বুধবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২১ | ৬ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

করোনাকাল তরুণরা যেভাবে কাজে লাগাতে পারে

প্রকাশের সময়: ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ - শনিবার | নভেম্বর ১৪, ২০২০

currentnews

তরুণ প্রজন্মের বড় অংশই শিক্ষার্থী। করোনার আবির্ভাবের পর লেখাপড়া স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। এখনও অধিকাংশ স্কুল-কলেজ বন্ধ। তবে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাসের নামে শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভার্চুয়াল ক্লাস নিতে অসুবিধা আছে। কিছু তরুণ শিক্ষকের এসব ব্যাপারে সক্ষমতা থাকলেও অধিকাংশ বয়স্ক শিক্ষক অনলাইন ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে সুদক্ষ নন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত অসচ্ছল পরিবার থেকে আগত। অনলাইনে ক্লাস করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় ডিভাইস, অ্যান্ড্রয়েড ফোন বা ল্যাপটপ নেই। তা ছাড়া ভার্চুয়াল ক্লাস নিতে পারলেও তার পরীক্ষা, খাতা দেখা, মার্কিং করা এবং যেসব বিষয়ে ল্যাবরেটরি ওয়ার্ক আছে, সেগুলোর কার্যক্রম নিয়ে ভাবার আছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় এসব নিয়ে ভাবছেন।

প্রতিটি কর্মচঞ্চল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস এখন নিথর, স্তব্ধ। শিক্ষক হিসেবে আমি করোনাভাইরাস আসার পর থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা লক্ষ করছি। তাদের অনেকে বলছেন- হায়, আমার কী হবে? ক্লাস নেই, পরীক্ষা নেই, বাবা-মা ঘরের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না, আমি গৃহবন্দি। আমার জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার কত স্বপ্ন ছিল। আমি তো কিছুই করতে পারছি না। আমি একজন শিক্ষক হিসেবে তরুণ প্রজন্মকে এ পরামর্শ দিতে চাই- এ রকম চিন্তাভাবনা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন। এর পরিবর্তে কোভিড-১৯-এর গৃহবন্দি সময়কে কোন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে আপনি লাভবান হতে পারেন, সে বিষয়ে ভাবুন। আপনি যদি হতাশ হয়ে শুয়ে-বসে সময় কাটান, তাহলে কোনো লাভ নেই, বরং এতে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার ইমিউনিটি কমে গিয়ে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়বে। আপনি করোনাক্রান্ত হয়ে মারাও যেতে পারেন। আপনি নিশ্চয়ই তা চান না। আমরাও চাই না। আমরা চাই, আমাদের প্রত্যেক তরুণ ও যুবক সুস্থ থাকুন। কারণ, তাদের এ দেশ গড়তে হবে।

আমি জানি, আপনি বলবেন- স্যার, আমার তো ক্লাস নেই। লেকচার নেই। ক্যাম্পাসে যেতে পারি না। মন ভালো রাখব কেমন করে? আমার তো পাঠ্যবই পড়তে ভালো লাগে না। আপনাকে কে পাঠ্যবই পড়তে বলেছে? আপনি যা খুশি তাই পড়ুন। আপনার যা করতে ভালো লাগে, তাই করুন। তাতে আপনি কর্মব্যস্ত থেকে আপনার মন ভালো রাখতে এবং হতাশামুক্ত থাকতে পারবেন। আপনি উপন্যাস পড়তে পারেন। ভালো না লাগলে কবিতা পড়ুন। কবিতা ভালো না লাগলে আত্মজীবনী পড়ুন। তাও ভালো না লাগলে নাটক অথবা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখুন। আপনার ভালো লাগে এমন যে কোনো সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে জড়িত করুন। তবে আপনি বুদ্ধিমান হলে সব এলাকায় অল্প অল্প কাজ না করে আপনার আগ্রহের এলাকায় মনোযোগ দিয়ে কাজ করবেন। এতে আপনার ওই বিশেষ এলাকায় দখল তৈরি হবে, যা পরবর্তী জীবনে কাজে লাগবে। বর্তমান যুগ হল কম্পিউটারের যুগ। কম্পিউটারে দক্ষতা না থাকলে করোনার এ সময়ে আপনি এসব শিখতে পারেন। আপনার যদি অ্যান্ড্রয়েড ফোন থাকে, তাহলে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলুন। ভার্চুয়াল আড্ডা দিন। মন ভালো থাকবে। নিজেকে কর্মব্যস্ত রাখলে আপনার হতাশা কেটে যাবে।

মন প্রফুল্ল রাখতে এবং করোনা থেকে রক্ষা পেতে আপনার শারীরিক ফিটনেস ঠিক রাখা জরুরি। এ জন্য আপনাকে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করতে হবে। কোনো আর্থিক খরচ হবে না। ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করবেন। তবে এ ব্যাপারে আমি মেয়েদের সবিনয়ে কিছু বিশেষ পরামর্শ দিতে চাই। আপনাকে বাড়ির বাইরে যেতে দেয়া হচ্ছে না। জিমে বা মাঠে যাওয়ার দরকার নেই। ঘরেই শরীরচর্চা করুন। আপনি বারান্দার মধ্যে সামান্য জায়গায় স্কিপিং করতে পারেন। আধঘণ্টা করুন। শরীরের ঘাম বের হয়ে যাক। শরীর ও মন ভালো থাকবে।

তবে যে বিশেষ পরামর্শটি আমি মেয়েদের দিতে চাই, তা হল- সামাজিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তা ইস্যুর প্রসঙ্গ বিবেচনা করে আপনি মার্শাল আর্ট শিখুন। কারণ, সমাজে যে হারে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বাড়ছে; তাতে আপনি যদি আপনার নিজের সেলফ ডিফেন্স শিখে রাখতে পারেন তাহলে ভালো হয়। জানি, রাত-বিরাতে কোনো বাজে লোকের খপ্পরে পড়লে পুলিশকে ফোন করতে পারবেন। তবে পুলিশ আপনার কাছে আসতে অনেক সময় ১৫ মিনিট বা আধ ঘণ্টা লেগে যাবে। সে সময়টুকু যাতে আপনি মার্শাল আর্ট প্রয়োগ করে নিজের আত্মরক্ষা করতে পারেন, তাহলে অসুবিধা কোথায়? কাজেই মেয়েদের প্রতি আমার সবিনয় পরামর্শ থাকবে, আপনারা করোনার গৃহবন্দি সময় কাজে লাগিয়ে মার্শাল আর্ট শিখে রাখুন। ইউটিউব দেখে শিখতে পারেন। আর আপনি সচ্ছল পরিবারের সদস্য হলে কয়েক বান্ধবী মিলে পেশাদার প্রশিক্ষকের কাছ থেকেও শিখতে পারেন। এ প্রশিক্ষণে আপনার মনোবল বাড়বে।

আমাদের তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের অনেকে হলে সিট না পেয়ে মেসে থাকেন। করোনায় বাড়ি গিয়ে তাদের মাসের পর মাস মেসের ভাড়ার টাকা গুনতে হচ্ছে। অথচ একটু বুদ্ধিমান হলে শিক্ষার্থীরা করোনার গৃহবন্দি সময় ব্যবহার করে ঘরে থেকেই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারেন। এতে তাদের সময়টাও ভালোভাবে কাটবে এবং নিজের পকেট খরচও হয়ে যাবে। তবে এ জন্য তাকে নিজের আগ্রহের এলাকায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যেমন, কেউ যদি ভালো ডাটা এন্ট্রির কাজ শিখতে পারেন বা গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের কাজ শিখতে পারেন বা ওয়েবপেজ ডিজাইনিং, বইয়ের কভার ডিজাইনিং, প্রুফ রিডিংয়ের কাজ শিখতে পারেন, তাহলে এসব কাজ করে তিনি ঘরে বসে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন।

তবে ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থীই এসব কাজ শিখে ফেলেছেন এবং তারা বিশ্বব্যাপী এসব কাজ করছেন। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, সেক্ষেত্রে আমার মতো একজন শিক্ষানবিশকে এমন কাজ কেন দেয়া হবে? আপনি যদি কনফিডেন্ট হন এবং নিজের পোর্টফোলিওটা এমপ্লয়ারকে আকৃষ্ট করার মতো করে তৈরি করতে পারেন, তাহলে আপনার পক্ষে ঘরে বসে কাজ পাওয়া এবং অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনা আছে। আমার জানা অনেক শিক্ষার্থী এভাবে অর্থ উপার্জন করে। এতে করে আপনি একটি কাজে সম্পৃক্ত থাকলেন এবং আপনার কিছু বাড়তি উপার্জনও হল। ফলে আপনার মধ্যে তখন কোনো হতাশা কাজ করবে না। আর যদি কেউ কম্পিউটার না জানেন, তাহলে তার জন্য করোনাকালের গৃহবন্দি সময়টা কম্পিউটার শেখার জন্য একটা চমৎকার সময়। আপনি এ সময় প্রয়োজনীয় প্রোগ্রামগুলো শিখে নিতে পারবেন।

এসবের ফাঁকে ফাঁকে আপনার যদি ইন্টারনেট অ্যাকসেস থাকে, তাহলে করোনাকালে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে চ্যাটিং করবেন। তাদের সঙ্গে গল্প গুজব করবেন। তাতে মন ভালো থাকবে। অবসর পেলে ইন্টারনেটে সময় কাটাবেন। নিজের আগ্রহের এলাকায় সার্চ দিয়ে নতুন নতুন বিষয় শিখবেন। তবে ইন্টারনেটের পজেটিভ এবং নেগেটিভ ব্যবহার সম্পর্কে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনি চাকরির চেষ্টা করলে আপনার চাকরিদাতা কিন্তু আপনার ফেসবুকসহ ইন্টারনেটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আপনার স্বভাব-চরিত্র এবং মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করবেন। এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা অনেকেই অবিবাহিত। আপনারা বিয়ের উদ্যোগ নিলে পাত্রী পক্ষের অভিভাবকরা আপনার ইন্টারনেটের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে আপনার স্বভাব-চরিত্র বুঝতে চেষ্টা করবেন। কাজেই আপনারা ইন্টারনেট ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করবেন। এমন সব ওয়েবপেজে লাইক দেবেন না, যা দেখে কেউ আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে পারেন।

ভুলে যাবেন না, আপনারা হচ্ছেন সেই প্রজন্ম, যারা ভাষা আন্দোলন দেখেননি। আপনারা স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। এ সম্পর্কে আপনাদের অনেকের ধারণা পরিষ্কার নয়। করোনার সময় যদি অবসর পান, তাহলে আপনারা এ সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। এ সম্পর্কে বাজারে বইপুস্তক পাওয়া যায়, আগ্রহ থাকলে সেগুলো পড়ে আপনি এসব বিষয়ে নিজের ধারণা পরিষ্কার করে নিতে পারেন। কারণ, আপনাদের ভবিষ্যতে এ দেশের হাল ধরতে হবে। আপনারাই এ দেশের কিং মেকার। আপনারাই চেঞ্জ মেকার। আপনারা তো এখন আপনাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে করোনার কারণে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। গ্রামের অল্প শিক্ষিত মানুষ আপনাদের কাছে অনেক কিছু জানতে চাইবে। তাদেরকে এ জাতির ইতিহাস জানাতে হবে। আপনাদের বলতে হবে, আমরা যে ভাষা আন্দোলন করেছিলাম, তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সর্বস্তরে বাংলাভাষার ব্যবহার সুনিশ্চিত করা, যা আমরা ৬৮ বছরে অর্জন করতে পারিনি। গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত লোকদের প্রশ্নের জবাবে আপনাদের বলতে হবে, কেন আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলাম। আপনাদেরই বলতে হবে, আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেলের জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধ করিনি। আমরা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অধিকার এবং ভোটের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের পরাস্ত করে স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলাম। কাজেই, আপনাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে হবে। গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা নির্বাচন ও ভোটের মর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রতি ভয়েস রেইজ করতে হবে।

তবে আর যাই করুন না কেন, করোনাকালে হতাশাগ্রস্ত হয়ে অসৎ বন্ধুবান্ধবের খপ্পরে পড়ে নেশায় কৌতূহলী হবেন না। একবার নেশার জগতে ঢুকলে আর বের হতে পারবেন না। নেশার ধর্মই হচ্ছে বৃদ্ধি পাওয়া। এ জগতের চূড়ান্ত ঠিকানা নিশ্চিত মৃত্যু। জেনেশুনে আপনি কিছুতেই সে পথে যেতে পারেন না। কারণ, আপনাকে আমাদের দরকার। আপনাকে এ দেশের দরকার। আপনারাই দেশ গড়বেন। দেশের ভবিষ্যৎ আজকের তরুণ প্রজন্মের হাতে। কাজেই, আপনারা করোনায় হতাশ না হয়ে এ প্রবন্ধে দেয়া পরামর্শের আলোকে ‘করোনা-সময়ের’ শ্রেষ্ঠ ব্যবহারে নিয়োজিত হন। এ সময় নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করুন। করোনা-উত্তর সময়ে বর্ধিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজের এবং দেশের ভবিষ্যৎ গড়তে ভূমিকা রাখুন।

[লেখাটি রোটার‌্যাক্ট ক্লাব অব ইসলামাবাদ, চট্টগ্রাম আয়োজিত ‘জেনারেশন টিউন উইথ ফাইটব্যাক স্ট্র্যাটেজি’ শীর্ষক ওয়েবিনারে কী-নোট স্পিকার হিসেবে লেখক প্রদত্ত বক্তব্যের কিছু অংশের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি]

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

উপরে