বুধবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৮ | ২রা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

কসর ও জমা করা সালাত সম্পর্কে কিছু বিধান

প্রকাশের সময়: ১০:০১ পূর্বাহ্ণ - রবিবার | সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮

 

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

 

ইবাদতের ব্যাপারে একটি মৌলিক নীতি হচ্ছে, প্রতিটি ইবাদতের জন্য আল্লাহ তা’আলা একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা সে সময়েই আদায় করতে হয়, যদি না সেটাকে তার সময় থেকে বিশেষ আবশ্যকতা বা প্রয়োজনের কারণে বের করে অন্য সময়ে করার ব্যাপারে দলীল-প্রমাণাদি পাওয়া যায়।আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ٱلَّذِينَ هُمۡ عَن صَلَاتِهِمۡ سَاهُونَ ٥ [الماعون: ٥]
“যারা তাদের সালাত সম্পর্কে বেখবর” [সূরা আল-মা‘উন, ৫] অর্থাৎ তারা সালাতকে তার সময় থেকে পিছিয়ে দেয়।
অনুরূপভাবে বুখারী, মুসলিম, সুনান গ্রন্থকারগণ, মালেক এবং আহমাদ সহ অন্যান্যগণ আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه و سلم أَىُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ ؟ قَالَ : «‏ الصَّلاَةُ لِوَقْتِهَا »‏ .
“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন কাজটি সর্বোত্তম? রাসূল বললেন, সময়মত সালাত আদায় করা”।
কিন্তু হাদীসের দলীল দ্বারাই আবার যে সব রুখসত বা ছাড় দেওয়া হয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দু’ সালাতকে জমা করে এক সালাতের সময়ে আদায় করা।
আর এ জমা করা যোহর ও আসরের মাঝে হয়ে থাকে। সুতরাং যোহরকে দেরী করে আসরের সময়ে নিয়ে যাওয়া অথবা আসরকে এগিয়ে নিয়ে এসে যোহরের সময়ে আদায় করার ছাড় শরী’আত আমাদেরকে দিয়েছে।
অনুরূপভাবে এ জমা করার সুযোগ রয়েছে মাগরিব ও ইশার মাঝে, সুতরাং মাগরিবকে দেরী করে ইশার সময়ে নিয়ে গিয়ে দু’টোকে আদায় করা, অথবা ইশাকে এগিয়ে নিয়ে এসে মাগরিবের সময়ে মাগরিবের পরেই আদায় করে নেওয়ার সুযোগ ইসলামী শরী‘আত আমাদেরকে দিয়েছে।
কিন্তু ফজরের সালাত, আলেমগণের ঐকমত্যে তাকে এগিয়ে নেওয়া কিংবা পিছিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
বস্তুত: সফর অবস্থায় দু’সালাত জমা করে আদায় করার মাসআলাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করে থাকে; অনেকেই আবার এর অনেক মাসআলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে না, অথচ বিষয়টির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই এখানে এ বিষয়ে কিছু মাসআলার অবতারণা করার প্রয়াস পাবো।
প্রথমেই এটা জানা দরকার যে, মহান আল্লাহর রহমত, তিনি মুসাফিরের জন্য সালাত জমা তথা একত্র করা বিধিবদ্ধ করেছেন। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও ছাড়। কারণ মুসাফির এমন কিছু অবস্থা ও পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন যাতে প্রতিটি সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আলেমগণ এ ব্যাপারে ইজমা‘ বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে আরাফার দিন যোহর ও আসরকে এগিয়ে নিয়ে যোহরের সময়ে জমা করে আদায় করা শরী‘আতসম্মত। অনুরূপভাবে তারা এ ব্যাপারেও একমত পোষণ করেছেন যে, আরাফার দিন সূর্য ডুবার পর নাহরের রাতে মুযদালিফায় মাগরিব এবং ‘ইশা একত্র করে ইশার সময়ে পড়া শরী‘আতসম্মত। [দেখুন, আল-ইজমা‘ ইবনুল মুনযির, পৃ. ৩৮; মারাতিবুল ইজমা‘ পৃ. ৪৫]
তবে এর বাইরে অন্য সময়ে সালাত একত্রে আদায় করার ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
সালাত একত্র করে পড়ার বিধান:
আলেমগণ সফরের কারণে দু’সালাত একত্রে আদায় করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন:
১. অধিকাংশ আলেম যেমন মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলীগণ এ মত পোষণ করেছেন যে, সফরের কারণে যোহর এবং আসর অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার সালাতকে একত্রে আদায় করা জায়েয। [আশ-শারহুল কাবীর, ১/৩৬৮; মুগনিল মুহতাজ, ১/৫২৯, কাশশাফুল কিনা‘, ২/৫]
২. হানাফী আলেমগণ বলেন, আরাফা ও মুযদালিফা ব্যতীত দু’ ফরয সালাতকে একত্র করে আদায় করা যাবে না। তবে আকৃতিগতভাবে একত্রিত করা যাবে, আর তা হচ্ছে যোহরকে তার শেষ সময় পর্যন্ত দেরী করে আদায় করা তারপর আসরকে তার প্রথম ওয়াক্তে আদায় করা।
[আদ-দুররুল মুখতার ওয়া হাশিয়া ইবন আবেদীন, ১/৩৮১]

যে সব কারণে দু’ সালাত জমা করা যায়ঃ

যে সব কারণে জমা করার কথা হাদীসের ভাষ্যের উপর ভিত্তি করে আলেমগণ বলেছেন তা হচ্ছে, ভ্রমণ ও বৃষ্টি। তবে কোনো কোনো আলেম অন্যান্য কিছু বিষয়কে বৃষ্টি ও ভ্রমণের অর্থে হওয়ার কারণে এবং ব্যাপকার্থে সেগুলোর অধীন করে জমা করার কথা বলেছেন।

  • তন্মধ্যে বৃষ্টির ব্যাপারে হাদীসের নস হচ্ছে, যা বুখারী ও মুসলিম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন,

أن النبي صلى الله عليه وسلم جمع في المدينة بين الظهر والعصر وبين المغرب والعشاء وزاد مسلم من غير خوف ولا مطر ولا سفر و وقع عند مسلم في هذا الحديث من طريق سعيد بن جبير قال : فقلت لابن عباس لم فعل ذلك ؟ قال : أراد أن لا يحرج أحدا من أمته.

“নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে যোহর ও আসরের সালাতকে এবং মাগরিব ও ইশার সালাতকে জমা করে অর্থাৎ একত্রে আদায় করেছেন”।

মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, কোনো প্রকার ভয় বা বৃষ্টি বা সফর ব্যতীতই।

মুসলিমের অপর বর্ণনায় সাঈদ ইবন জুবাইর থেকে এসেছে, তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেনো রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করলেন? উত্তরে তিনি বললেন, তিনি চেয়েছেন যেন তাঁর উম্মতের কাউকে সমস্যায় পড়তে না হয়।

  • আর সফর সালাত জমা করার একটি কারণ, তার প্রমাণ, বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীস,

«أن رسول الله صلى الله عليه وسلم جمع في حجة الوداع المغرب والعشاء بالمزدلفة»

“নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জের দিন মাগরিব ও ইশাকে মুযদালিফায় জমা করে আদায় করেছেন।”

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘সালাতকে কসর করে পড়ার বিশেষ কারণ হচ্ছে সফর। সফর ব্যতীত তা করা জায়েয নেই। কিন্তু জমা করে আদায় করা, তার কারণ হচ্ছে প্রয়োজন ও ওযর। সুতরাং যখনই তার প্রয়োজন হবে তখনই জমা করা যাবে সে সফর দীর্ঘ হোক কিংবা সংক্ষিপ্ত। অনুরূপভাবে বৃষ্টি ইত্যাদির জন্য জমা করে আদায় করার বিষয়টি। তদ্রূপ রোগ-ব্যাধি ও অনুরূপ কাজের জন্য জমা করা, তাছাড়া অন্য কারণেও জমা করে আদায় করা যাবে। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য উম্মতের উপর থেকে সমস্যা নিরসণ করা। আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সফরে কোথাও (সাময়িক) অবস্থানকালে জমা করেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি তবে কেবল একটি হাদীসে তা এসেছে। আর এ জন্যই জমা করা জায়েয যারা বলেছেন যেমন মালেক, শাফে‘ঈ ও আহমদ তারা সফর অবস্থায় কোথাও সাময়িক অবস্থানকালে জমা করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। তাদের মধ্য থেকে মালেক ও আহমাদ এক বর্ণনায় তা থেকে নিষেধ করেছেন, আর শাফে‘ঈ ও আহমাদ অন্য বর্ণনায় তা জায়েয বলেছেন। অবশ্য আবু হানিফা আরাফা ও মুযদালিফা ছাড়া আর কোথাও জমা করতে নিষেধ করেছেন।

সুতরাং সফররত মুসাফিরের জন্য (যিনি কোথাও সাময়িক অবস্থানকারী নন) দু’ সালাত একত্রে জমা করে আদায় করার ব্যাপারে (আবু হানিফা ব্যতীত) অন্যদের কারও মতভেদ নেই। কারণ সফর হচ্ছে আযাবের একটি টুকরো; যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর দু’ সালাতকে জমা করে আদায় করার সুযোগ দানের মাধ্যমে সহজীকরণের দ্বারা মুসাফিরের সমস্যা দূর করা হয়েছে। আর তা দীনে ইসলামের একটি সাধারণ নীতির অন্তর্গত, তা হচ্ছে এ উম্মত থেকে সমস্যা ও সংকীর্ণতা দূর করা হয়েছে। আর যেভাবে সফরে কসর করা শরীয়ত নির্দেশিত পন্থা বরং সফর হচ্ছে কসর করার কারণ, তেমনিভাবে জমা করাও জায়েয। যদিও জমা করা হচ্ছে রুখসত বা ছাড় আর কসর হচ্ছে শরীয়তের বিধিবদ্ধ নির্দেশনা, তবুও উভয়টিই উক্ত সাধারণ নীতির অন্তর্ভুক্ত।

তবে যে মুসাফির তার নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোথাও সাময়িক অবস্থান নিয়েছে, নিজের বাসস্থান নির্ধারণ না করে, বরং সেখানে প্রয়োজনের খাতিরে অবতরণ করেছে, তারপর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আবার তার সফর চালিয়ে যাবে, এ মুসাফিরের জন্য কি দু’ সালাত একটির সময়ে জমা করে আদায় করা যাবে এ ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। আবু হানিফা রহ. এর ধরনের জমা করাকে নিষেধ করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আরাফাহ ও মুযদালিফায় জমা করার বিষয়টিকে সে দু’ স্থানের সাথে বিশেষিত বলে প্রকাশ করেছেন। সুতরাং তার মতে অন্য কোথাও জমা করা যাবে না।

আর শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, ‘আর যখন তা প্রমাণিত হলো, তখন দু’সালাতকে জমা বা একত্রিত করে আদায় করার বিষয়ে এটা বলা যায় যে, তার কারণ হচ্ছে, নুসুক বা হাজ্জ যেমনটি হানাফী আলেমগণ এবং ইমাম আহমদের একদল সাথী বলে থাকেন। আর তা ইমাম আহমদের সরাসরি ভাষ্যের দাবিও বটে। কারণ তিনি মক্কী হাজীকে আরাফার মাঠে কসর করতে নিষেধ করতেন কিন্তু তাকে জমা করতে নিষেধ করতেন না। তাছাড়া ইমাম আহমাদ মুসাফির কর্তৃক সালাত জমা করে আদায় করার ব্যাপারে বলেছেন যে, কসর করার মতই দীর্ঘ সফরে জমা করবে। আর যদি বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক জমা করার বিষয়টি ছিল হাজ্জের কারণে, তাহলে সেখানে দু’টি মত রয়েছে, এক. আরাফাহ্‌ ও মুজদালিফাহ্‌ ছাড়া কোথাও জমা করা যাবে না, যেমনটি হানাফীগণ বলেছেন। দুই. হাজ্জ ব্যতীত জমা করার অন্যান্য কারণেও জমা করা যাবে যদিও সফর না হয়, আর তা হচ্ছে বাকী তিন ইমামের মত।

আর সত্য হচ্ছে,

  • যখন কেউ সফর-রত অরস্হায় থাকবে, তখন দুই সালাতকে এগিয়ে এনে বা পিছিয়ে নিয়ে জমা করে আদায় করা যাবে।
  • অনুরূপভাবে যখন কেউ সফরে কোথাও সাময়িক অবস্হান করে সেখানেও যদি জমা করে সালাত আদায় করার প্রয়োজন দেখা দেয় তবে তাও করবে। যাতে করে সমস্যা মুক্ত হওয়া যায়।
  • তদ্রূপ মুকীম অবস্থা বা সফর ব্যতীত নিজ জায়গায় অবস্হানকারী ব্যক্তিগণও প্রয়োজনে দু’ সালাতকে জমা করে পড়তে পারেন।

যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন থাকার কারণেই মুজদালিফায় জমা করেছিলেন। অথচ প্রয়োজন না থাকায় মীনায় তা করেননি। যদি প্রয়োজন না থাকলেও তা বৈধ হতো তবে রাসূল সেখানে তা করতেন, কারণ তা করার চাহিদা ও দাবী তো ছিলই অর্থাৎ তিনি সফরে ছিলেন। তারপরও তিনি তা করেন নি, অর্থাৎ সফরে কোথাও অবতরণ অবস্থায় দু সালাত জমা করে আদায় করাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন ও আবশ্যকতার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।

মোটকথা: মুসাফির কোথাও সাময়িক অবস্থান নিলে সেখানে দু’সালাত জমা করার বিষয়টি প্রয়োজন ও আবশ্যকতার সাথে সম্পৃক্ত, যেমনিভাবে এ জমা করার বিধান মুকীম বা স্থায়ী আবাসস্থলেও প্রয়োজনে করার বিধান শরী‘আতে রয়েছে। কিন্তু সফরে কসর করার বিধান এর ব্যতিক্রম তা স্বাভাবিক নিয়ম, শুধু ছাড় নয়। আর এ জন্যই সফরে কসর করা সর্বাবস্থায় নিয়মসিদ্ধ বিষয়, সফর চলতে থাকুক বা কোথাও সাময়িক অবস্থানে থাকুক। কারণ সাহাবীগণ থেকে তা প্রমাণিত হয়েছে, আর সেটা মারফূ‘ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত।

সূত্র- islameralobd
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com

উপরে