রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

টারজানের ভারত অভিযান

প্রকাশের সময়: ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ - শনিবার | আগস্ট ১৭, ২০১৯

 

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

সময়টা ১৯৬২ সাল। তামাটে রঙের একটি মানুষ ভারতে এসে হাতির জীবন রক্ষা করছে। সাহসী পুরুষটির পরনে নেংটির মতো পোশাক। দুর্বল এক ভারতীয় শাসকের আমন্ত্রণে মানুষটি আফ্রিকা থেকে এসে হাতিগুলোকে বাঁচিয়েছে। একটি বাঁধ নির্মাণের কারণে এসব হাতি ফাঁদে পড়ে গিয়েছিল। বাঁধ এগুলোর চলাচলের পথ আটকে দেয়। এগুলোকে যিনি রক্ষা করলেন, তিনি আর কেউ নন, টারজান!

হাতি উদ্ধারের এ অভিযানে টারজানের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল তার কোমর উচ্চতার এক মাহুতের সঙ্গে, সেই ছোট্ট মাহুত গজেন্দ্র হাতিকে চরাত। এ শিশু মাহুতই টারজানকে হাতি উদ্ধারের পথ দেখায়, আর সবশেষে টারজানের বিখ্যাত ‘উউউউউ’ চিত্কার শোনায়।

ছবির টারজান গোজ টু ইন্ডিয়া পরিচালনা করেছেন জন গুইলারমিন। হলিউডের বেশ কয়েকটি আলোচিত অ্যাডভেঞ্চার ছবি দ্য টাওয়ারিং ইনফার্নো (১৯৭৪), কিং কং (১৯৭৬) ও শিনা (১৯৮৪) পরিচালনা করেছেন তিনি।

টারজান গোজ টু ইন্ডিয়ায় টারজানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জক মাহোনে। তিনি ছিলেন টারজান চরিত্রের ত্রয়োদশ অভিনেতা। ১৯৬২ সালে টারজানের ভারত অভিযান শেষ করে পরের বছর জক কাজ করেন আরেকটি টারজান ছবিতে। নাম টারজান’স থ্রি চ্যালেঞ্জেস। এ দুটিতে নায়কের ভূমিকায় কাজ করা ছাড়াও টারজান সিরিজের আরো কিছু ছবিতে খলনায়কসহ বিভিন্ন ভূমিকায় কাজ করেছেন জন।

আমেরিকান ঔপন্যাসিক এডগার রাইস বারোজ ১৯১২ সালে ‘টারজান’ চরিত্রটি সৃষ্টি করেন। আর জক মাহোনে যখন টারজানের ভূমিকায় অভিনয় করেন, তখন তার বয়স ৪৩। কিন্তু জকের উচ্চতা, পেশিবহুল শরীর এবং ভালো ফিটনেস তার বয়সকে টারজানের ভূমিকায় অভিনয়ে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি।

টারজান গোজ টু ইন্ডিয়া নির্মিত ইংরেজি ভাষায়। ছবিতে হলিউডের জকের সঙ্গে ছিল বলিউডের ফিরোজ খান ও সিমি গারেওয়াল। তারা দুজনই তখন ছিলেন ক্যারিয়ারের প্রাথমিক সময়ে। ফিরোজ খান ছবিতে বাঁধ প্রকল্পের একজন চাকুরে ছিলেন, কিন্তু হাতির প্রতি কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠুরতা দেখে তিনি দল ত্যাগ করে টারজানকে সহায়তা করেন।

ফিরোজ খানের ভাই, অভিনেতা ও নির্মাতা সঞ্জয় ছিলেন টারজান গোজ টু ইন্ডিয়ার সহকারী পরিচালক। নিজের আত্মজীবনী দ্য বেস্ট মিসটেকস অব মাই লাইফ গ্রন্থে সঞ্জয় ছবিটির স্মৃতিচারণ করেছেন। সঞ্জয় জানিয়েছেন এ ছবির জন্য ১৭৫টি হাতি ব্যবহার করা হয়েছিল। সঞ্জয়ের দাবি ছবির চূড়ান্ত অ্যাকশন দৃশ্যটি তিনিই ধারণ করেছিলেন। এ দৃশ্যে দেখা যায় হাতির দল গর্জন ছেড়ে বাঁধের লোকজন ও কাঠের অবকাঠামোর ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সঞ্জয় খান নিজেও ছবিতে অল্প সময়ের একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি ছিলেন সেই পাইলটের চরিত্রে, যিনি টারজানকে ভারতে উড়িয়ে এনেছিলেন। রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মুরাদ। রাজার মেয়ে কামারা ভূমিকায় ছিলেন সিমি গারেওয়াল।

ছবিতে একটা কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় ছিল ভিনদেশী নেংটি পরা টারজানকে দেখে ভারতীয় গ্রামবাসী কিংবা বাঁধের শ্রমিকরা কেউই চমকে যাননি। ছবির পর্দার পেছনের গল্প কেউ বলেননি। তাই খুঁটিনাটি অনেক বিষয়ে দর্শক, পর্যবেক্ষকদের কৌতূহল থাকলেও সেগুলো সম্পর্কে জানার উপায় নেই। ছবির শুটিং হয়েছিল তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকের অরণ্যে। শ্রমিক ও গ্রামবাসী হিসেবে মূলত স্থানীয়দেরই ব্যবহার করা হয়েছিল। তারা টারজানকে দেখে কেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল, তা জানার আজ কোনো উপায় নেই।

ছোট্ট মাহুতের নাম ছিল জয়। এর কিছু অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাও ছিল। ছোট বালক হয়েও সে গজেন্দ্র নামের হাতিকে পোষ মানিয়ে ফেলেছিল। জয় ছিল রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ভবঘুরে ধরনের এক বালক। এ জয়ই ছিল পুরো ছবির সবচেয়ে সপ্রতিভ অভিনয়শিল্পী। টারজানকে দেখে তার প্রতিক্রিয়া ছিল তার সত্যিকারের আবেগ।

টারজান গোজ টু ইন্ডিয়া ছবিতে ক্যামেরার সামনে হাতিরাও দারুণ অভিনয় করেছিল! আরো ছিল সাপ ও বেজির লড়াই। হাতির দলের নেতৃত্ব নিয়েছিল গজেন্দ্র ও আরো হাতির মধ্যে সংঘাত। এসব ছাড়াও ছবিতে দেখা গেছে চিতা, বানর ও কৌতূহলী এক পেঁচাকে।

এ ছবি যখন নির্মিত, তখনো প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিয়ে দুনিয়ায় সে রকম সচেতনতা তৈরি হয়নি। তাই বিভিন্ন বিপজ্জনক দৃশ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণীর বদলে সাধারণ পশুকেই ব্যবহার করা হয়েছিল। হাতির আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিংবা টারজানের সঙ্গে চিতার লড়াইয়ের দৃশ্য দেখলে আজকের দিনে অনেকেই আঁতকে উঠবে প্রাণীগুলোর ওপর কী ঝড় গেছে, তা কল্পনা করে! পশুদের সঙ্গে সঙ্গে টারজানকেও অবশ্য তার তত্পরতা দেখাতে হয়েছিল—এক হাতির পিঠ থেকে অন্য হাতির পিঠে লাফিয়ে চলা, গাছে গাছে ঝুলে বেড়ানো ইত্যাদি।

আফ্রিকার অরণ্য থেকে টারজান বেশ কয়েকবারই ভিনদেশে অভিযানে গেছেন। তার এসব গন্তব্যের মধ্যে আছে নিউইয়র্ক, গুয়াতেমালা ও মেক্সিকো। ২০১৬ সালে মুক্তি পেয়েছে দ্য লিজেন্ড অব টারজান, কিন্তু কম্পিউটারে তৈরি গরিলারা টারজান গোজ টু ইন্ডিয়া ছবির সত্যিকার হাতির সামনে নিষ্প্রভ, অনেক সময়ই হাস্যকর। বিশ্বব্যাপী হাতির আবাস ও জীবন ধ্বংসের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬২ সালের টারজান গোজ টু ইন্ডিয়া এখনকার দিনের জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

সূত্র: স্ক্রলইন

উপরে