বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২১ | ৭ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

চট্টগ্রামে আবারও লাফিয়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ

প্রকাশের সময়: ৯:৩৩ অপরাহ্ণ - মঙ্গলবার | নভেম্বর ২৪, ২০২০

currentnews

শীত শুরু হতে না হতেই চট্টগ্রামে আবারও লাফিয়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। রবিবার (২৩ নভেম্বর) একদিনেই চট্টগ্রামে করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২৪২ জন। গত আড়াই মাসে এটিই সর্বোচ্চ শনাক্ত বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি।

শুধু রবিবার নয়, চট্টগ্রামে এখন ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন করোনা রোগী বাড়ছে। করোনার এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরু বলছেন চিকিৎসকরা। শীতের সময় দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করেছিল জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এটি তারই পূর্বাভাস বলছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শীতে করোনার সংক্রমণ বাড়ার বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন।

সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘শীত শুরু হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামে করোনা পজিটিভ রোগী শনাক্ত বাড়ছে। মাঝখানে একদিন ছাড়া গত ১৫ দিনে করোনা পজিটিভ শনাক্তের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসিয়াস ডিজিজেসের (বিআইটিআইডি) মাইক্রোবায়োলজি ও করোনা পরীক্ষাগারের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাকিল আহমেদ বলেন, শনাক্তের হার যেভাবে বাড়ছে তাতে সামনে সংক্রমণ আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে।

সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, ৪ এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর ধারাবাহিকভাবে চট্টগ্রামে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকে। ওই মাসে করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন ৭২ জন। এরপর মে মাসে করোনা রোগী হুট করেই বেড়ে যায়। ওই মাসে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হন ২ হাজার ৮৯৫ জন। জুন মাসে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হন ৫ হাজার ৮১৩ জন। জুলাই মাসে করোনা আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৯৫৮ জন। এরপর আগস্ট মাসে চট্টগ্রামে কমতে শুরু করে করোনা সংক্রমণ। আগস্ট মাসে এখানে করোনা শনাক্ত অর্ধেকে নেমে আসে। আগস্ট মাসে চট্টগ্রামে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হন ২ হাজার ৮১৪ জন। এরপর সেপ্টেম্বরে আরও কমে চট্টগ্রামে করোনা শনাক্ত নেমে আসে হাজারের ঘরে। সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হন মাত্র এক হাজার ২১৭ জন। এরপর আবার বাড়তে শুরু করে করোনার সংক্রমণ। অক্টোবর মাসে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হন ২ হাজার ৪৭৯ জন। এরপর চলতি মাসের এই ২৩ দিনে ২ হাজার ৬২২ জন।

এরমধ্যে গত ১৩ দিনে সবচেয়ে বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গত ১১ থেকে ২৩ নভেম্বর- এই ১৩ দিনে চট্টগ্রামে মোট ১ হাজার ৯০০ জন নতুন করে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। আশঙ্কার দিক হলো, এরমধ্যে এক হাজার ৩২০ জনই চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দা। বাকি ৩৩৮ জন জেলার ১৫ উপজেলার বাসিন্দা। ১১ নভেম্বর ১০৭, ১২ নভেম্বর ১১৩, ১৩ নভেম্বর ১০৮, ১৪ নভেম্বর ১৪৬, ১৫ নভেম্বর ৬৩, ১৬ নভেম্বর ১৮১, ১৭ নভেম্বর ১৫৭, ১৮ নভেম্বর ১৭৮, ১৯ নভেম্বর ১৬১, ২০ নভেম্বর ১৯৭ জন, ২১ নভেম্বর ১৪৫ জন, ২২ নভেম্বর ৬৪ জন এবং সর্বশেষ ২৩ নভেম্বর করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২৪২ জন।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার এই প্রবণতাকে আমরা শীতকালীন সংক্রমণ হিসেবে দেখছি। শীতকালে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাবে এটি আগেই বলা হয়েছিল। এখন সেটি বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। শীতের মৌসুম, স্বাস্থ্যবিধি না মানা, সামাজিক অনুষ্ঠান বৃদ্ধিসহ নানা কারণে এটা বাড়ছে। তাই আমাদের স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। অন্যথায় এটি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে আক্রান্ত অনুপাতে মৃত্যুহার কিছুটা কম।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৪ এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর ওই মাসে করোনা আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে মারা যান ৮ জন। এরপর মে মাসে সেটি আরও বেড়ে যায়। আগের মাস থেকে আটগুণ বেড়ে মে মাসে চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৭৫ জন। জুন মাসে মারা যান ৯৮ জন। এরপর জুলাই মাসে মৃত্যুহার কমতে শুরু করে। জুলাই মাসে করোনা আক্রান্ত হয়ে ৫৮ জন মারা যান। এরপর আগস্ট মাসে মারা যান ৩৯ জন। সেপ্টেম্বরে এটি আরও কমে আসে। সেপ্টেম্বরে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান মাত্র ১৪ জন। অক্টোবরে মারা যান ১১ জন। আর চলতি মাসে গত ২৩ দিনে চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন মাত্র ১০ জন।

একই চিত্র দেখা যায়, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের করোনা ইউনিটেও। চলতি মাসে সেখানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার অনেক কমেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ মে হাসপাতালে করোনা ইউনিট চালুর পর থেকে এই পর্যন্ত গত ছয় মাসে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৫২ জন। এরমধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৮৭৪। তাদের অধিকাংশই করোনা ইউনিটের অবজারভেশন কর্নারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৭শ’৬ জন। অপর ১৬৮ জন হাসপাতালের আইসোলেশন কর্নারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

তবে চলতি মাসে মৃত্যুর এই হার কিছুটা কমেছে। ২০ নভেম্বর পর্যন্ত ২০ দিনে হাসপাতালের করোনা ইউনিটের অবজারভেশন সেলে ভর্তি হয়েছেন ২৪২ জন। এরমধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে মারা গেছেন ৪০ জন। অন্যদিকে, একই সময়ে করোনা ইউনিটের আইসোলেশন সেলে ভর্তি হয়েছেন ৩৫ জন। এরমধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৩ জন।

সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, করোনার সংক্রমণ বাড়লেও হাসপাতালে রোগী ভর্তির হার কিছুটা কমেছে। মোট আক্রান্ত রোগীর ২ থেকে ৩ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। অন্যরা বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মৃত্যুর হারও অনেক কমেছে। সেই হিসেবে আমরা বলতে পারি এটি কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির। তবে এটি নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। শীতে যদি করোনাভাইরাস এর স্ট্রেংথ বৃদ্ধি করে তখন এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, সরকারিভাবে যেসব আইসোলেশন সেন্টার ও হাসপাতাল চালু করা হয়েছে সেগুলো একটাও আমরা বন্ধ করিনি। এর সঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে করোনা রোগীদের জন্য এখন ২০০ সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেটি করোনা সংক্রমণের শুরুতে ছিল। তাই করোনার প্রকোপ বাড়লেও চিকিৎসা নিয়ে খুব বেশি হিমশিম খেতে হবে না। করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের চিকিৎসকরাও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাই আশা করছি, শীতে করোনার সংক্রমণ বাড়লে সেটি আমরা ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারবো।

 

উপরে