শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০ | ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

সবাই স্মার্টকার্ড কবে পাবে?

প্রকাশের সময়: ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ - সোমবার | সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

currentnews

নাগরিকদের উন্নতমানের আধুনিক জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্টকার্ড) দিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিস’ (আইডিইএ) প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ দফায় দফায় আরও চার বছর বাড়ানো হয়। এখন পর্যন্ত অর্ধেক ভোটারও স্মার্টকার্ড পাননি। প্রকল্পের শম্বুকগতির কারণে মাঝে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদের (আগামী ডিসেম্বর) মধ্যেও সব ভোটারের হাতে স্মার্টকার্ড পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কবে নাগাদ দেশের সব নাগরিক স্মার্টকার্ড পাবে তা কেউই বলতে পারছেন না।

সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) আইডিইএ প্রকল্পের অর্থব্যয় ও মান নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেছে- প্রকল্পের সময় বৃদ্ধির ফলে এ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত সময় ব্যয় ও ১৩৬ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। সর্বশেষ নির্ধারিত মেয়াদে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় এ ব্যয় আরও বাড়বে। সরবরাহ করা প্রচুর কার্ডে তথ্যের অনেক ভুল এবং ছবির মানও ভালো নয়। আইএমইডি প্রকল্পের অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে দেখছে সাইবার নিরাপত্তা। আইসিটি অবকাঠামোর ওপর প্রচ-ভাবে নির্ভরশীল একটি পদ্ধতির জন্য সাইবার নিরাপত্তা সব সময় দরকার। এনআইডিডব্লিউর বিভিন্ন নেটওয়ার্কের যে কোনো সময় যে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সার্ভারে ১১ কোটির বেশি জনগণের তথ্য সংরক্ষণ একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার হতে পারে। সরকারের কাছে সংরক্ষিত তথ্য অন্য কোনো তৃতীয়পক্ষের কাছে চলে গেলে বিরাট ঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে। প্রকল্পের কোনো ‘এক্সিট প্লান’ নেই। তা ছাড়া কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীও স্মার্টকার্ড পেয়েছে।

এনআইডি ডেটাবেজ সার্ভারে চলতি বছরের ২ মার্চ পর্যন্ত নিবন্ধিত মোট নাগরিক সংখ্যা ১১ কোটি ২১ লাখ ৬৯ হাজার ৮১৮ জন। এর মধ্যে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৯৮ লাখ ১৮ হাজার ৮১৭ জন। অবশিষ্ট ২৩ লাখ ৫১ হাজার ১ জন ভোটার তালিকায় এখনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আইডিইএ প্রকল্প ও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগে মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, স্মার্টকার্ড আগে বিদেশ থেকে আসত। এখন আমরা নিজেরাই উৎপাদন করছি। প্রতিমাসে ২৫ থেকে ৩০ লাখ উৎপাদন করছি। এর জন্য অর্থের প্রয়োজন। আগে বিশ্বব্যাংক দিত, এখন জিওবি (সরকার) থেকে নিচ্ছি। এ টাকা ধরা আছে নতুন প্রকল্পে, নতুন প্রকল্প কাল পাস হলে পরশু থেকে ফুল স্পিডে উৎপাদন শুরু হবে। প্রকল্প পাস হলে ২০২১ সালের মধ্যে আমরা আমাদের চাহিদা পূরণ করতে পারব। তিনি আরও বলেন, উৎপাদন চলছে তবে করোনা ভাইরাসের কারণে গতি একটু ধীর। এখন আমরা ক্লায়েন্ট অ্যাপয়েনমেন্ট সফটওয়্যার করেছি। এটি উপজেলা অফিসে অ্যাকটিভ করে দেব। এতে প্রতিদিন ৩০/৪০ জনকে স্মার্টকার্ড দিতে পারব। আগের মতো বিতরণে যেতে আরও একটু সময় লাগবে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ সময়ের মধ্যে তো শতভাগ বিতরণ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কেন হলো না সেটা সঠিক বলতে পারব না। তিনি আরও বলেন, শুনেছি যে কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি ছিল, তাদের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক চলে গেছে। তাদের ইন্টারনাল সমস্যা থাকতে পারে। সেগুলো ম্যানেজ করতে পারেনি বলেই সময়মতো কাজ শেষ হয়নি।

বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি- ইউএনডিপির সহায়তায় ২০১১ সালের জুলাইয়ে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিস’ (আইডিইএ) প্রকল্পের আওতায় ৯ কোটি নাগরিককে স্মার্টকার্ড দেওয়ার চুক্তি হয়। চুক্তি মোতাবেক প্রকল্পের জন্য সরকার দেবে ১৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। বাকি অর্থ সহায়তা করার কথা বিশ্বব্যাংকের। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তির শর্তগুলো পূরণ করতে না পারায় প্রকল্প শুরু করতেই প্রায় ৩০ মাস বা আড়াই বছর সময় লেগে যায়। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালের জুন মাসে। সময়মতো কাজ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিশ্বব্যাংক আর চুক্তির মেয়াদ বাড়ায়নি। ফ্রান্সের ওবারথার কোম্পানির সঙ্গেও চুক্তি বাতিল করা হয়। পরে সরকারি অর্থায়নে কয়েক দফা প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয়, যা শেষ হবে আগামী ডিসেম্বরে। এ পর্যন্ত পাঁচবার প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি শেষে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা।

আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আইডিইএ প্রকল্পের মূল কাজ- স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র প্রস্তুত এবং নাগরিকদের কাছে বিতরণ করা। যা এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। কার্ড প্রস্তুতের জন্য চুক্তিবদ্ধ ফরাসি ঠিকাদার কোম্পানি ওবারথার টেকনোলজিস চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত মেয়াদে কাজ সম্পাদন করতে না পারায় বিশ্বব্যাংকের সম্মতি ও নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনক্রমে তাদের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। এরপরও তারা ৯ কোটি কার্ড সঠিক সময়ে প্রস্তুত ও বিতরণ করতে পারেনি। কার্য সম্পাদনে ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করায় পরে তাদের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হয়নি। তারা মোট ৭ কোটি ৭৩ লাখ কার্ড সরবরাহ করেছে। অবশিষ্ট এক কোটি সাতাশ লাখ কার্ড তারা আর সরবরাহ করতে পারেনি। চলতি বছরের ১০ মার্চ ৬ কোটি ১০ লাখ কার্ড পার্সোনালাইজ করা হয়েছে এবং বিতরণের জন্য উপজেলা নির্বাচন অফিসে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে জনগণের কাছে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি সাত লাখ নব্বই হাজার কার্ড।

আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত অন্য কাজগুলোও সমাপ্ত হয়েছে কিংবা সমাপ্তির শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে অর্জনের গতি লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ২০১১-১৬ অর্থবছরের জন্য প্রণীত কর্মপরিকল্পনা সংশোধন করে ২০১১-১৮ বছরের জন্য নতুন পরিকল্পনা করা হয়। প্রত্যেক বছরের জন্য বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু সে অনুসারেও অর্থাৎ কর্মপরিকল্পনায় পরিকল্পিত সময়ানুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এর একটা বড় কারণ ছিল ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংকের সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বিশ্বব্যাংক আর চুক্তি নবায়ন করেনি। ফলে বিশ্বব্যাংকের বরাদ্দকৃত পুরো অর্থ ব্যয় করাও সম্ভব হয়নি। কাজেই তখন থেকে পুরো ব্যয়ভার বাংলাদেশ সরকারকেই বহন করতে হচ্ছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত জিওবির মোট বরাদ্দ ৮৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৫১৬ কেটি ৭৭ লাখ টাকা অর্থাৎ অর্জন ৫৭.৫১ শতাংশ। তবে জিওবি খাতে ওবারথার টেকনোলজিসের পাওনা পরিশোধের জন্য ২২০ কোটি ২২ লাখ টাকার সংস্থান রয়েছে, যা আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় প্রদান করা সম্ভব হয়নি।

আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের অন্যতম দুর্বল দিকগুলো হলো- ফাইন্যান্সিং এগ্রিমেন্টে বিশ্বব্যাংকের আরোপিত কয়েকটি পূর্বশর্ত, যেমন- জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন (নিরা) সংশোধন ও বিধিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত অর্থ ছাড় না করা। চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদার কোম্পানি ওবারথার টেকনোলজিসের সময়মতো স্মার্টকার্ড প্রস্তুত, পার্সোনালাইজেশন ও বিতরণে ব্যর্থতা, বারবার ডিপিপি সংশোধন ও প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি। এ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত সময় ব্যয় ও ১৩৬.৬২ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ কার্ডে তথ্যের ভুল ও ছবির খারাপ মান, কার্ড সংশোধনে দীর্ঘসময় ও হয়রানি, উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে জনবলের অভাব, আইসিটি সিস্টেমের নিয়মিত আপগ্রেডেশনের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট ঘাটতি এবং সুস্পষ্ট এক্সিট প্লান না থাকা ছিল দুর্বল দিক। তা ছাড়া পিডি এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন। মাঠপর্যায়ের অফিসে স্মার্টকার্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে জনগণ হয়রানির শিকার হচ্ছেন- এতে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রকল্পের সুযোগসমূহ হচ্ছে প্রধানত বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক গ্রুপ এনআইডি ডেটাবেজের বিশ্বাসযোগ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। নাগরিক হিসেবে কার্ডধারীদের পরিচিতি নিশ্চিত এবং সেবা পাওয়া অনেক সহজতর হয়ে হয়েছে। স্মার্টকার্ড সংশোধন ও হারানো কার্ড পুনঃপ্রদানের জন্য ফি নির্ধারণের ফলে সরকারের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আইএমইডি প্রকল্পে কার্যক্রম গতিশীল করতে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। তা হলো- ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদল না করা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কাঠামো শক্তিশালী ও আধুনিকায়ন করা, মাঠপর্যায়ে আইটিতে দক্ষ জনবল নিয়োগ, মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোয় দুর্নীতি দূরীকরণ এবং প্রকল্পে কর্মরত দক্ষ জনবলকে স্থায়ী নিয়োগ দিয়ে এনআইডি ব্যবস্থাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান।

উপরে