শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০ | ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

পেঁয়াজের ঝাঁজ ও মরিচের ঝাল

প্রকাশের সময়: ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ - সোমবার | সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

currentnews

দেশজুড়ে করোনা মহামারির প্রকোপ কিছুতেই কমছে না। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। করোনা পূর্ণ দাপটেই বহাল আছে। এদিকে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে এসেছে বন্যা, জলাবদ্ধতা। ভাদ্রের তালপাকা গরমের প্রকোপও মানুষকে বেশ ভোগাচ্ছে।

এই দুঃসময়ে মানুষ যে সামান্য পেঁয়াজ-মরিচ-লবণ দিয়ে একটু ভাত খাবে, সেখানেও সৃষ্টি হয়েছে সংকট। চালের ব্যবস্থা যেমন তেমন, পেঁয়াজ-মরিচের ব্যবস্থা করতে মানুষের ভিটেমাটি বিক্রি করার অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ আকস্মিক ৩০-৩৫ টাকার পেঁয়াজ সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে। আর মরিচ তো আরো দুই ধাপ এগিয়ে ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছে। পেঁয়াজ আর মরিচ নিয়ে দেশে রীতিমতো লঙ্কাকাণ্ড চলছে।

তবে পেঁয়াজের দাম হঠাত্ বেড়ে যাওয়ায় হইচই হচ্ছে বেশি। এই হইচইয়ের বড় কারণ হচ্ছে, পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করার ভারতীয় সিদ্ধান্ত। ভারত আকস্মিক পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় বাংলাদেশে রাতারাতি পেঁয়াজের দাম তিন গুণ বেড়ে যায়। কারণ আমদানি করা পেঁয়াজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ভারতে দাম বাড়লে কিংবা ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলে তার প্রভাব তাত্ক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে পড়ে। ভারত যখন বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে, ঠিক তখন বাংলাদেশ শত শত টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি করছে। এতে মানুষ আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। অনেকেই বলছেন, ‘আমরা ইলিশ খাওয়াব, আর তোমরা আমাদের পেঁয়াজ দিবা না? মামুর বাড়ির আবদার?’

কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তুলছেন, ‘ভারত যদি বাংলাদেশের সত্যিকারের বন্ধু হয়, তাহলে আলোচনা ছাড়া কেন হঠাত্ করেই পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। অথবা শুষ্ক মৌসুমে যখন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির প্রয়োজন তখন পানি দেয় না, কিন্তু যখন বাংলাদেশে পানির প্রয়োজন নেই তখন ভারত কোনো রকম আলোচনা না করেই বাংলাদেশে পানি ছেড়ে দেয়, যার ফলে বাংলাদেশে বন্যার সৃষ্টি হয়। অথচ ভারতের প্রয়োজনে বাংলাদেশ সব সময়ই পাশে থাকে। তাহলে ভারত কি শুধুই মুখে মুখে বাংলাদেশের বন্ধু? কোনো আলোচনা ছাড়া ভারত বাংলাদেশকে সংকটের মধ্যে ফেলে কী ধরনের বন্ধুত্বের পরিচয় দেয়?’

তবে এটাও সত্য যে, সব রাষ্ট্রই নিজ স্বার্থে সব সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভারত তার ব্যতিক্রম নয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত সব দেশেই পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে এবং এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আছে। বাংলাদেশও নিশ্চয়ই নিজ স্বার্থ রক্ষা করবে এবং দেখবে কীভাবে পেঁয়াজের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলেও দাম এতটা বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কারণ বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে আছে, তা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। তাহলে এভাবে লাগামহীনভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে কেন? এ প্রশ্নের জবাব কারো জানা নেই।

তবে যত কথাই বলি না কেন, পেঁয়াজ এখন বাংলাদেশে একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। পেঁয়াজ খাওয়া এখন বাঙালির অভ্যাস হয়ে গেছে। যে পদে না দিলেও চলে, সেখানেও পেঁয়াজ দেওয়া হয়, আর যেখানে পেঁয়াজের দাবি আছে, সেখানে তো দেওয়া হবেই। অভ্যাসবশেই এখন রান্নায় কমবেশি পেঁয়াজ দেওয়া হয়। এ কারণে পেঁয়াজের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পেঁয়াজের প্রতি এই আকর্ষণ যদি অব্যাহত থাকে, আর দাম যদি না কমে, তাহলে পেঁয়াজ কিনতে কিনতেই গোটা জাতি ফতুর হয়ে যাবে।

পেঁয়াজের ঝাঁজ বাড়ার পাশাপাশি মরিচের তেজও মানুষকে বেশ ভোগাচ্ছে। মানুষ সামান্য একটু ঝাল খাবে, তাও পরের মুখে নয়, নিজের মুখে—সেখানেও যদি এত দাম দিতে হয়, তাহলে আর এ জাতি বাঁচবে কীভাবে?

তবে আশার কথা হচ্ছে এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও বড় বেশি ক্ষোভ নেই। এখন মানুষ ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেও খুব একটা বিক্ষুব্ধ হয় না। মানুষের মধ্যে এখন আর তেমন মান-অপমান বোধ নেই, নেই যন্ত্রণা বা কষ্ট। কাউকে জুতাপেটা করলেও এ বিষয়ে সে শোক বা অনুতাপ করে না। বরং সেই জুতাটা রেক্সিন, না লেদারের—সে বিষয়ে তৃতীয় কারো সঙ্গে আলোচনা করে!

যাহোক, মরিচের মতো ঝাল ও পেঁয়াজের ঝাঁজ নিয়ে সরকারের আরো সতর্ক হওয়া উচিত। মরিচের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। এ জিনিসটা কিন্তু বড়ই খাসা! রান্নায় দিলেই স্বাদের আগুন। স্বাস্থ্য বাঁচায়, শরীর ব্যথাও কমায়। ঝাল বলে ভয়? তা কয়জন করে?

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে যখন সূর্য অস্ত যেত না, সাহেবরা তখনো মরিচকে যমের মতো ভয় পেতেন। মুখে দিলে জ্বলে যায়, বাপ রে কী সৃষ্টি! এই ফলটির আদিভূমি, যত দূর জানা যায়, দক্ষিণ আমেরিকা। অন্তত ১০ হাজার বছর আগেই তার ব্যবহার ছিল সেখানে। তার পর মরিচের কায়কারবার ঘটে পনেরো শতকে কলম্বাস ও সহকর্মীদের মাধ্যমে। পর্তুগিজ বণিকরাই মরিচ নিয়ে যান নানা দেশে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের উপকূলে কেন রান্নাবান্নায় মরিচের এমন দাপট, বুঝতে কোনো অসুবিধে নেই। ইউরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া বাদ দিয়ে বাকি দুনিয়াতেই মরিচের প্রতিপত্তি, তবে এশিয়ার দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল হলো তার হেডকোয়ার্টার্স।

বলে রাখা ভালো, খুব ঝাল মরিচও সবার ঝাল লাগে না। যেমন পাখির। ওরা তাই দিব্যি মরিচ খেয়ে ফেলে, সেই মরিচের বীজ ওদের মলের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্র! অনেক মানুষ আছেন, পাখির কাছাকাছি, আপনি যখন নাকের জলে চোখের জলে অস্থির, তখন তিনি আপনার পাশে বসে দিব্যি তারিয়ে তারিয়ে ঐ একই পদটি খাচ্ছেন আর বলছেন, ‘কই, তেমন ঝাল হয়নি তো !’ আবার, সব মরিচ নয় সমান।

বগুড়া কিংবা পাহাড়ি এলাকার মরিচ নিয়ে কোনো পরীক্ষা না চালানোই ভালো। এসব মরিচ থেকে আপনি দূরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। বেশি ঝাল না লাগলে বরং এই ভেবে শান্তি পান যে, মরিচেও চিনি আছে। খাদ্য গবেষকদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম মরিচে থাকে প্রায় পাঁচ গ্রাম শর্করা! মেলাবেন তিনি, মেলাবেন!

যারা ঝাল খান না, তারা বলেন, মরিচ খেলে শরীর খারাপ হয়। মরিচ খুব বেশি খাওয়া নিশ্চয়ই ঠিক নয়, বিশেষ করে শুকনো মরিচ, তবে সে তো কোনো জিনিসই বেশি খাওয়া ভালো নয়। কিন্তু, নানা রকম মশলার মতোই, মরিচ কেবল স্বাদ বাড়ায় না, পুষ্টিও দেয়।

কী আছে মরিচে? পুষ্টিবিদদের মতে, আছে ভিটামিন ‘এ’, বি-সিক্স, ‘সি’, আছে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম। ভিটামিন ‘এ’ আমাদের দৃষ্টিশক্তি, মজবুত দাঁত ও শক্ত হাড়ের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। ভিটামিন ‘সি’ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, যে কোনো ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে। আছে অল্প প্রোটিন, বেশ কিছুটা কার্বোহাইড্রেট। আর এনার্জি? হ্যাঁ, তা-ও।

ভুল করে মরিচ চিবিয়ে ফেললে যে রকম আলজিভ ঝনঝন করে ওঠে, সে রকম এনার্জি নয়, তবে মরিচ থেকে সত্যিই অনেকটা ক্যালরি সংগ্রহ করে নিতে পারেন। এনার্জি ড্রিংকের থেকে কোনো অংশে কম উপকারী নয় এ জিনিস। যারা ডায়েট করছেন, তারা কিন্তু একটু সাবধান। বেশি খেলে ফ্যাট বেড়ে যেতে পারে!

ওষুধ হিসেবেও মরিচের গুণ কম নয়। ব্যথার ওষুধে, বিশেষ করে নানা ধরনের বাত এবং নার্ভের ব্যথা কমানোর ওষুধে মরিচ ব্যবহার করা হায়। এ ছাড়া আছে মরিচের অ্যান্টি-ব্যাকটিরিয়াল, অ্যান্টি-ডায়াবেটিক গুণও। উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের বিভিন্ন ওষুধে মরিচ মিশ্রিত থাকে। হজমের সহায়ক এনজাইমগুলোয় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে মরিচ ব্যবহার করা হয়। ভিটামিন ‘বি-কমপ্লেক্স’ সিরাপে নির্দিষ্ট পরিমাণ মরিচ মিশ্রিত থাকে। ত্বকে কোলাজেনে রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে মরিচ খুবই উপকারী। বিজ্ঞানের সীমানা পার হলেই বিশ্বাসের দুনিয়া। দক্ষিণ ভারতের মানুষ ভাবেন, বেশি ঝাল খেলে বুদ্ধি বাড়ে। বাঙালির যেমন মাছের মুড়ো খেলে বাড়ে।

এখন পেঁয়াজ-মরিচের সীমাহীন দামের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই দুটি জিনিস খাওয়া বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে মানুষের সামগ্রিক তেজ বা বারুদ আরো নিম্নগামী হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ খাবার বলতে একটু কাঁচা মরিচের ঝাল আর পেঁয়াজের ঝাঁজই খায়। এই ঝাল-আর ঝাঁজের প্রভাবে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে, গালি দেয়, তড়পায়। এখন ১০০, ১৫০, ২০০ টাকা কেজির মরিচ-পেঁয়াজ খেতে না পেরে যদি বিএনপির নেতাকর্মীদের মতো গোটা জাতিই ঝিমিয়ে পড়ে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই!

লেখক: রম্যরচয়িতা

উপরে