বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ | ৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

ডেঙ্গুজ্বর: তথ্য ও পথ্য

প্রকাশের সময়: ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ - শনিবার | জুন ২৯, ২০১৯

 

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

মে থেকে অক্টোবর মাস বিশেষ করে বর্ষাকালে থাকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব, শীতের আগমনের আগ পর্যন্ত চলতেই থাকবে। কিন্তু এ বছরের শুরু থেকেই বেড়ে চলেছে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ, কারণ মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টিতে জমে থাকা পানি ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশার প্রধান প্রজননক্ষেত্র। ফলে মশার বংশবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। যেহেতু বর্তমান মৌসুমটি ডেঙ্গুজ্বরের আর মশার প্রকোপ এবং তার বংশবৃদ্ধি কমানো যায়নি, তাই যে কেউ এই সময়ে জ্বরে আক্রান্ত হলে ডেঙ্গুজ্বরের কথা মাথায় রাখতে হবে। সাধারণ জ্বর মনে করে অবহেলা না করে, ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ অহেতুক অবহেলার কারণে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশ কিছু রোগীর মৃত্যুর ঘটনা জনগণকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। যদিও গত কয়েক বছরে ডেঙ্গু নিয়ে অযথা আতঙ্ক ও ভুলভ্রান্তি অনেকটাই কমে এসেছে, তারপরও রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন।

এই শতাব্দীর শুরুতে ২০০০ সালে ডেঙ্গুজ্বর বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ হয়ে পড়ে আতঙ্কগ্রস্ত। রোগাক্রান্ত ব্যক্তি এবং পরিবার পরিজন অনেকেই হয়ে পড়েন দিশেহারা। শতশত রোগী রক্ত এবং প্লাটিলেট জোগাড় করতে গিয়ে বড় ব্লাড ব্যাংকগুলো রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল। আর রক্ত বা প্লাটিলেট সংগ্রহ করার জন্য লোকজনও হয়ে উঠেছিল মরিয়া। এ সময়টাতে চিকিত্সকদের অভিজ্ঞতাও ছিল সীমিত। ফলে পুরো জাতিই দিগ্বিদিশূন্য এবং ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। মিডিয়াতেও এর ব্যাপক প্রচার পায়। তবে বর্তমানে মানুষের ঐ ভীতি ও আতংক কেটে গেছে। ডাক্তাররা যথেষ্ট অভিজ্ঞ এবং দক্ষ। জনগণও এর প্রতিকার ও প্রতিরোধে যথেষ্ট সচেতন।

ডেঙ্গুজ্বরের উত্পত্তি ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা, সাধারণত এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে এই ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে। তবে কিছ কিছু ক্ষেত্রে এডিস অ্যালবপটিকাস নামক মশার কামড়েও এই রোগ ছড়াতে পারে। ডেঙ্গুজ্বরের জীবানুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি ৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোন জীবানু বিহীন এডিস মশা কামড়ালে, সেই মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবানুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে।

ডেঙ্গুজ্বর কখন ও কাদের বেশি হয়

সাধারণত শহর অঞ্চলে অভিজাত এলাকায়, বড় বড় দালান-কোঠায় এই মশার প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই ডেঙ্গু জ্বরও ঐ এলাকার বাসিন্দাদের বেশি হয়। বস্তিতে বা গ্রামে বসবাসরত লোকজনের ডেঙ্গু একেবারেই হয়না বললেই চলে। ডেঙ্গু ভাইরাস ৪ ধরণের, ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। তাই ডেঙ্গুজ্বরও ৪ বার হতে পারে। যারা একবার ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু হলে তা মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণসমূহ

ডেঙ্গু প্রধানত দুই ধরণের, ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার।

ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর ও সেই সাথে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। জ্বর ১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। শরীরের বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি, মাথা ব্যথা ও চোখের পিছনে তীব্র ব্যথা হয়। এমনকি ব্যথা এত তীব্র হয় মনে হয় হাড় বুঝি ভেঙ্গে যাচ্ছে। তাই এই জ্বরের আরেক নাম “ব্রেক বোন ফিভার”। শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যথার তীব্রতায় শিশুকে স্পর্শ করলেই কেঁদে ওঠে, খিটখিটে মেজাজের হয়। জ্বর হওয়ার ৪ বা ৫ দিনের সময় সারা শরীরজুড়ে লালচে দানা দেখা যায়, যাকে বলা হয় স্কিন র্যাশ, অনেকটা এলার্জি বা ঘামাচির মত। এর সাথে বমি বমি ভাব, এমনকি বমি হতে পারে। রোগী অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করে এবং রুচি কমে যায়। সাধারণত ৪ বা ৫ দিন জ্বর থাকার পর তা এমনিতেই চলে যায় এবং কোনো কোন রোগীর ২ বা ৩ দিন পর আবার জ্বর আসে। একে বাইফেজিক ফিভার বলে।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর

এই অবস্থাটাই সবচেয়ে জটিল, যেখানে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপাশি আরও কিছু সমস্যা হয়, যেমন শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তপাত, চামড়ার নিচে, নাক ও মুখ দিয়ে, মাড়ি ও দাঁত হতে, কফের সাথে, রক্তবমি, পায়খানার সাথে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা, চোখের মধ্যে এবং চোখের বাইরে, মেয়েদের বেলায় সময়ের আগেই মাসিক হওয়া বা মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ইত্যাদি। এমনকি মস্তিষ্ক এবং হার্টেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। ফলে হাইপোভলিউমিক শকে গিয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাছাড়া বুকে পানি এবং শ্বাসকষ্ট, পেটে পানি, লিভার আক্রান্ত হয়ে জন্ডিস, কিডনি আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউর ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম

ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ হলো ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সাথে সার্কুলেটরী ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়। এর লক্ষণ হলো রক্তচাপ হঠাত্ কমে যাওয়া, নাড়ীর স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীন ও দ্রুত হওয়া, শরীরের হাত-পা ও অন্যান্য অংশ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যায়, হঠাত্ রোগী অজ্ঞান হতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

বর্তমানে ডেঙ্গুর ধরণ-

এবারে অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষণের ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। জ্বরের তীব্রতা, তীব্র শরীর ব্যথা এবং র্যাশ পরিলক্ষিত হচ্ছেনা, ফলে রোগীরা সাধারণ জ্বর মনে করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপন করছেন এবং যথাযথ চিকিত্সা নিতে বিলম্ব করছেন। ফলে কিছু বুঝে উঠার আগেই অনেক রোগীর অবস্থার হঠাত্ অবনতি হচ্ছে, কোনো কোনো রোগী হেমোরেজি ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মত মারাত্মক জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। শেষমূহূর্তে সামাল দিতে ডাক্তারদের হিমসিম খেতে হচ্ছে চিকিত্সা করতে। ভোগান্তি বাড়ছে রোগীদের।

কী কী পরীক্ষা করা উচিত

আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গুজ্বর হলে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দরকার নেই, এতে অযথা অর্থের অপচয় হয়। রক্তের প্লাটিলেট কাউন্ট জ্বর শুরুর ৪ বা ৫ দিন পর কমতে শুরু করে, তাই ৪ বা ৫ দিন পর রক্তের সিবিসি এবং প্লাটিলেট পরীক্ষা করা উচিত। এর আগে করলে রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকে এবং অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন। রোগী এমনকি ডাক্তারও মনে করতে পারেন যে রিপোর্ট ভালো আছে, তাই আর কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। আবার অনেকেই দিনে দুই তিনবার এবং একই সাথে একাধিক ল্যাবরেটরি থেকে প্লাটিলেট কাউন্ট করে থাকেন, যা অপ্রয়োজনীয়। প্লাটিলেট কাউন্ট ১ লক্ষের কম হলে, ডেঙ্গু ভাইরারেসর কথা মাথায় রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। পাশাপাশি ১-২ দিনের জ্বরে ডেঙ্গু এনএস-১ এন্টিজেন এবং ৪ থেকে ৬ দিন পর এন্টি ডেঙ্গু এন্টিবডি করা যেতে পারে। এই পরীক্ষাগুলো রোগ সনাক্তকরণে সাহায্য করলেও চিকিত্সায় কোন ভূমিকা রাখে না। এই পরীক্ষাগুলো না করলেও চলে। চিকিত্সক যদি মনে করেন তবে প্রয়োজনে ব্লাড সুগার, লিভারের পরীক্ষা, পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম, বুকের এক্সরে এবং ডিআইসি জাতীয় জটিলতা পরীক্ষা করতে পারেন।

চিকিত্সা পদ্ধতি

ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোন চিকিত্সা নেই। এই জ্বর সাধারণত এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। এমনকি কোনো চিকিত্সা না করালেও। তবে অবশ্যই চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে, যাতে ডেঙ্গুজনিত কোনও জটিলতা না হয়। ডেঙ্গু যেহেতু ভাইরাসজনিত, তাই উপসর্গ অনুযায়ী চিকিত্সা দেয়া হয়। জ্বর হলে শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খেতে হবে, অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ যেমন এস্পিরিন, ডাইক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন কোনোক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে। প্রচুর পানি এবং তরল খেতে হবে। খেতে না পারলে অন্য কোনো প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন বা গ্লুকোজ ইত্যাদি দেয়া যেতে পারে। কিছু কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অতিসত্বর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। যেমন প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে, শরীরের যেকোন অংশ থেকে রক্তপাত হলে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে, জন্ডিস দেখা দিলে, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে, প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে। এসব ক্ষেত্রে অবহেলা না করে অবশ্যই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে কোনো মশা কামড়াতে না পারে। কারণ আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশা অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তারও ডেঙ্গুজ্বর হতে পারে, এভাবেই ডেঙ্গু অন্যদের মাঝে ছড়ায়।

 

 

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ

লেখক :সাবেক ডিন ও চেয়ারম্যান

মেডিসিন অনুষদ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

উপরে