শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২ | ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

হরিরামপুরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য সুপ্রাচীন মাচাইনের শাহী মসজিদ

প্রকাশের সময়: ১২:০৭ অপরাহ্ণ - বুধবার | মার্চ ৯, ২০২২
হরিরামপুরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য সুপ্রাচীন মাচাইনের শাহী মসজিদ

হরিরামপুরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য সুপ্রাচীন মাচাইনের শাহী মসজিদ

জ. ই. আকাশ, হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) থেকে : মানিকগঞ্জ জেলার অন্যতম পূণ্য ভূমি হিসেবে খ্যাত হরিরামপুর উপজেলার বাল্লা ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নেরই ঐতিহাসিক স্থাপত্য সুপ্রাচীন মাচাইনের শাহী মসজিদ। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট ও আকর্ষণীয় শিল্পমণ্ডিত এই মসজিদটি দেশের অন্যতম পুরাকীর্তির একটি। শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদটি ১৫০১ খ্রি. হোসেন শাহ্ নির্মাণ করেন।

তৎকালিন সময়ে নির্মিত এই মসজিদটির মূল অংশের ওপর রয়েছে বড় বড় তিনটি গম্বুজ। উত্তর ও দক্ষিণ পার্শ্বের গম্বুজের চেয়ে মাঝের গম্বুজটি আকারে একটু বড়। মসজিদটির মূল অংশের ওপর রয়েছে দৃষ্টিনন্দন নিখুঁত শৈল্পিক কারুকাজ। যা একনজরেই সকলে দৃষ্টি কাড়ে। মসজিদটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে চুন, সুরকি ও সাদা সিমেন্ট। কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে ঐতিহাসিক এ শাহী মসজিদটি। কয়েক বছর আগে প্রাচীন এই মসজিদটি সংস্কার করা হয়। এতে বিভিন্ন রঙের আস্তরে আরও সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়।

এ মসজিদটির উত্তর পাশে রয়েছে হযরত শাহ্ রুস্তম (রহ:) বুগদাদীয়ার মাজার শরীফ।স্থানীদের সাথে আলাপকালে পূর্ব ইতিহাস অনুযায়ী জানা যায়, বাংলার বিখ্যাত হোসেন শাহি বংশের খ্যাতিমান সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালে হযরত শাহ্ রুস্তম (রহ:) বুগদাদীয়া মানিকগঞ্জ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার করার জন্য আসেন এবং মাচাইন গ্রামে খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন অাধ্যাত্বিক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। ওই সময়ে তার অলৌকিক গুণে মুগ্ধ হয়ে এলাকার লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা শুরু করেন।

অাধ্যাত্বিক জগতের কামেল দরবেশ হযরত শাহ রুস্তম (রহ:) বুগদাদিয়া তৎকালিন সময়ে এ অঞ্চলের পদ্মা, ইছামতী ও কান্তাবতী নদীর ত্রিমোহনায় বাঁশের মাচানে বসে ইবাদত করতেন। যার ফলশ্রুতিতে এই মাচান নামানুসারে পরবর্তীতে এই গ্রামটি মাচাইন গ্রাম নামে নামকরণ করা হয়।

সুলতান আলাউদ্দিন একজন মুসলিম শাসক ছিলেন। তিনি হজরত রুস্তম শাহ (রহ:) বুগদাদীয়ার ইসলাম প্রচারে খুবই খুশি হয়েছিলেন। যার ফলে এই মহান বুজুর্গ সাধকের প্রতি তার বিশেষ ভক্তি-শ্রদ্ধা ভর করে। তার এই শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে এই এলাকায় ইসলাম প্রচারের সুবিধার্থে ১৫০১ খ্রিষ্টাব্দে এই সুরম্য মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি বাহ্যিক জগত থেকে চিরবিদায়ের পর এই হযরত শাহ রুস্তম (রহ:) বুগদাদীয়ার স্মরণে এখানে প্রতি বছর ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। মানিকগঞ্জ জেলাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে তার হাজার হাজার ভক্তবৃন্দের আগমণ ঘটে এখান। এছাড়াও প্রতি শুক্রবারেই জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে এসে বাচ্চাদের মুখে ভাতও (শিন্নি মুখে) দেন অনেকে। স্থানীরা দাবি করে বলেন, প্রায় ৮ শো বছর যাবৎ এখানে এই মুখে ভাত (শিন্নি মুখে) দেয়ার রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। এতে করে প্রতি শুক্রবারেই এখানে ছোট পরিসরের একটা মেলায় পরিণত হয় এবং বিভিন্ন রকমের দোকানপাট বসে। ফলে এই স্থানটি রূপ নেয় এক মিলনমেলায়।

এ সুরম্য মসজিদটি সম্পর্কে স্হানীয় মাচাইন গ্রামের কাজী নাইচ জানান, “এটা ঐতিহ্যবাহী এক মসজিদ, যা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে মিশে আছে। পূর্ব পুরুষ থেকেই কালে কালে এই মসজিদ এবং হযরত শাহ রুস্তম (রহঃ) বুগদাদীয়ার সম্পর্কে আমরা বিভিন্ন ইতিহাস শুনে আসছি। তবে অনেক ভক্তবৃন্দের আগমন ঘটে এখানে। হযরত শাহ রুস্তম (রহঃ) বুগদাদীয়ার আবির্ভাবের ফলেই এই স্থানটি প্রসিদ্ধ লাভ করেছে।”

টিপু চৌধুরী জানান, ” প্রায় ৮’শো বছরের এই পুরাকৃতি মাচাইনের শাহী মসজিদটি। এটি আসলে শুধু মাচাইনের নয়, পুরো মানিকগঞ্জের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এখানে হযরত শাহ রুস্তম (রহঃ) বুগদাদীয়ার স্মরণেই তৎকালীন সময়ে নির্মাণ করা হয়। যা আজও টিকে আছে। এখানে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে উনার ভক্তবৃন্দসহ অনেক দর্শনার্থীদের সমাগম হয়। এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে।”

আর্কাইভ

বিজ্ঞাপন

উপরে