম্মানজনক নয়।’ তাহলে সৌদি আরবে গিয়ে নারী শ্রমিকরা কী করবে? নিযুক্ত হবে অন্য দেশের মানুষের গৃহকর্মে। অন্য দেশের মানুষের গৃহকর্ম করলে তা সম্মানজনক আর নিজের দেশে থেকে সন্তানকে মমতা দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব নেওয়া অপমানজনক!

হ্যাঁ, প্রয়োজনে নারী ঘরের বাইরে যাবে পর্দার সঙ্গে। মানবকুলের অর্ধেক প্রায় নারীগোষ্ঠীর শিক্ষার মৌলিক চাহিদা মেটাতে নারী শিক্ষক প্রয়োজন। মহিলাদের চিকিৎসা চাহিদা মেটাতে মহিলা ডাক্তার প্রয়োজন। তবে তার শিক্ষাঙ্গন, যানবাহন, কর্মক্ষেত্র হবে নিরাপদ ও নারীবান্ধব। মেডিক্যাল কলেজে নারীদের জন্য পৃথক শিফট। মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে ছাত্রীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা। যেখানে শিক্ষক, পরীক্ষক সবাই হবেন নারী। হাসপাতালে নারীদের জন্য থাকুক পৃথক ওয়ার্ড। শত বছর আগেই তো বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, ‘কেহ কেহ বলেন যে, ঐ উচ্চশিক্ষা লাভ করিতে হইলে এফএ, বিএ পরীক্ষার জন্য পর্দা ছাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হইতে হইবে।

এ যুক্তি মন্দ নহে! কেননা, আমাদের জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া এবং পরীক্ষক স্ত্রীলোক হওয়া কি অসম্ভব? স্বতন্ত্র স্কুল-কলেজ হইলে যথাবিধি পর্দা রক্ষা করিয়াও উচ্চশিক্ষা লাভ হইতে পারে।’ (মতিচূর, পৃষ্ঠা : ৫৯) পৃথক নারীবান্ধব শিক্ষাঙ্গন ও কর্মক্ষেত্রের দাবি উঠেছে ০৪-১২-২০১৪ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানি ও সকল প্রকার সহিংসতামুক্ত শিক্ষাঙ্গন চাই’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায়ও। নারী নির্যাতন, বৈষম্য, নিপীড়ন ও সহিংসতামুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়তে নারীবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ। (প্রথম আলো : ৫-১২-২০১৪)

অফিসে যাওয়ার সময় বা অফিস থেকে ফিরতে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পাবলিক গাড়িতে ওঠার সময় ভিড়ের মধ্যে নারীকে শিকার হতে হয় শারীরিক নির্যাতনের। নির্যাতন রোধ করতে চাই নারীর জন্য পৃথক শিক্ষাঙ্গন ও যানবাহন। দিতে হবে সহজ ও নারীবান্ধব কর্মস্থল। সর্বোপরি থাকতে হবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের দৃষ্টিভঙ্গি। দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে লাভ নেই; ইসলামই নারীর একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল। শান্তির জন্য নারীকে ইসলামের দিকেই আসতে হবে।

 

 

 

যুবায়ের আহমাদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক

উপরে