রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

ব্যথামুক্ত ও নিরাপদে সন্তান প্রসব

প্রকাশের সময়: ১০:০১ পূর্বাহ্ণ - শনিবার | সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯

 

 

 

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

প্রসবকালীন ব্যথা বিশটি হাড়ভাঙা ব্যথার সমান, যা পৃথিবীর কষ্টকর ব্যথাগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রসব ব্যথার সঙ্গে কোনো ব্যথার তুলনা করা যায় না। এ ব্যথা ‘হার্ট অ্যাটাক’-এর ব্যথার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। এ ব্যথার ভয়ে অনেকেই স্বাভাবিক প্রসব এড়িয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাতে চান।

– এটা একটি অপারেশন বিধায় অপারেশনকালীন অথবা অপারেশন-পরবর্তী অনেক জটিলতা ঘটতে পারে। স্বাভাবিক বা ব্যথামুক্ত প্রসবে এটা হয় না।

– সিজার অপারেশনে একজন মায়ের দুই বা তিনের অধিক গর্ভধারণ করা সম্ভব নয়। স্বাভাবিক বা ব্যথামুক্ত প্রসবে এটা সম্ভব।

 – সিজার অপারেশনে ‘ইনসিসনাল হার্নিয়া’ বা তলপেটের ব্যথা বা অন্য জটিলতা হতে পারে। স্বাভাবিক বা ব্যথামুক্ত প্রসবে এটা হয় না।

– সিজার অপারেশনে কাটা জায়গা জঁঢ়ঃঁৎব বা ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্বাভাবিক বা ব্যথামুক্ত প্রসবে এটা হয় না।

– একবার সিজার অপারেশন হলে পরবর্তী স্বাভাবিক প্রসবেও এই দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কাজেই প্রথম থেকে আমাদের উচিত সিজার অপারেশনে না যাওয়া।

– সিজারিয়ান সেকশনে অপারেশন-পরবর্তী হাসপাতালে কয়েকদিন থাকতে হয়। ব্যথামুক্ত প্রসবে সন্তান হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন মা বাসায় চলে যেতে পারেন।

ব্যথামুক্ত নিরাপদ প্রসব

বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগে ব্যথামুক্ত প্রসব কঠিন বিষয় নয়। অস্ত্রোপচার না করেও সহজভাবে ব্যথামুক্ত প্রসব সম্ভব। উন্নত দেশে নিয়মিত ব্যথামুক্ত প্রসব করানো হয়ে থাকে। প্রসবকালীন ব্যথা উন্নত বিশ্বে আজ বেদনাবিধূর এক অতীত অধ্যায়। এ পদ্ধতিতে সাধারণত মেরুদণ্ডে কিছু ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে (যেভাবে ঠিক সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়) প্রসব চলাকালীন মাকে ব্যথামুক্ত রাখা হয়। এতে স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারের মাধ্যমে মনিটরিং করা হয়। এ সময় প্রসবকালীন সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত থেকে মা কথা বলতে পারেন, হালকা খাবার খেতে পারেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন এবং হাসতে হাসতে সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পারেন।

ব্যথামুক্ত নরমাল ডেলিভারির জন্য দরকার একটি অত্যাধুনিক প্রি-ডেলিভারি, ডেলিভারি এবং পোস্ট ডেলিভারি সিস্টেম। এর সঙ্গে থাকা দরকার একটি সিনক্রোনাইজড অভিজ্ঞ লেবার টিম এবং অ্যানেসথেসিয়া টিম। প্রি-ডেলিভারি কক্ষে থাকতে হবে অত্যাধুনিক মনিটরিং সিস্টেম এবং সাপোর্টিভ সব যন্ত্রপাতি যাতে মায়ের বা নবজাতকের কোনো ধরনের সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। গধহঢ়ড়বিৎ-এর দিক থেকে অভিজ্ঞ ধাত্রী, জুনিয়র ডাক্তার এবং স্পেশালিস্ট সার্বক্ষণিকভাবে এই ডেলিভারি কমপ্লেক্সে থাকতে হবে এবং কনসালটেন্টকে বারবার এই গর্ভবতী মাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। এই সিস্টেম রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা অপঃরাব থাকতে হবে। এখানে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়াও যদি কোনো ক্ষেত্রে সিজার করার দরকার হয়ে পড়ে অথবা কোনো জটিলতা দেখা দেয় তবে সঙ্গে সঙ্গে প্রসূতি মাকে অপারেশন করার জন্য অপারেশন থিয়েটার এবং অপারেশন থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত জনবলকেও সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। তাছাড়া নবজাতককে সাপোর্ট দেয়ার জন্য বাচ্চাদের ওয়ার্ড এবং বাচ্চাদের আইসিইউ (এনআইসিইউ) অবশ্যই ভালোভাবে কার্যকরী অবস্থায় থাকতে হবে। সিস্টেমটা জটিল এবং ফবসধহফরহম-এর জন্য দরকার এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার এ ব্যাপারে সময় দেয়ার মানসিকতা এবং পারদর্শিতা থাকতে হবে। বিকল্প ক্ষেত্রে যদি আমরা সিজারে চলে যাই তা হলে আমাদের এই বৃহৎ জনশক্তি এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সামান্যটাই প্রয়োজন পড়ে। তার চেয়ে বড় সুবিধা যে কনসালটেন্টকে সার্বক্ষণিকভাবে রোগীর সঙ্গে লেগে থাকতে হয় না। এ কারণেই বোধ হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেশিরভাগ জায়গায় নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা না করে সরাসরি সিজার অপারেশনে যাওয়ার প্রতি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার একটি প্রবণতা থাকে।

কথা উঠতে পারে আমাদের গ্রামগঞ্জে তো বেশিরভাগ জায়গায় ধাত্রীরাই এই প্রসব পরিচালনা করে থাকেন। সেখানে সমস্যা এই, কোনো জটিলতা হলে তা মায়ের ক্ষতি অথবা বাচ্চার ক্ষতি বা উভয়েরই ক্ষতির পর্যায়ে গড়ায় যা আমাদের মতো সমাজে এবং আমাদের গ্রামাঞ্চলের হাসপাতালে গ্রহণ করা যায় না। সেজন্যই এ বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং এজন্যই এই নরমাল ডেলিভারির প্রতি প্রসূতি মা ছাড়া সবারই অনীহা। আমরা এর সঙ্গে যুক্ত করেছি ব্যথামুক্ত ডেলিভারি। অনেকে বলতে পারেন ব্যথার ওষুধ দেয়ার ফলে কোনো সমস্যা কি হতে পারে? যে সিস্টেমে ওষুধটা দেয়া হয় সেটাকে আমরা বলি এপিডিউরাল অ্যানেসথেসিয়া। এখানে মেরুদণ্ডের ভেতরে ছোট একটি ক্যাথেটার ঢুকিয়ে ব্যথার ওষুধ দেয়া হয়। এইটা আমাদের দেশে সিজার অপারেশনের সময় যে স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া দেয়া হয় তার খুব কাছাকাছি, কিন্তু কিছু বিশেষ প্রশিক্ষণের দরকার হয়। যত ভালোভাবে এপিডিউরাল অ্যানেসথেসিয়া দেয়া যাবে তত এর থেকে উদ্ভূত জটিলতা কম হবে। সত্যি কথা বলতে কী যারা এপিডিউরাল অ্যানেসথেসিয়া দিতে অভিজ্ঞ তাদের ক্ষেত্রে লো-ব্যাক পেইন বা ছোটখাটো দু-একটি সমস্যা ছাড়া জটিল কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।

বিদেশে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় সব প্রসূতি মায়ের ক্ষেত্রে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই ব্যথামুক্ত নরমাল ডেলিভারি করা হয়ে থাকে। সেখানে সিজারের মাত্রা শতকরা ১০ ভাগের নিচে। কিছু কিছু কারণে যা বেশিরভাগই অনভিপ্রেত, আমাদের দেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরের আশপাশে সিজারের সংখ্যা ২৮ শতাংশ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি। অনেক মেয়েরা ডেলিভারির সময় ব্যথা সহ্য করতে চান না, এ ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের দেশে শতকরা ৫০ ভাগ সিজার অপারেশন হয়ে থাকে। বাকি ৫০ ভাগের ক্ষেত্রে হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যা এবং ডাক্তারদের দ্রুত কাজ সারার মন-মানসিকতা দায়ী। ইমপালস হাসপাতাল এসব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে এবং অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে এই ব্যথামুক্ত নরমাল ডেলিভারি সিস্টেম চালু করেছে।

 

লেখক :অধ্যাপক ডা. জাহীর আল-আমীন

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমপাল্স হেলথ সার্ভিসেস অ্যান্ড রিচার্স সেন্টার লি., তেজগাঁও, ঢাকা

উপরে