মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই, ২০২১ | ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Logo
Print

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্য তেলের ঘানি

প্রকাশের সময়: ৮:১৮ অপরাহ্ণ - শনিবার | ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২১

currentnews

মালিক জামান, যশোর : গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য তেলের ঘানি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই ঐতিহ্য তেলের ঘানির দেখা পাওয়া এখন অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। আজ থেকে শত বছর আগে থেকে মানুষের রান্না বান্না ও গায়ে মাখার জন্য যে তেল ব্যবহার হতো, তা তৈরীর এক মাত্র উপায় ছিল কাঠের তৈরী ও গরুর কাধে ঘুরানো ঘানি মেশিন। আর এই ঘানি মেশিনে যারা সরিষা মাড়াই করে তেল বের করে তাদেরকে বলা হয় কলু। এই কলুরাই এক সময় গ্রামবাংলা ও শহরের মানুষের, রাজা বাদশাদেরও তেলের চাহিদা মেটানোর একমাত্র উপায় ও মাধ্যম ছিলো। তাই তাদের কদরও ছিল সীমাহীন।

গ্রামবাংলার মানুষেরা যখন কোন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো তখন ১০ থেকে ১৫ দিন আগে কলুদের কাছে অর্ডার করতে হতো তেলের জন্য। এক সময় গ্রাম গঞ্জের অধিকাংশ কলু সম্প্রদায়ের এক মাত্র আয়ের উপায় ছিলো ঘানিতে সরিষা মাড়াই করে তেল তৈরী করা। কিন্তু আজ আর তা তেমন একটা চোখে পড়ে না। ঘানিতে এক বারে ৫ কেজি পরিমান সরিষা মাড়ানো যায়। এতে সময় লাগে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘন্টা। একাধিক গরু দিয়ে পালাক্রমে ঘোরানো হয়। একটি গরুর চোখে কালো কাপড় বেধে এক টানা দুই থেকে আড়াই ঘন্টা ঘোরানোর পর অন্য গরু দিয়ে ঘোরানো হয় বাকী সময়। বাজারে বর্তমানে ঘানি ভাঙ্গানো তেলের দামও অনেক বেশী। যান্ত্রিক মেশিনে ভাঙ্গানো তেলের দাম যেখানে প্রতি কেজি ১০০ টাকা, সেখানে ঘানি ভাঙ্গানো তেলের দাম প্রতি কেজি ২৫০টাকা থেকে ২৮০টাকায় বিক্রি হয়। যে কারণে এখনো অনেকেই ধরে রেখেছে বাপ দাদাদের এই পেশাকে।

শুধু যশোরের কেশবপুর উপজেলার ভালুকঘর, মেহেরপুর, বেগমপুর, সাগরদাঁড়ী, বাদুড়িয়া, সাতবাড়িাসহ ২০টি গ্রামের ৮০০ অধিক পরিবার জড়িত ছিল প্রাচীনতম এই পেশার সাথে। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকুলতা ও যান্ত্রিক মেশিনের দাপটে এই পেশা অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন। এখন ২০ থেকে ২৫ পরিবার প্রাচীন এই পেশাকে আকড়ে ধরে আছে।

বাদুড়িয়া এলাকার ঘানি ব্যবসায়ী আব্দুল গফুর বিশ্বাস বলেন যান্ত্রিক মেশিনের দাপটে অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন। এই গ্রামে অনেকই এই পেশার সাথে জড়িত ছিল বর্তমানে আমরা ৫ পরিবার টিকে আছি। ভালুকঘরের আকাম আলী সরদার বলেন তাদের গ্রামে আগে প্রায় ২০/২৫ পরিবার ঘানি পেশার সাথে জড়িত ছিল। যান্ত্রিক মেশিনের দাপটে এবং সরকারী পৃষ্টপোষকতার অভাবে বর্তমানে অনেকেই ধরে রাখতে পারিনি। বেগমপুর গ্রামের ইমান আলী বলেন আমাদের গ্রামের পাঁচটি পরিবারের মধে মাত্র একটি পরিবার এ পেশায় টিকে আছে।

এ বিষয়ে কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ঘানি এদেশের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য, সরকারী পৃষ্টপোষতা পেতে ঘানি ব্যবসায়ী সমিতি যদি সহযোগিতা চায় সরকার এটাকে টিকিয়ে রাখতে আন্তরিক। একটি ঘানি রয়েছে যশোর-চুকনগর মহাসড়কের পাশে ডুমুরিয়ার নরনিয়া গ্রামে। বাপদাদার এ পেশা ধরে আছেন আবুল কাশেম বিশ্বাস(৭১)। ত্রিশ বছর ধরে বলদ দিয়ে ঘানিতে সরিষ পিষে তেল বিক্রি করে চলে কাশেমের সংসার। তার ঘানি ঘরে সরিষা মাড়াই হয়। একটি গরুর চোখ বেঁধে ঘানির জোয়াল তুলে দেয়া হয় তার কাঁধে। গরু ঘুরছে আর ঘানির নলি বেয়ে তেল পড়ছে একটি পাত্রে। একেবারে খাঁটি সরিষার তেল।

কাশেম মিয়া জানান, প্রতিদিন তিনি ১০ কেজি সরিষা মাড়াই করেন। দুটি গরু দিয়ে তিনি মাড়াই সম্পন্ন করেন। পাঁচ কেজি সরিষায় দেড় কেজি তেল হয় বলে জানান কাশেম। প্রতি কেজি তেল ২৫০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। সে হিসাবে পাঁচ কেজি সরিষার তেল ৩৭৫ টাকায় বিক্রি করেন। আর খৈল বিক্রি করেন ১২০ টাকায়। তিনি আরো জানান, পাঁচ কেজি সরিষার দাম ৩০০ টাকা। সে হিসাবে পাঁচ কেজিতে প্রায় ২০০ টাকা লাভ হয়। ১০ কেজি সরিষা থেকে তার প্রতিদিন আয় হয় ৪০০ টাকা। এ দিয়েই চলে কাশেমের সংসার। তবে একটি ঘানি তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ১২ হাজার টাকা। দুটি গরুর দাম প্রায় দেড় লাখ টাকা। একটি ঘানি এক বছর স্থায়ী হয়। এক মণ সরিষায় ১৩ কেজি তেল ও ২৪ কেজি খৈল হয় বলে জানান কাশেম। তার কথায় বাকি দুই কেজি ফাও যায়। মেশিনেও প্রায় সমান তেল হয়।
তিনি জানান, বর্তমানের ভেজালের দিনে তার তেল শতভাগ খাঁটি। এ কারণে তার ক্রেতাও বেশি। শুধু এলাকার মানুষ তার এ খাঁটি তেল কেনেন না, জেলা শহর থেকেও আগ্রহী ক্রেতারা এসে তেল নিয়ে যায়। এক সময় এ গ্রামের অনেক মানুষ এ পেশায় ছিল। এখন এ কাজের সাথে যুক্ত আছে মাত্র দুইজন।

পাশে ওয়াদুদের ঘানি। তিনি বলেন, একবারে পাঁচ কেজি সরিষা ভাঙানো যায়। সময় লাগে ৫ ঘণ্টা। পাঁচ কেজি সরিষা ভাঙাতে তিনি পারিশ্রমিক নেন ২৫০ টাকা। দিনে দুইবারের বেশি সরিষা ভাঙানো কঠিন। মেশিনে সরিষা ভাঙাতে সময় লাগে কম। ১০ কেজি সরিষা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভাঙানো যায়। পাঁচ কেজি সরিষা ঘানিতে ভাঙানো খরচ যেখানে ২৫০ টাকা, সেখানে মেশিনে ১০ কেজি ভাঙানো খরচ ৬০ টাকা। তবে মেশিনে সরিষা ভাঙালে তেলের মান কিছুটা কমে যায়। কিন্তু ভাঙানো খরচ সাশ্রয় ও সময় কমের কারণে মেশিনে সরিষা ভাঙাতে মানুষের ঝোঁক বেশি। তা ছাড়া হাতের কাছে ঘানিও এখন তেমন মেলে না।

আর্কাইভ

বিজ্ঞাপন

https://www.revenuecpmnetwork.com/hsbkfw8q51?key=6336343637613361393064313632333634613266336230363830336163386332

উপরে