শুক্রবার, ০৫ মার্চ, ২০২১ | ২০শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

শ্যামাপূজা : রূপে-রূপান্তরে

প্রকাশের সময়: ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ - শনিবার | নভেম্বর ১৪, ২০২০

currentnews

রূপের পরিবর্তনে সমস্যা, আবার সমস্যার রূপ পরিবর্তন- দুটোই প্রত্যক্ষ হয় আমাদের জীবনের পথচলায়। রূপের পরিবর্তনের সঙ্গে ‘মিউটেশন’ শব্দের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। করোনার আবির্ভাবে ‘মিউটেশন’ ব্যাপারটি এখন মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। ‘মিউটেশন’ মানে শারীরিক (জিনগত) রূপের পরিবর্তন। জীবনকালে সৃষ্ট সমস্যার নানারকম রূপ রয়েছে- শারীরিক, ব্যক্তিগত, সামাজিক- এসব সমস্যার একটির অবসান হতে না হতে অরেকটির উদ্ভব। কখনও কখনও মনে হয়, এখনই বোধহয় সমাধান হতে চলেছে সব সমস্যার। কিন্তু পরক্ষণেই নতুন রূপে ও নতুন সাজে অন্য সমস্যার আগমন ঘটে। এমন অবস্থায় হাত গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। রয়েছে জীবন রক্ষার তাগিদ, উন্নতি ও প্রগতির স্বপ্ন। কিন্তু জীবন-সমস্যার সঙ্গে পূজা-উপাসনার সংশ্লিষ্টতা কোথায়? নদীতে স্টিমার ভীষণভাবে আন্দোলিত হয়, কখনও কখনও মনে হয় ছোট ডিঙি নৌকাগুলো এই বুঝি তলিয়ে গেল, দু-একটা তলিয়েও যায়। কিন্তু হাজারমুণে কিস্তিগুলো একটু নড়াচড়া খেল, আবার চলতে শুরু করল স্বাভাবিকভাবে। জীবন প্রবাহেও হাজারমুণে কিস্তিরূপ ঈশ্বরালম্বন থাকলে আমাদের তলিয়ে নিতে পারে না স্টিমাররূপ সমস্যা বা সমস্যা সংশ্লিষ্ট দুঃখ বা বিপর্যয়। ঈশ্বরীয় সত্তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ও ঐক্য তৈরির এবং বিপর্যয় মোকাবেলা করে জীবনকে অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম উপায় পূজা-উপাসনা- এমনটিই ধর্মাচার্য ও ভক্তগণের অভিমত।

 কোনো উৎসবমুখরতা নয়; লক্ষ্যে পৌঁছার যেন এক নীরব, নিভৃত ও নিরন্তর সাধনার আয়োজন- শ্যামাপূজা। শ্যামা মায়ের মহিমা কীর্তনে আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস যেন সবচেয়ে বেশি মুখরিত। ইতিহাসের পৃষ্ঠা গৌরবে ঘোষণা দিচ্ছে- রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, বামাক্ষ্যাপা প্রমুখ সাধকরা সার্থক করেছেন তাদের জীবন। তাদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন তো সেই শ্যামা-মা! শ্যামারূপে মুগ্ধ ও আলোকিত হয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাদের আলোকিত হৃদপদ্ম থেকে উৎসারিত সুবাস ও আলো যেন পরিগ্রহ করেছে সুমধুর সঙ্গীতের রূপ। ‘শ্যামা মা কি আমার কালো রে…; কালো মেয়ের পায়ের তলায়…;’- এরূপ অসংখ্য শ্যামাসঙ্গীত, শুধু কি শব্দের মনোহর পরিবেশনা? নিশ্চয়ই নয়। হৃদয়কে পবিত্রতার স্নিগ্ধ আবেশে ভরিয়ে দেয়া সেই শব্দপুষ্প ভক্তের কাছে সাধনার উপকরণ। তাদের অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রকাশ সেসব হৃদয়স্পর্শী সুরধ্বনি মিশে আছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন চলায়। এ তো বেশি দিন আগের ঘটনা নয়, মাত্র ১৬০ বছর আগে, শ্রীরামকৃষ্ণ তার বহুমুখী সাধন জীবন শুরু করেছেন শ্যামাপূজা দিয়েই। তার সাধনালোকে আলোকিত ও বিশ্বনন্দিত হয়েছে রানী রাসমনির দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির, আর সূচনা হয়েছে এক আধ্যাত্মিক নবজাগরণ সমগ্র জগতে।

শ্রীরামকৃষ্ণের উপলব্ধিপ্রসূত সংক্ষিপ্ত কথা থেকে আমরা ধারণা পেতে পারি ‘মা কালী’ সম্পর্কে- ‘একই বস্তু, যখন তিনি নিষ্ক্রিয়- সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়- কোনো কাজ করছেন না- এ কথা যখন ভাবি, তখন তাকে ব্রহ্ম বলে কই। যখন তিনি এসব কাজ করেন, তখন তাকে কালী বলি, শক্তি বলি। একই বস্তু নাম-রূপ ভেদ। ব্রহ্ম আর শক্তি অভেদ। যেমন অগ্নি ও অগ্নির দাহিকা শক্তি।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পরিবর্তনশীল জগতের যে অপরিবর্তনীয় সত্ত্বা, বেদে তাকে ‘ব্রহ্ম’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাবের সাধনায় শ্রীরামকৃষ্ণের উপলব্ধি- ‘যত মত তত পথ’ অর্থাৎ সাধনার পথ ভিন্ন হলেও উপলব্ধ সত্য বা গন্তব্য একই। তবে ‘মা’ বড় ভালোবাসার জিনিস। মাতৃভাব শুদ্ধভাব, সাধনার ক্ষেত্রে সাধকদের সবচেয়ে বেশি আদরণীয় মাতৃভাব। রামপ্রসাদ বলছেন, তাকে ষড়দর্শনে অর্থাৎ পাণ্ডিত্য দিয়ে পাওয়া যায় না; ভাব, ভক্তি ও ভালোবাসা দিয়ে লাভ করতে হয়। সেই ভক্তি-ভালোবাসা লাভের জন্যই ঈশ্বরের মাতৃভাবে ও শক্তিরূপে শ্যামাপূজার আয়োজন। সূক্ষ্ম বিষয়কে অনুধাবনের জন্য স্থূল অবলম্বন প্রয়োজন হয়। ঈশ্বরের সূক্ষ্মস্বরূপ অনুধাবনের জন্যই রূপ (প্রতীক, প্রতিমা) বা যন্ত্র অবলম্বনে পূজা।

পূজা মানে পদ্ধতিগতভাবে তাকে (উপাস্যকে) অনুধ্যান করে তার প্রসন্নতা লাভ ও তার সঙ্গে ঐক্য স্থাপনের প্রয়াস। ভৌত বিজ্ঞানের মতো এসব পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াও অধ্যাত্ম বিজ্ঞানের পরীক্ষা-লব্ধ সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ষোড়শোপচারে পূজা, প্রধান দেবতার অঙ্গীভূত অন্যান্য দেবতার পূজা, হোম, ইত্যাদি প্রক্রিয়ার সন্নিবেশ সাধারণভাবে যে কোনো বিশেষ পূজায় লক্ষণীয়। শ্যামাপূজায়ও তদ্রুপ রয়েছে। তবে এ পূজায় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় ন্যাসের ব্যাপকতা। ন্যাস মানে নিক্ষেপ ও স্থাপন। ন্যাস ক্রিয়ায় বর্ণমালার ক্রমিক সজ্জায় সন্নিবিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ ও মননের মধ্য দিয়ে সাধক নিজ দেহ সম্পর্কে কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করে সেস্থলে স্থাপন করেন দেবত্বভাবনা বা ভগবদ্বুদ্ধি। এভাবে প্রয়াস পান সমগ্র বিশ্ব তথা বিশ্ব-নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে ঐক্য স্থাপনের। আর দেবতা হয়ে দেবপূজা করাই তো শাস্ত্রের উপদেশ। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমগ্র বিশ্ব নাম-রূপের সমষ্টিমাত্র। ‘রূপ’ বস্তুর বাইরের আবরণ, নাম বা ভাব এর অন্তর্নিহিত শস্য। নামের প্রতিনিধিস্বরূপ বর্ণমালাগুলোর পশ্চাতে রয়েছে অব্যক্ত, অনন্ত শক্তি। একে স্ফোটা বা শব্দব্রহ্মও বলা হয়। ‘ওঁ’ নামক অক্ষর সেই শক্তি বা শব্দব্রহ্মের প্রকাশের সামর্থ্য রাখে। অধ্যাত্ম বিজ্ঞানীরা বলেন, ঈশ্বরই প্রথমে নিজেকে স্ফোটারূপে পরিণত করে দৃশ্যমান জগতরূপে বিকশিত করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মায়ের গলায় পরিহিত মণ্ডুমালাও পঞ্চাশৎ বর্ণমালা এবং নাম-রূপাত্মক জগতেরই প্রতিভূ। পূজার প্রতিটি ক্রিয়া এবং প্রতিমার রূপ এরূপ তাৎপর্যমণ্ডিত। তবে, পূজা শুধু একদিনের বা কয়েক ঘণ্টার ব্যাপারমাত্র নয়। জীবনযাত্রাই পূজা হয়ে দাঁড়ায় অগ্রসরমাণ সাধকের নিকট। ‘মা, আমার কথামাত্রই তোমার জপ হোক, অঙ্গুলীচালনামাত্র তোমার পূজার মুদ্রা হোক, চলামাত্র তোমার প্রদক্ষিণ, ভোজনাদিক্রিয়া তোমার আহুতি, শয়ন হোক তোমাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম, আমার নিখিল শক্তিসংযোজিত সুখ আত্মসমর্পণ, আর আমার কার্যমাত্র হোক তোমার পূজা।’- ভক্তের প্রার্থনাব্যঞ্জক সৌন্দর্য লহরীর সেই শ্লোকটি প্রাত্যহিক জীবন-পূজার রহস্যই আমাদের মনে করিয়ে দেয়।

স্বামী দেবধ্যনানন্দ : সন্ন্যাসী, রামকৃষ্ণ মঠ, ঢাকা

https://www.revenuecpmnetwork.com/hsbkfw8q51?key=6336343637613361393064313632333634613266336230363830336163386332

উপরে