বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০ | ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

যে নবির আগমনে ধন্য এ ধরা

প্রকাশের সময়: ৫:২৮ অপরাহ্ণ - শুক্রবার | অক্টোবর ৩০, ২০২০

currentnews

মানুষের হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে মহান আল্লাহ এই ধরণিতে অসংখ্য নবি-রসুল পাঠিয়েছেন। নবি-রসুলদের আগমন ধারায় সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবি হলেন মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (স)। মহান আল্লাহর যত সৃষ্টি আছে তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী হলেন হযরত মুহাম্মদ (স)। তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে আমরা যতই বলি, যতই লিখি কখনো তা শেষ হবার নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তাঁর প্রিয় হাবিবের শানে কুরআনুল কারিমে সুরা ইনশিরার ৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘হে নবি আমি আপনার আলোচনাকে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছি।’ রসুল (স) কে নিয়ে বহু দার্শনিক, বহু গবেষক, বহু কবি অনেক লেখা লিখেছেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নবিজি সম্পর্কে নিবেদন করে বলেন, ‘সাহারাতে ফুটল রে ফুল রঙিন গুলে লালা/ সেই ফুলেরই খোশবুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ারা/ সে ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি চাঁদ-সুরুজ গ্রহ-তারা/ ঝুঁকে পড়ে চুমে সে ফুল নীল গগণ নিরালা।’

জাহেলিয়াতের কালো মেঘ যখন সমগ্র জগেক ঘিরে নিয়েছিল, মানুষ তার সব নৈতিক গুণাবলী হারিয়ে দিক ভ্রান্তের মতো ছুটে চলেছিল, ঠিক তখনই আরবের বুকে মক্কা নগরীতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মা আমেনার ঘর আলোকিত করে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদিকের সময় উদিত হয় ইসলামের রবি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (স)। নবিজি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব থেকেই অসংখ্য বরকত প্রকাশিত হতে থাকে। নবি করিম (স)-এর সম্মানিত মা আমেনা বলেন, যখন নবিজি তার গর্ভে আসলেন তখন তাকে স্বপ্নে সুসংবাদ দেওয়া হলো —হে আমেনা! তোমার গর্ভে যে সন্তান রয়েছে তিনি এই উম্মতের সর্দার, তিনি সাইয়্যেদুল মুরসালীন, খতামুননাবিয়্যিন। যখন তিনি ভূমিষ্ঠ হবেন তখন তুমি এভাবে দোয়া করবে—‘আমি একে আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করছি।’ আর নাম রাখবে মুহাম্মদ।

নবিজি জন্মের পর বেশি দিন মায়ের কাছে থাকেননি, তখনকার আরবের রীতি অনুযায়ী তিনি তায়েফে দুধ মা হালিমা সাদিয়ার ঘরে লালিত-পালিত হন। হালিমাতুস সাদিয়া রাযি. বলেন, আমি অন্যান্য মায়ের সঙ্গে মক্কায় গেলাম কোনো দুগ্ধপোষ্য সন্তান পাওয়া যায় কি-না। যেহেতু মুহাম্মদ (স) ছিলেন ইয়াতীম-গরিব তাই তাকে কেউ নিতে চাইলেন না। সারাদিন আমি মক্কায় ঘুরলাম আমার ভাগ্যে কোনো ধনী পরিবারের সন্তান জুটল না। অবশেষে শিশু মুহাম্মদ (স) আমার ভাগ্যে জুটল। তাঁর মা ও দাদা আমাদের যাবার সময় কোনো উপহার পর্যন্ত দিতে পারলেন না। কিন্তু শিশু মুহাম্মদকে কোলে নিতেই আমাদের বরকত শুরু হয়ে গেল। মক্কা থেকে খুব বেশি দূর যেতে না যেতেই আমার স্তন দুধে ভরে গেল, আমাদের উট যা সবার উটের চেয়ে দুর্বল ছিল সেটি সবল হয়ে সবার আগে আগে চলতে লাগল। যখন ঘরে পৌঁছালাম আমার স্বামী ব্যাকুল হয়ে আমাকে বলতে লাগলেন, হালিমা দেখ, দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও আমাদের উস্ট্রিগুলো কীভাবে দুধে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। নবিজি ছোটকাল থেকেই ইনসাফ করতেন। তিনি তাঁর দুধ মার একটা স্তন পান করতেন অপর স্তনটি দুধ ভাই আব্দুল্লাহর জন্য রেখে দিতেন। ছোটকাল থেকেই নবিজি মহান আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টিরাজি সম্পর্কে চিন্তা করতেন। তাঁর চাল-চলন অন্য শিশুদের মতো ছিল না।

তায়েফে নবিজি হালিমা সাদিয়ার ঘরে তাঁর শৈশবের পাঁচটি বছর কাটিয়েছেন। সেখানেই তিনি বেড়ে ওঠেছেন। এরপর যখন তিনি মক্কায় মায়ের কাছে ফিরে এলেন একদিন তাঁর মা তাঁকে নিয়ে মদিনায় কোনো এক আত্মীয়কে দেখার জন্য গেলেন, ফেরার পথে তাঁর মা ইন্তেকাল করেন। তখন নবিজির বয়স মাত্র ছয় বছর। দাসি আয়মানের সঙ্গে তিনি মক্কায় ফিরে দাদা আব্দুল মুত্তালিবের স্নেহের কোলে লালিত পালিত হতে থাকেন। এই অল্প বয়সেই মুহাম্মদ (স) এর কথাবার্ত, চাল-চলন, আচরণভঙ্গি ছিল সবার চেয়ে ভিন্ন ধরনের। দাদা আব্দুল মুত্তালিব তার উজ্জ্বল ভবিষতের অপেক্ষায় সময় গুনতে ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস খুব অল্প দিনে তিনিও ইন্তেকাল করেন। এরপর নবিজির চাচা আবু তালিবের পরম স্নেহ ভালোবাসার কোলে লালিত-পালিত হতে থাকেন। চাচা ছিলেন ভাতিজার জন্য পাগলপারা, এক মুহূর্তের জন্যও চাচা তাঁকে ভুলে থাকতে পারতেন না। চাচা আবু তালেব সিরিয়াতে বাণিজ্য পরিচালনা করতেন। রসুল (স) এর বয়স যখন ১২ বছর তখন চাচা আবু তালেব বাণিজ্যের উদ্দেশে সিরিয়া যাবেন এতে নবিজির মন খুব খারাপ হয়ে পড়ল এবং চাচাও তাকে ছেড়ে যাবেন তা-ও তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। কাফেলা রওনা হবে এমনি সময় মুহাম্মদ (স) চাচা আবু তালেবের উটের রশি ধরে সামনে এগিয়ে দিতে থাকেন। কিন্তু ভাতিজার মলিন চেহার দেখে তিনি আর সহ্য করতে পারলেন না; বললেন, তাহলে তুমিও আমাদের সঙ্গে চল। এই বলে আবু তালেব মুহাম্মদ (স) কে নিজের উটের পেছনে বসিয়ে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন। মক্কার প্রান্তর ছেড়ে যাবার সময় নবিজি আপন জন্মভূমির দৃশ্যগুলো ভালোভাবে অবলোকন করতে থাকলেন, তিনি মক্কাকে খুব ভালোবাসতেন। এক সময় মক্কা পার হয়ে বহু পথ পাড়ি দিয়ে যখন কাফেলা সামুদ জাতির ধ্বংসপ্রাপ্ত বসতির কাছ দিয়ে যাচ্ছিল তখন আবু তালেব নবিজিকে সেই নাফরমান জাতির ধ্বংসের কাহিনী শোনালেন। মুহাম্মদ (স) তা থেকে অনেক কিছু জানলেন শিখলেন। এরপর কাফেলা পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে ‘বসরা’ নামক একটি স্থানে গিয়ে যাত্রাবিরতি করল। মুহাম্মদ (স) কে মালসামানার কাছে রেখে সবাই একটি টিলার কাছে গিয়ে বিশ্রাম নিলেন। এই টিলার ওপর ছিল ‘বুহাইরা রাহেবের’ গির্জা। বুহাইরা রাহেব ছিলেন অনেক বড় পন্ডিত, তিনি তাওরাত ইঞ্জিলসহ আগের সব কিতাবের বড় আলেম ছিলেন। বুহাইরা আবু তালেবের কাছে তার দূত পাঠালেন। দূত এসে বলল, বুহাইরা আপনাদের তার সঙ্গে দুপুরের খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আবু তালেবের কাফেলার একজন বলে উঠল—‘বছরের পর বছর আমরা এই এলাকা দিয়ে চলাফেরা করেছি, আজ প্রথম বারই বুহায়রা আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন।’ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে আবু তালেব কাফেলার মালসামানার কাছে মুহাম্মদ (স) কে রেখে অন্যদের নিয়ে বুহাইরার কাছে গেলেন। বুহাইরা মেহমানদের জন্য বিচিত্র সব খাবারের আয়োজন করলেন, তারা সবাই সেখানে পৌঁছলে তিনি সবার চেহারার দিকে তাকাতে থাকলেন, কিন্তু তিনি যাকে খুঁজছিলেন, সে চেহারাটি তার নজরে এলো না। তিনি আবু তালেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের কাফেলার আর কোনো লোক বাকি রয়েছে কি? আবু তালেব বললেন, হ্যাঁ, একজন বাকি রয়েছে। তখন বুবায়রা বললেন, তাকেও নিয়ে এসো। মুহাম্মদ (স) যখন তার কাছে পৌঁছলেন তখন তিনি তাকে নয়ন ভরে দেখতে লাগলেন। খাবার-দাবারের পর সবাইকে বিদায় করে দিয়ে বুহায়রা আবু তালেব ও মুহাম্মদ (স) কে থেকে যেতে বললেন। বুহায়রা নিরিবিলি একাকী আবু তালেবকে জিজ্ঞেস করলেন, এই বালক ও তোমার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি? আবু তালেব বললেন, সে আমার ছেলে। বুহায়রা বললেন না, এর পিতা-মাতা উভয়েই তো মারা গেছেন। তখন আবু তালেব বলেন, সে আমার ভাতিজা। বুহায়রা বললেন, এর নাম কী? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বুহায়রা সঙ্গে সঙ্গেই বললেন লাত ও ওজ্জার কছম খেয়ে বলছি এই বালকের নাম তাওরাত ও ইঞ্জিলে মুহাম্মদ ও আহমদ হিসেবে এসেছে। মুহাম্মদ (স) সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, লাত ও ওজ্জার কথা আমার সামনে উচ্চারণ করবেন না, তাদের চেয়ে এই পৃথিবীতে ঘৃণিত আর কিছু নেই। এরপর বুহায়রা আবু তালেবের অনুমতি নিয়ে মুহাম্মদ (স) এর সম্মতিতে তার ঘাড়ের নিচের অংশ দেখতে চাইলেন। বুহায়রা প্রাণভরে নবিজির ভবিষ্যতের মোহরে নবুওয়াতের চিহ্ন দেখতে থাকলেন। বুহায়রা আনন্দের সঙ্গে মুহাম্মদ (স) কে জিজ্ঞেস করলেন- হে মুহাম্মদ বলো তো কোন জিনিস তুমি বেশি পছন্দ কর? মুহাম্মদ (স) বললেন, একাকীত্ব, আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টিরাজি নিয়ে ভাবতে। বুহায়রা আবার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বেশি বেশি স্বপ্ন দেখ? মুহাম্মদ (স) বললেন, হ্যাঁ এবং তার বাস্তবায়নও আমি দেখি। বুহায়রা আবু তালেবকে বললেন, এই ছেলেকে খুব সাবধানে রাখিও এর প্রতি যত্ন নিও, সে হবে আখেরি জামানার নবি, সর্বশেষ নবি। আমি তাঁর মধ্যে যে সব আলামত দেখতে পাচ্ছি তা তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও আগের সব কিতাবে উল্লেখ রয়েছে। আমার আফসোস আহ! আমার জীবনটা যদি এতটুকু দীর্ঘ হতো যে, আমি তাঁর দাওয়াতী কাজের জমজমাট অবস্থাটা দেখে যেতে পারতাম! সুপ্রিয় পাঠক, আমাদের সু-নসিব আমরা আখেরি নবির উম্মত হতে পেরেছি। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণ অনুকরণ করা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন!

লেখক: আজিমপুর দায়রা শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীর ও মুতাওয়াল্লী

 

উপরে