শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০ | ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

যেখানে নারীর দুধে বেড়ে ওঠে হরিণ শাবক

প্রকাশের সময়: ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ - শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ৪, ২০২০

currentnews

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহেশ’ গল্পের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। মহেশ নামক গরুটি গফুরের পালক পুত্রের মতোই পালিত হয়েছিল। মহেশের প্রতি গফুরের যে দরদ ছিল, তা আমাদের মনে নিবিড়ভাবে যেকোনো প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি করে।

‘মহেশ’ গল্প ছিল বটে কিন্তু বাস্তবে এমন প্রাণীপ্রেমের নিদর্শন দেখা যায় ভারতের রাজস্থানে বিষ্ণৈ উপজাতির মাঝে। তাদের মধ্যে মানুষ ছাড়াও সমগ্র প্রাণীকূলের জন্য রয়েছে মানবপ্রেমের রীতি।

সেখানকার মিথ অনুসারে, রাজস্থানের যোধপুরে বসবাসকারী বিষ্ণৈ উপজাতিকে দেবতা জাম্বেশরের ২৯টি নির্দেশ মেনে চলতে হয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরিণ শাবককে নিজ সন্তানের মতো বুকের দুধে প্রতিপালন করা। আর এজন্য সম্প্রদায়ের নারীরা হরিণ শাবককে বুকের দুধ পান করিয়ে পালন করে থাকেন।

সেই যোধপুরেই হরিণ হত্যার দায়ে বলিউড স্টার সালমান খানকে জেলে যেতে হয়েছিল। সালমান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল- তিনি ১৯৯৮ সালের ১ ও ২ অক্টোবর রাজস্থানের যোধপুরের কাছে কানকানি গ্রামে দুটি বিরল প্রজাতির হরিণ শিকার করেছেন। ভারতের একটি আদালত ২০১৮ সালে দুটি কৃষ্ণসার প্রজাতির হরিণ হত্যার দায়ে পাঁচ বছরের জেল এবং একই সঙ্গে তাকে দশ হাজার রুপি জরিমানা করেছিল।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ভারতীয় সংস্কৃতি। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবন ধারার মধ্যে আছে অসংখ্য বৈচিত্র্য। এমনই একটি বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায় দেশটির বিষ্ণৈ ধর্ম সম্প্রদায়। রাজস্থানের যোধপুরে তাদের বাস। এই সম্প্রদায়ের নারীরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে নিজের বাচ্চার পাশাপাশি অনাথ কিংবা আহত হরিণশিশুকে বুকের দুধ পান করান।

টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষ্ণৈ গৃহবধূ মাঙ্গি দেবী বলেন, ‘এসব হরিণশিশু আমাদের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ওরা আমাদের সন্তানের মতোই। আর এজন্য আমাদের নিজ সন্তানের সঙ্গে স্তন্যদান করি এবং আমাদের কোলে তারা সন্তানের মতোই বেড়ে উঠে। আহত, অসহায় হরিণ শাবক দেখে আমাদের মন কেঁদে উঠে। দলছুট শাবককে নিজের কাছেই রেখে দেই আমরা। এরপর সন্তান স্নেহে লালনপালন করি।

আরেক গৃহবধূ রোশিনি বিষ্ণৈ বলেন, ‘আমাদের কাছে হরিণ শাবকরা অনাথ নয়। ওরা আমাদের চারপাশে আমাদের সন্তানের মতোই থাকে, সন্তানের মতোই বেড়ে উঠে। আমার মতো অনেক মা আছে ওদের, যারা ওদের বুকের দুধ পান করিয়ে থাকেন।’

বিষ্ণৈদের ধর্মীয় মিথ অনুসারে ‘প্রকৃতিকে তারা দেবজ্ঞানে পূজা করেন। আর সেই প্রকৃতির সন্তান হলো হরিণ শিশুরা। ভীত, সন্ত্রস্ত হরিণ শিশুদের তাই পরম মমতায় মাঝে মধ্যেই কোলে তুলে নিতে দেখা যায় বিষ্ণৈ মায়েদের। প্রকৃতি রক্ষাকে এবং প্রকৃতির সন্তানদের বিশেষ করে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের প্রতিপালনকে নিজেদের ধর্মীয় কাজের একটি অংশ হিসেবে মনে করেন তারা। আর এ কারণে হরিণসহ অন্য প্রাণীদেরও তারা দেখে থাকেন স্নেহের পাত্র হিসেবে।

জানা যায়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৫ শ’ বা সাড়ে ৫ শ’ বছর ধরে বাস করে আসছেন বিষ্ণৈ সম্প্রদায়ের মানুষজন। বন-জঙ্গল এবং মরুময় এলাকায় বাস করতেন তারা। পরে রাজস্থানে যোধপুরে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন শুরু করেন। বর্তমানে তারা প্রায় ২০০০ পরিবারের একটি সম্প্রদায়। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর সঙ্গে খেলাধুলা করে বড় হয় বিষ্ণৈ শিশুরা। তাদের পূজনীয় দেবতা বা গুরু জাম্বেশ্বরের মতে, সব সৃষ্টির মধ্যেই স্বর্গীয় শক্তি বিদ্যমান।

শুধু তাই নয়, কেউ যাতে প্রকৃতির সন্তানদের হত্যা করতে না পারেন এজন্য প্রাণীহত্যা বন্ধে বিষ্ণৈদের আছে বিশেষ একটি বাহিনী। এর নাম ‘বিষ্ণৈ টাইগার ফোর্স।’ রোশিনি বিষ্ণৈ তার সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি ওই ছোট ছোট হরিণগুলোর সঙ্গেই বেড়ে উঠেছি। ওরা আমার ভাইবোনের মতো। ওদের সুস্থ থাকতে সাহায্য করা আমাদের পারিবারিক দায়িত্ব। আমরা ওদের সঙ্গে খেলাধুলা করি। ওরা আমাদের ভাষাও বোঝে। আমাদের পরিবারের অন্য সদস্যের মতোই ওদের সুস্থ ও নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

ভারতীয় মিথ হতে জানা যায়, সব পশুরা বিষ্ণৈ সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সন্তানসম। নিজের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে এদের কোনো পার্থক্য করেন না তারা। এরা সেই সম্প্রদায়, যারা খেজুর গাছ বাঁচাতে ১৭৩০ সালে রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে বলিদান দিয়েছিলেন ৩৬৩টি তাজা প্রাণ।

উপরে