মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৯ | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে চেয়েছিলেন জিয়া

প্রকাশের সময়: ৪:৫৯ অপরাহ্ণ - শনিবার | আগস্ট ১০, ২০১৯

গোপন নথি প্রকাশ

currentnews

নিজ দেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে চেয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়া ! অতি সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত বেশ কিছু গোপন নথি অবমুক্ত করা হয়েছে যাতে দেখা যায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, সংক্ষেপে সিএমএলএ জিয়ার এই অনুরোধের কথা যথারীতি ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এডওয়ার্ড ই মাস্টার্স। পাশাপাশি তিনি সেই সময়কার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার না করারও সুপারিশ করেছিলেন। ১৯৭৭ সালের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক গোপন নথিতে এই তথ্য রয়েছে যা বাংলাদেশ সময় গত শুক্রবার ভোররাতে অবমুক্ত করা হয়েছে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালের সেই গোপন নথিগুলো ঘেঁটে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে বাংলাদেশ নিয়ে ৩৯টি নথি আছে। তবে বেশ কয়েকটি নথির কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়নি।

জিয়ার শাসনামলের শেষ দুই বছর অর্থাৎ ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালের কূটনৈতিক নথিগুলোতে ইরান ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে টানাপড়েনের স্পষ্ট ছাপ দেখা গেছে। যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জিয়াউর রহমান জোরালো সম্পর্ক গড়তে চেয়েছিলেন, সেই যুক্তরাষ্ট্রই নিরাপত্তা পরিষদে ভোটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে খাদ্য সহায়তা দিতে চায়নি। এমনকি নিরাপত্তা পরিষদের সেই ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনা বারবার বাতিল হয়েছে। অনেক অনুরোধের পর ১৯৮০ সালের আগস্ট মাসে কার্টারের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ পান জিয়াউর রহমান। প্রথমে ২৫ মিনিট একান্ত বৈঠকের পর দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন তাঁরা। সেখানে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী গড়তে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চান। ১৯৮০ সালের ২৭ আগস্ট ওয়াশিংটনের সেই বৈঠক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক নথিতে উল্লেখ আছে, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়া বলেছেন, তিনি একটি বিষয় তুলতে চান এবং তা আমাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) বিবেচনার জন্য ছেড়ে দিতে চান। বাংলাদেশের প্রয়োজন উপযুক্ত প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলা। তিনি এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিষয়ে অবগত, তবু প্রয়োজন মনে করেই বিষয়টি তুলছেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর বাংলাদেশকে একেবারে শূন্য থেকে তার সশস্ত্র বাহিনী গড়তে হয়েছিল। বাংলাদেশের উন্নত অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, তবে বিমানবাহিনীর জন্য কিছু রাডার ও এয়ারক্রাফট এবং নৌবাহিনীর কিছু মিসাইল বোটের মতো কিছু জিনিস প্রয়োজন।’

জিয়াউর রহমানের বক্তব্যের পরের কিছু অংশ যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ করেনি। সেই বৈঠকেই জিয়াউর রহমানকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. ইজবিনেভ ব্রেজেনিস্কি প্রশ্ন করেছিলেন, বাংলাদেশের জন্য কারা হুমকি? যুক্তরাষ্ট্রের নথিতে উল্লেখ আছে, ‘জবাবে জিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত এমনকি বার্মার (বর্তমানে মিয়ানমার) নাম উল্লেখ করেন। তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কমিউনিস্ট প্রভাব ও বার্মিজ বিদ্রোহী সমস্যার কথাও উল্লেখ করেন।’

সেনাবাহিনী ছিল জিয়ার ক্ষমতার ভিত্তি: ১৯৭৭ সালের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি আথারটন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ফিলিপ হাবিবকে ‘ব্রিফিং মেমোরান্ডাম’ পাঠান। সেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাডওয়ার্ড ই মাস্টার্সের দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসূচি নিয়ে সুপারিশগুলো স্থান পেয়েছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে সেখানে বলা হয়েছে, জেনারেল জিয়ায় অভিভূত রাষ্ট্রদূত মাস্টার্স। জিয়ার মধ্যে কারিশমা নেই। কিন্তু তিনি বিচক্ষণ, কর্মঠ, দুর্নীতিতে জড়াননি এবং নিবেদিত দেশপ্রেমিক। তাঁর নীতি, বিবৃতি ও কাজকর্ম সঠিক। কিন্তু দৃশ্যত বাংলাদেশের সব কিছুতে সরকারের নিম্ন পর্যায়ে এমনটি কম আছে। ওই লিখিত ব্রিফিংয়ে আরো ছিল, ‘জিয়ার ক্ষমতার ভিত্তি হলো সেনাবাহিনী। পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ না হলেও এটি এখনো দেশে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি। জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি সেনাবাহিনীতে বড় সমর্থন আছে। তবে ক্ষমতার আরো প্রতিযোগী আছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি না হলে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে।’ ওই ব্রিফিং স্মারকে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি আথারটন আরো লিখেছিলেন, ‘জিয়া কত দিন ক্ষমতায় থাকবেন বা তাঁর সরকার কতটা দমনমূলক হতে পারে সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যের ভঙ্গুরতার প্রেক্ষাপটে তাঁকে বা অন্য কোনো একক ব্যক্তির প্রতি আমাদের অঙ্গীকার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।’

তিনি আরো লিখেছিলেন, ‘জিয়ার কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী করার পথে উল্লেখযোগ্য কোনো বিরোধিতা নেই। বেশির ভাগ মানুষ বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের চেয়ে বরং পর্যাপ্ত খাবার, চাকরি ও পণ্যমূল্যের স্থিতিশীলতার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী। জিয়া কী করতে পারেন তা দেখানোর জন্য সম্ভবত কয়েক বছর সময় পাবেন। এ সময়ের মধ্যে তাঁকে হয়তো নিম্নোক্ত দুটির একটি করতে হবে—হয় নিজের শাসন বৈধ করতে হবে অথবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণের কাছে জবাবদিহিপূর্ণ সরকারে ফিরে যেতে হবে; নয়তো সম্ভাব্য বিরোধিতার মুখে ক্ষমতা ধরে রাখতে আরো দমনপীড়ন চালাতে হবে।’ জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সেখানে বলা হয়েছে, ‘পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জিয়া রক্ষণশীল। তিনি কমিউনিস্টপন্থী নন, তবে বাস্তববাদী। তিনি সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক চান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দিকে আদর্শিকভাবে ঝুঁকে আছেন। জিয়া চান, আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) যেন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিই। মাস্টার্স (তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত) জোর দিয়ে বলেছেন, ‘এসব বিষয়ে আমাদের খুব কাছে টানার চেষ্টা কেবল ব্যর্থই হবে না বরং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থনৈতিক সহযোগিতার যে ভিত্তি তাকেও বিপন্ন করবে। তিনি (মাস্টার্স) বিশ্বাস করেন, জিয়া এগুলো বোঝেন এবং তিনি (জিয়া) সম্প্রতি তাঁর চীন সফরের সাফল্যের পর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিস্তারের বিকল্পগুলো ব্যাখ্যা করেছেন।’

বাংলাদেশে অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারের সুস্পষ্ট লক্ষণ থাকার কথাও ওই মার্কিন বার্তায় উল্লেখ রয়েছে। ভালো আবহাওয়ায় রেকর্ড পরিমাণ ফলন হওয়ার সুযোগে সরকার মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা, রপ্তানিতে উৎসাহ, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি ব্যবসার সুযোগ বিস্তৃত করছিল। ব্রিফিং স্মারকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি বাঁচতে চায় তবে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম আরো অনেক জোরদার করতে হবে। বছরে লোকসংখ্যা বাড়ছে ৩ শতাংশ হারে। অন্যদিকে কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির হার মাত্র ১ শতাংশ। রাষ্ট্রদূত মাস্টার্স বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি লক্ষ্য নির্ধারণের সুপারিশ করেছিলেন। এর একটি হলো বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সম্ভাব্য সব কিছু করা, যাতে তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যটি হলো দরিদ্রতম ব্যক্তিদের মানবিক সহায়তা প্রদান করা। এগুলো ছাড়া বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ নেই বলে জানিয়েছিলেন রাষ্ট্রদূত। ওই বার্তাতেই বাংলাদেশের সঙ্গে হ্রাসকৃত দামে সামরিক কর্মসূচি না নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাষ্ট্রদূত মাস্টার্সের সুপারিশের কথা উল্লেখ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যবহারের অতিরিক্ত যেসব নন-কমব্যাট সরঞ্জাম দক্ষিণ এশিয়ায় বিক্রি করছে সেগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুমতি সাপেক্ষে বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করার পক্ষে মত দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স অ্যাটাশে অফিস খোলার সুপারিশ করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারকে খাদ্য কেনা কর্মসূচিতে উৎসাহিত করতে ‘পিএল ৪৮০’ আলোচনার নির্দেশনা দিতেও মাস্টার্স মার্কিন প্রশাসনকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

জিয়ার পাঁচ বছরের মেয়াদ কবে শুরু, প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের: বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের ৭৭ শতাংশ ভোট পাওয়ার তথ্য জানিয়ে ১৯৭৮ সালের ৫ জুন ওয়াশিংটনে তারবার্তা পাঠান ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড টি. স্নাইডার। তিনি লিখেছেন, পাঁচ বছরের জন্য জিয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু সেই পাঁচ বছরের ঘড়ির কাঁটা কখন চলা শুরু হবে তা আমরা জানি না। আর তাঁর এই পদের সাংবিধানিক ভিত্তিও অস্পষ্ট। চিঠিতে তিনি আরো লিখেছেন, রাষ্ট্রপতি ও সংসদের ভূমিকা কী হবে তা নির্ধারণ করা এবং ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়াই হবে জিয়ার মুখ্য কাজ।

জোরালো সম্পর্ক চান জিয়া, রাষ্ট্রদূত জানালেন সীমাবদ্ধতার কথা: রাষ্ট্রদূত ডেভিড টি. স্নাইডার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করার পর আলাপচারিতা নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১৯ জুন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে বার্তা পাঠান। জিয়াউর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রদূত স্নাইডার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে মানবাধিকারসহ সম্ভাব্য কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। স্নাইডার লিখেছেন, ‘আমার ঢাকায় আসার পর থেকেই রাষ্ট্রপতির (জিয়া) আচরণ ছিল এমন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে বিশেষ প্রচেষ্টা চালাতে চান। সম্ভবত ভালো সম্পর্ক গড়া সম্ভব। আমার কথাবার্তায় তিনি সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার বিষয়ে কিছু ধারণা পেয়েছেন। ভবিষ্যতে আমাদের আলোচনায় আরো বিষয় আসবে। আমি রাষ্ট্রপতির কাছে ধরণা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছি না। আমি বিশ্বাস করি ও আশা করতে পারি যে তিনিই সময় সময় আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন।’

জিয়ার সেনানিবাসের বাসায় চার দূতের সস্ত্রীক নৈশভোজ: রাষ্ট্রদূত ডেভিড টি. স্নাইডার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা বলেছিলেন তাঁর (জিয়া) সেনানিবাসের বাসায় এক অনানুষ্ঠানিক নৈশভোজের সময়। তিনি ছাড়াও ব্রিটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনারদের সস্ত্রীক নৈশভোজে ডেকেছিলেন জিয়া। সেখানে জিয়া তাঁদের নির্বাচনপ্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানান। সময় চাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাষ্ট্রদূত স্নাইডারকে জিয়ার সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে জিয়া বলেন, বাংলাদেশ পরিস্থিতি বুঝতে হলে এ দেশের ইতিহাস জানতে হবে। প্রথম পাঁচ বছর ছিল কঠিন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের দিকে ইঙ্গিত করে ১৯৭৮ সালের ১৭ জুন জিয়া বলেন, তাঁরা মাত্র আড়াই বছর ধরে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। সরকার গঠন ও ‘গণতন্ত্রের কাছাকাছি ফিরিয়ে’ আনতে তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন। ফারাক্কা, সীমান্তসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।

বৈঠকে অপারগতা কার্টারের: ১৯৭৮ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কার্টারকে লেখা চিঠিতে ১৯৭৯-৮০ সাল মেয়াদে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতায় সমর্থন চান জিয়া। এ ছাড়া কূটনৈতিক চ্যানেলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কার্টারের সঙ্গে ওয়াশিংটনে বৈঠকের প্রত্যাশা করেন। ১৯৭৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কার্টার এক চিঠিতে জিয়ার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততার কারণে তিনি জিয়াকে বৈঠকের জন্য সময় দিতে অপারগতা জানান এবং আশা করেন, ভবিষ্যতে বৈঠক হতে পারে। ১৯৭৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইরাস ভেন্স বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রফেসর মুহাম্মদ শামসুল হকের সঙ্গে বৈঠকের পর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসকে পাঠানো তারবার্তায় জানান, যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রার্থিতা বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। ১৯৭৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কার্টারকে লেখা অপর এক চিঠিতে জিয়াউর রহমান গঙ্গা অববাহিকা বিষয়ে ভারত সহযোগিতা করছে না উল্লেখ করেন এবং এ বিষয়ে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা চান তিনি।

জিয়া-কার্টার ফোনালাপে ইরান ও আফগানিস্তান ইস্যু: ১৯৭৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ফোনালাপে কার্টার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ-প্রচেষ্টার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কার্টার বলেন, ইরান নিরাপত্তা পরিষদ ও বৈশ্বিক আদালতকে অগ্রাহ্য করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভেন্স আজই নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি তুলবেন এবং ইরান জিম্মিদের ছেড়ে না দিলে জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের ৩৯ ও ৪১তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাবেন। বাংলাদেশ কি এটি সমর্থন করবে? জিয়াউর রহমান জানান, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন সমুন্নত রাখবে। কার্টার সেদিন আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানান। সেদিনই ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র মিশনকে পাঠানো বার্তায় জানায়, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামসুল হক মনে করেন, জিম্মি ইস্যুতে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো এক বার্তায় রাষ্ট্রদূত স্নাইডার বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামসুল হক ও পররাষ্ট্রসচিব কিবরিয়া তাঁকে আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকেছিলেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরান ইস্যুতে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকলেও জিয়াউর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক চান বলে তাঁরা জানিয়েছেন। এর জবাবে রাষ্ট্রদূত স্নাইডার বলেন, বাংলাদেশের অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র সরকার অত্যন্ত হতাশ। নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার কী প্রভাব বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর পড়বে তা নিয়ে তিনি নিজেই বেশ উদ্বিগ্ন।

courtesy : kalerkantho.com

উপরে