মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২০ | ৭ই মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

উত্তর বঙ্গের লাল সূর্য

প্রকাশের সময়: ৯:২৮ অপরাহ্ণ - বৃহস্পতিবার | ডিসেম্বর ৫, ২০১৯

প্রয়াত আব্দুল লতিফ মির্জা

একজন রাজনৈতিক  কিংবদন্তী

currentnews

আব্দুল বাতেন হিরু, সিরাজগঞ্জ : যিনি উত্তর বঙ্গের লাল সূর্য হিসেবে খ্যাত, যার ধ্যানে- জ্ঞানে সব সময়ই থাকতো রাজনীতি, মানুষের সংস্পর্শ ছাড়া এক মূহুর্তও কাটাতেন না। বলা হচ্ছে তেমনই এক আপাদমস্তক- কিংবদন্তি রাজনৈতিক নেতার জীবন সম্পর্কে। একদিন এই নেতার এক শুভাকাক্ষী ঢাকায় তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক হাসপাতালে চেকআপ করানোর জন্য।

সেই শুভাকাক্ষীকে জিজ্ঞাসা করলেন নেতা, কত ট্যাকা লাগবেরে। শুভাকাক্ষী জবাব দিল ৩০ হাজার টাকা, তবে আপনাকে দিতে হবে না, আমি সম্পূর্ন এ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে দেব, আপনি শুধু চেকআপে সহযোগীতা করুন। উক্ত নেতা বললেন শুভাকাক্ষীকে ঐ ৩০ হাজার টাকা আমাকে দাও, আমি তাও কয়েকটা জনসভা করতে পারবো। এই বলে সেখান থেকে চলে আসলেন নেতা। মৃত্যুর কয়েক মাস আগের এ ঘটনা। মারা গেলেন ২০০৭ সালের ৫ ই নভেম্বর। নেতাটি আর কেও নন।

যিনি বাপের রেখে যাওয়া জমি বিক্রি করে সেই টাকা রাজনীতির পিছনে ব্যয় করতেন। সেই নেতার নাম আব্দুল লতিফ মির্জা। যাকে এক সময়ে বলা হতো উত্তরবঙ্গের লাল সূর্য। ১৯৭২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাকে সম্বোধন করতো সিরাজগঞ্জ জেলার জাসদের নেতা- কর্মীরা। এক সময়ের আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রগামী সেনাপতি ছিলেন আব্দুল লতিফ মির্জা। সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রাম গঞ্জে সর্বশ্রেনীর মানুষের অন্তরে স্হান দখল করে নিয়েছিলেন। সবার প্রিয় নেতা ছিলেন, ভালবাসার মানুষ ছিলেন। আপদে বিপদে পাশে দাঁড়ানো একজন দরদী মানুষ ছিলেন। নিজের বাবা- ভাইয়ের ও নিজের অংশের জমি বিক্রি করে সেই টাকা রাজনীতিতে, মানুষের কল্যানে খরচ করার উধাহরন আর মিলবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। একমাত্র আব্দুল লতিফ মির্জার তুলনা সে নিজেই। মুক্তিযুদ্ধেও নেতৃত্ব দিয়েছেন পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জে পাক সেনাদের সঙ্গে প্রথম সন্মুখ যুদ্ধ উল্লাপাড়া ঘাটিনা রেল ব্রীজে। ১৯৭১ সালের ২৪ শে এপ্রিল সেই প্রথম যুদ্ধ অল্প সংখ্যক যোদ্ধা নিয়েও জয় দিয়ে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সফল অগ্রযাত্রা। সে দিন পরাস্ত হয়েছিল পাক সেনারা। নিহত হয়েছিল বেশ কয়েক জন পাক সেনা। পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল পাক সেনারা।

ট্রেন নিয়ে এসেছিল সেই ট্রেনেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এর পর নওগাঁ যুদ্ধে বিশাল সাফল্য ছিল আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের মুক্তিযোদ্ধাদের। ( যার বর্ননা ধারাবাহিকভাবে বিগত দিনের পোষ্টে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।) উল্লাপাড়া উপজেলার লাহিড়ী মোহনপুরের চলনবিল অধ্যুষিত পূর্ব বংকিরাট গ্রামের ১৯৪৭ সালের ২৫ শে জুন আব্দুল লতিফ মির্জার জন্ম। এই গ্রামের এক সম্ভান্ত সমাজ সেবক বাজিতুল্লাহ্’র পুত্র ছিলেন মেনহাজ উদ্দিন আহমেদ ও পুত্র বধু ছিলেন লতিফা বেগম। এদেরই পুত্র ছিলেন আব্দুল লতিফ মির্জা ও আব্দুল লায়েক মির্জা। তৎকালীন বৃটিশ আমলে মেনহাজ উদ্দিন আহমেদ আশপাশ এলাকার মধ্যে প্রথম বি এ পাশ। সেই সময়ে দুর দুরান্ত থেকে দলে দলে নারী- পুরুষ এসেছিল এক নজরে দেখার জন্য। কলিকাতা রাইটার্স বিল্ডিংয়ে তৎকালীন বড় লাটের এ্যাকাউন্ট বিভাগে চাকরি নিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগ মুহুর্তে চাকরিতে তার অবদান ও কৃতিত্বের নিদর্শন স্বরূপ মেনহাজ উদ্দিন আহমেদ কে মির্জা উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন সরকার।

সেই থেকে এই পরিবারের সদস্য- সদস্যরা নামের পূর্বে মির্জা শব্দটি ব্যবহার করে আসছেন। মির্জা মেনহাজ উদ্দিন তার বাবার রেখে যাওয়া পূর্ব বংকিরাট ও তার আশ পাশ এলাকায় প্রায় ৭০/৮০ বিঘা জমি ও গ্রামের প্রায় দু’ বিঘা সম্পত্তির উপরে বাড়ি রেখে গেছেন। বাড়ি ও জমি গুলোর অধিকাংশ মির্জা মেনহাজ উদ্দিন আহমেদ এর নামে স্হানান্তরিত করা ছিল। পরবর্তিতে মির্জা মেনহাজ উদ্দিন আহমেদ তার নামীয় জমি থেকে দু’ছেলে আব্দুল লতিফ মির্জা ও আব্দুল লায়েক মির্জার প্রতি জনের নামে ২৫ বিঘা করে জমি লিখে দিয়েছিলেন। বাড়ির অংশটুকু মির্জা মেনহাজ উদ্দিন আহমেদের নামেই রয়ে গেছে।

দিলপাশারে একটি জলা রয়েছে সেখান থেকেও ভালই আয় হয় তাদের। এছাড়াও বাইরে চাকরি করে মির্জা মেনহাজ উদ্দিন আহমেদ তাড়াশ থানার পেঙ্গুয়ারি গ্রামে প্রায় ৯০ বিঘা ও বোনের গ্রাম কালুপাড়াতে ৭৫ থেকে ৮০ বিঘা জমি কিনেছিলেন বোন জামাইয়ের সহযোগীতায়। মির্জা মেনহাজ উদ্দিন আহমেদের প্রথম পক্ষে আব্দুল লতিফ মির্জা ও আব্দুল লায়েক মির্জা ছাড়াও তিন কন্যা মনোয়ারা মির্জা, মিনা মির্জা ও মনি মির্জা। এর মধ্যে মনোয়ারা মির্জা বিয়ের আগেই মারা যায়। মিনা মির্জার বিয়ে হয়েছে শাহজাদপুর উপজেলার চর নবীপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের সাথে। তারা এখন পাবনাতে বসবাস করছেন।

অপর মেয়ে মনি মির্জার বিয়ে হয়েছে ভাঙ্গুরা উপজেলার মাদারবাড়িয়া গ্রামের মোজাম্মেল হকের সাথে। আব্দুল লতিফ মির্জার ও আব্দুল লায়েক মির্জার মা লতিফা বেগম মারা যাবার পর মির্জা মেনহাজ মির্জা শাহজাদপুরে আর একটি বিয়ে করেছিলেন। সেই স্ত্রী’র গর্ভে তিন মেয়ে জন্ম নিয়েছিলো। ১, মোস্তারিন মির্জা উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্নিমাগাঁতী ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গয়হাট্টা গ্রামে বিয়ে হয়। ২, রুবিনা মির্জার বিয়ে হয়েছে পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামের মরহুম আব্দুল বারী সরকারের একমাত্র ছেলে এ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম ঠান্ডুর সাথে। উল্লাপাড়া পৌর শহরে এ, বি মার্কেটের মালিক এ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম ঠান্ডু মারা গেছে। ৩, রীনা মির্জা, তার বিয়ে হয়েছে। মরহুম আব্দুল লতিফ মির্জার স্ত্রী হোসনেয়ারা বেগম ( হাসী মির্জা), তাদের মেয়ে সেলিনা মির্জা ( মুক্তি মির্জা) ব্যাংকে চাকরি ও উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামীলীগের আহবায়ক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক, মুক্তি মির্জার বিয়ে হয়েছে উল্লাপাড়া পৌর এলাকার নেওয়ারগাছা পল্লীবাস এর একরামুল হক কোমলের ছোট ভাই এনামুল হকের সাথে। তাদের তিন কন্যা সন্তান। ছেলে শক্তি মির্জা, লাহিড়ী মোহনপুর ইউনিয়নের পরপর দু’ বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিল, তার মৃত্যু হয়েছে।

আব্দুল লায়েক মির্জা ছিলেন আব্দুল লতিফ মির্জার রাজনীতির চালিকা শক্তি। এমন ভাই সচরাচর কারো ভাগ্যে মেলে না। কালে ভদ্রে এ রকম ভাই কারো ভাগ্যে মেলেছে কিনা দুরবিন দিয়ে খুজতে হবে। অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সদালাপি। অতি সহজেই পরকেও আপন করে নেয়ার যেন আধ্যাত্বিক শক্তি ছিল তার মধ্যে। ২০০৩ সালে স্ট্রোক করে আব্দুল লায়েক মির্জা মারা যান। তার স্ত্রী খুরশিদা মির্জা সম্পর্কে মরহুম আব্দুল লতিফ মির্জার আপন শ্যালিকা। সেই হিসেবে দু’ ভাই ভায়রা ভাই ছিলেন। খুরশিদা মির্জা দীর্ঘ সময়ে সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহিলা পরিচালক ছিলেন। মূলতঃ তিনি একজন শিক্ষিকা। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে, ছেলে তুহিন মির্জা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একজন কর্মকর্তা ও মেয়ে তারিন মির্জা শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত।

 

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া

উপরে