বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ | ৫ই পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

মনোনয়নপত্র জমা দেবেন বিএনপির প্রত্যাশী সবাই

প্রকাশের সময়: ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ - সোমবার | নভেম্বর ১৯, ২০১৮

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

মনোনয়নপ্রত্যাশী সবাইকে সংশ্লিষ্ট উপজেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর দল থেকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে যাকে স্বীকৃতি দেবে তার পক্ষে বাকিদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছে স্থায়ী কমিটির নেতাদের নিয়ে গঠিত মনোনয়ন বোর্ড। একই সঙ্গে বোর্ড সবাইকে প্রশ্ন করেন, কেন প্রার্থী হতে চান? চলমান পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে টিকে থাকতে পারবেন তো? মনোনয়ন বোর্ডে লন্ডন থেকে ভিডিও

কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মনোনয়ন বোর্ডে ছিলেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকরা এবং সংশ্লিষ্ট জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। সাক্ষাৎকারের সময় তাদেরও মতামত নেওয়া হয়েছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সংসদীয় আসনগুলোর মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া শুরু করে বিএনপি।

আজ সোমবার সকাল ৯টা থেকে বরিশাল বিভাগের সংসদীয় আসনগুলোর মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। বিভাগওয়ারী সাক্ষাৎকারের সময় মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তাদের সমর্থকদের সঙ্গে করে আনলে তা অসদাচরণ বলে গণ্য হবে বলে দলের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। কিন্তু এই নির্দেশনা অমান্য করে গুলশান কার্যালয়ের সামনের সড়কে হাসান জাফির তুহীন পাবনা-২ এবং নাজমুল হাসান তালুকদার রানা সিরাজগঞ্জ ১-এর পক্ষে পৃথক ব্যানার নিয়ে শোডাউন করতে দেখা যায়।

গতকাল পঞ্চগড় জেলার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দিয়ে সাক্ষাৎকার শুরু হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বিএনপি প্রথম দিনে এ দুই বিভাগের ১৬ জেলার ৭২টি নির্বাচনী এলাকার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেয়। পর্যায়ক্রমে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার ৭২টি নির্বাচনী এলাকার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

প্রথম দিন রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের জন্য ১৫৭ ও রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের জন্য ৩৬৮ জনের সাক্ষাৎকার নেয় বিএনপি। মনোনয়ন বোর্ডে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, লে জে (অব) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সাক্ষাৎকার শেষে জানতে চাইলে পঞ্চগড়-২ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, এ আসনে আমরা চারজন সাক্ষাৎকার দিয়েছি। সবাই বলেছি, এই আসনে বিএনপি ছাড়া অন্যকোনো দলের কাউকে মনোনয়ন না দিতে।

জানা গেছে, এই আসনে ২০-দলীয় জোটের অন্যতম নেতা জাগপার প্রয়াত শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান নির্বাচন করতে চান। বিএনপিও তাকে দেওয়ার পক্ষে।

নীলফামারী-৪ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন বলেন, ব্যক্তি জনপ্রিয়তা এবং দলের সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই আসনটি আমি বিএনপিকে উপহার দিতে চাই, এ কথা আমি মনোনয়ন বোর্ডকে বলেছি। এলাকার মানুষও চায় আমি যেন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। তার পরেও দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু নাটোর-১ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী। সাক্ষাৎকার শেষে বলেন, ছাত্রদল, যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ করেছি। আমি যেন নির্বাচন করি, এ জন্য এলাকার জনগণেরও চাপ আছে আমার ওপর। এখন মনোনয়ন বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা মেনে নেব। ফরহাদ হোসেন আজাদ সাক্ষাৎকারের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার কেমন সম্পর্ক রয়েছে।

সাক্ষাৎকার শেষে রাজশাহী-৫ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা বলেন, আমরা মনোনয়ন বোর্ডকে আশ্বস্ত করেছি, দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষে কাজ করব। একই কথা বলেছেন রাজশাহী-৬ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী আনোয়ার হোসেন উজ্জল। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম আহ্বায়ক, জেলা যুবদলের আহ্বায়ক ছিলাম। এখন জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক। দল যখন যে দায়িত্ব দেবে তা পালন করব।

জয়পুরহাট-২ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী ওবায়দুর রহমান চন্দন বলেন, দলের স্বার্থে যে কোনো সিদ্ধান্ত আমি মেনে নেব।

নওগাঁ-৪ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী আবদুল মতিন ও সিরাজগঞ্জ ৫-এর আমিরুল ইসলাম খান আলীম ও সিরাজগঞ্জ ৬-এর মোস্তাফিজুর রহমান মনির অভিন্ন সূরে বলেন, আমরা বলেছি, দলের যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত আছি। তবে এলাকার জনগণ চায় তারা যেন ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন।

দিনাজপুর-১ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী বীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বোর্ড সদস্যরা বলেন, মনোনয়ন যে-ই পাক, ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে দলের পক্ষে কাজ করতে হবে।

দিনাজপুর-২ আসনের সাবেক সাংসদ রিয়াজুল হক চৌধুরীর ছেলে আল সাদিক রিয়াজ পিনাক চৌধুরী বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনয়নপ্রত্যাশীদের এমপি হলে কার কী লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, এসব জানতে চেয়েছেন।

পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশের আহ্বায়ক রিটা রহমানও রংপুর-৩ ও নীলফামারী-১ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন চেয়েছেন।

সাক্ষাৎকার দেওয়া অন্তত ২০ মনোনয়নপ্রত্যাশীর সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তারা বলেছেন, সাক্ষাৎকারের শুরুতেই বিএনপির সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বলেছেন, গেল ১২ বছর কোন নেতার কী অবদান, কে কী করছেন, সে খবর দলের কাছে আছে। এর পরই প্রার্থীদের কাছে প্রশ্ন করা হয়, সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি দলের দ্বারা কী ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন? তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশে কীভাবে ছিলেন? নিজে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং মামলা কতটি? এর পর সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হয়, এলাকায় তাদের কার কী অবস্থান। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে ভোটের লড়াইয়ে থাকতে পারবে কিনা? যেসব প্রার্থীর কর্মকা-, নিজ নিজ আসনে অবস্থা ভালো এবং মনোনয়ন পাওয়ার সব যোগ্যতা আছে, তখন ওই প্রার্থীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবেন তো? মনোনয়নপ্রত্যাশী ওই নেতারা বলেন, মূলত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব কথা জানতে চেয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও নির্দেশ দেন তিনি।

বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ডের একজন সদস্য বলেন, এবার ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচন করছে। এ কারণে এটি নিশ্চিত হওয়া দরকার প্রার্থী আগেই মাঠ ছেড়ে দেবেন নাকি শেষ পর্যন্ত বিরূপ পরিস্থিতিতেও থাকবেন, সেটা জানতে চাওয়া হয়। এবার প্রার্থীদের যোগ্যতার ক্ষেত্রে এটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

এক মনোনয়নপ্রত্যাশী বলেন, মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা বলছেন, সম্প্রতি একসঙ্গে বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনের উদাহরণ টানা হয়েছে। তারেক রহমান ও বোর্ডের সদস্যরা তার কাছে জানতে চেয়েছেন, ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত তিনি টিকে থাকতে পারবেন কিনা। যুক্তি হিসেবে নেতারা বলছেন, তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্যে সিলেটে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী আরিফুল হক (মেয়র) ও রাজশাহীর মেয়রপ্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত ছিলেন। এর মধ্যে আরিফুল হক জয় পেয়েছেন। রাজশাহীতে বুলবুল একাই লড়াই করছেন। নেতারা বলছেন, বুলবুলের সঙ্গে স্থানীয় নেতারা মাঠে নামলে সেখানেও বিএনপি বিজয় পেতে পারত।

বিএনপির নেতারা বরিশালে দলটির মেয়রপ্রার্থী মুজিবর রহমান সরোয়ারের সরে দাঁড়ানোর দিকেও ইঙ্গিত করেন। মনোনয়নপ্রত্যাশী আরেক নেতা বলেন, বোর্ড সদস্যরা বলেছেন, এবার একটা ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভোট হচ্ছে। এখানে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে টিকে থাকতে হবে। ভোটের মাঠে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে, যারা নিজ নিজ এলাকায় বিরূপ পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে ভোটের মাঠে থাকতে পারবেন, ভোটারদের সঙ্গে থাকতে পারবেন, তাদেরই মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তিনি আরও বলেন, প্রার্থীদের নার্ভ কতটা শক্ত, প্রার্থীর জন্য স্থানীয় নেতাকর্মীরা কতটা ত্যাগ শিকার করতে পারবেন সেটা দেখা হচ্ছে।

আমাদের সময়

উপরে